চোপরা ক্রুর চাহনিতে একবার কর্নেলের দিকে, আরেকবার আমার দিকে তাকাল। তারপর বলল, “উঁহু! আজ রাতেই চাই। নে–ওই শিগগির।”
কর্নেল আরও আঁতকে ওঠার ভঙ্গি করে বললেন, “কথা শোনো বাবা! নাগপা বস্তিতে সাংঘাতিক একপাল কুকুর আছে। তারা রাত জেগে পাহারা দেয়। আমাদের দুজনকে তারা কিছু বলবে না। কিন্তু তোমাকে তাদের হাত থেকে বাঁচাতে পারব না।”
চোপরা ফের পিস্তল বের করে বলল, “তবে রে ব্যাটা ফকির। আমার সঙ্গে চালাকি হচ্ছে? নাগপা-বস্তি কোথায় আমি জানি না বুঝি? ওরা থাকে উপত্যকার সমতলে। পাহাড়-টাহাড় ওদের বস্তি থেকে খানিকটা দূরে। বস্তি দিয়ে গেলে তবে তো ওদের কুকুরের পাল্লায় পড়ব। আমরা ঘুরপথে যাব। ওঠ শিগগির।”
আমি মনে মনে ঘাবড়ে গেলুম। কর্নেলের মুখটাও গম্ভীর দেখলুম। চোপরা পিস্তলটা ওঁর পাগড়িতেই ঠকাতেই উনি “ওরে বাবা! যাচ্ছি, যাচ্ছি!” বলে উঠে দাঁড়ালেন।
ধুরন্ধর চোপরা হঠাৎ আমার দিকে ঘুরে বলল, “এই ব্যাটা ফকিরের চেলা, তুই এখানে থাক। ফকিরবুড়ো যদি আমাকেও কোথাও বেমক্কা ফেলে কেটে পড়ে! তুই জামিন রইলি। গুহাটা দেখে এসে তবে তোকে ছেড়ে দেব। আর ফকিরবুড়ো যদি আমাকে ঠকায়, তাহলে তোর পরিণাম কী হবে আগে দেখে রা। এ বুড়োও দেখে যাক্। তাহলে আমাকে ঠকাবে না।”
বলে সে শিস দিল তিনবার। অমনি অন্যপাশের একটা দরজা ঠেলে যে বেরিয়ে এল, তাকে দেখে প্রচণ্ড চমকে উঠলুম। গোয়েন্দাপ্রবর তাহলে ঠিকই আঁচ করেছিলেন।
কালো বীভৎস চেহারার একটা শিম্পাঞ্জি ঘরে ঢুকল। কুতকুতে চোখে আমাদের দেখতে দেখতে বিকট ভঙ্গিতে হাসবার মতো দাঁত বের করল। চোপরা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “জান্ডু। তুই এই ব্যাটাকে পাহারা দিবি। পালানোর চেষ্টা করলেই ওকে নিকেশ করে ফেলবি।” বলে চোপরা হাত দিয়ে গলা টেপার ইশারা করল।
হতচ্ছাড়া শিম্পাঞ্জিটা আবার দাঁত বের করল আমার দিকে তাকিয়ে। কর্নেলের পিঠে পিস্তল ঠেকিয়ে চোপরা তাকে বাইরের দরজা দিয়ে নিয়ে গেল। তরপর দরজা বন্ধ করল। বুঝতে পারলুম, দরজায় তালা দিচ্ছে সে।
আমি শিম্পাঞ্জির দিকে তাকিয়ে রইলুম! ভয়ে বুকে টিপটিপ করছে। আমার গায়ের কালো আলখেল্লার ভেতর রিভলবার লুকিয়ে রেখেছি। কিন্তু জন্তুটাকে গুলি করলে চোপরার লোকেরা টের পেয়ে যাবে। তাছাড়া বাইরে যাবার পথ বন্ধ। একা তাদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারব না। ওর লোকেদের কাছেও যে আগ্নেয়াস্ত্র নেই, কে বলতে পারে?
শিম্পাঞ্জিটা হেলে-দুলে গদাইলস্করী চালে আমার দিকে এগিয়ে এল। তারপর দাঁত দেখিয়ে ধমক দেবার ভঙ্গিতে বাঁদুরে ভাষায় কী যেন বলল। আমি ভয়ে-ভয়ে ওর সঙ্গে ভাব করার চেষ্টা করলুম। বললুম, “ওহে জাম্বু! এস, এস। তোমার সঙ্গে আলাপ করা যাক্।”
অমনি ভেতরের দরজায় একটা হোঁকামোটা চীনাদের মতো চেহারার লোক উঁকি মেরে ধমক দিয়ে বলল, “চু। বাঁচিত করলে জাম্বু থাপ্পড় মারবে। চুপচুপ বসে থাক্।”
লোকটার হাতে দেখছি একটা লম্বাটে সেকেলে পিস্তল! সে আবার দরজার পর্দার আড়ালে চলে গেল। বুঝলুম, আমার সত্যিই টু শব্দ করা চলবে না।
ঘরটা বেশ বড়ো। মেঝে কাশ্মীরী কার্পেটে ঢাকা। বাড়িটা কাঠের মনে হল। মেঝেও কাঠের। তাই জাম্বু নড়াচড়া করলেই মচমচ শব্দ হচ্ছে। সে আমাকে কিছুক্ষণ ধমক দিয়ে মেঝেয় গড়াগড়ি খেল। তারপর সোফায় চিত হয়ে শুয়ে মানুষের মতো ঠ্যাং নাচাতে থাকল। কিন্তু আমি একটু নড়লেই সে চমকে উঠছিল এবং দাঁত বের করে ধমক দিচ্ছিল। কখনও জিভ বের করে ভেংচি কাটছিল। রাগে আমি অস্থির। কিন্তু কিছু করার নেই। এদিকে কর্নেলের জন্যও ভীষণ ভাবনায় পড়েছি। চোপরা অসম্ভব ধূর্ত লোক বটে। নাগপা বস্তিটা কোথায় কর্নেল সঠিক জানেন না। কোন্ পাহাড়ে গুহা আছে, তাও জানেন না। গুহা যে থাকবেই তারও মানে নেই। কর্নেল কেন যে ছাই ওসব বলতে গেলেন তাকে! হয়তো এবার নিজের প্রাণটিও খোয়াবেন বেঘোরে–আমার প্রাণটিও যাবে শেষ পর্যন্ত।
শিম্পাঞ্জিটা চিত হয়ে শুয়ে আছে। মাঝে মাঝে মুখ কাত করে আমাকে দেখে নিয়ে জিভ বের করে ভেংচি কাটছে। তারপর দাঁত বের করে অদ্ভুত কিচমিচ শব্দে যেন হাসছে। আমার আর সহ্য হল না। ফের সে জিভ বের করে ভেংচি কাটলে আমিও জিভ দেখিয়ে ভেংচি কাটলুম।
তখন সে তড়াক করে উঠে বসল। তারপর হেলে-দুলে এগিয়ে এল। ভয়ে বুক শুকিয়ে গেল আমার। মরিয়া হয়ে আলখেল্লার ভেতর হাত ভরে রিভলভার বের করব ভাবছি, সে লম্বাটে হাত বাড়িয়ে আমার দুটো কান মুলে দিল। রাগে-দুঃখে আমি গর্জে উঠলুম, “তবে রে হতচ্ছাড়া!” সেই সময় দরজার পা তুলে সেই লোকটা ধমক দিল, “ফের চাঁচাচ্ছিস?”
বললুম, “জাম্বু আমার কান মুলে দিচ্ছে দেখছ না?”
লোকটা হ্যাঁ হ্যাঁ করে হাসল। “বেশ করেছে! তুই নড়াচড়া করছিস কেন?”
কানদুটো জ্বালা করছিল। রক্ত বেরুচ্ছে কি না কে জানে! পাগড়ির দুপাশ টেনে কানদুটো ঢেকে ফেললুম। জাম্বু এবার আমার সামনেই মেঝেতে চিত হয়ে শুল। এবং চার হাত-পা তুলে স্থির হয়ে রইল। লোকটা আবার আড়ালে চলে গেল।
সময় কাটছে না। কর্নেলের সঙ্গে এতকাল কত সাংঘাতিক অ্যাডভেঞ্চারে গেছি, কিন্তু এমন বিপদে কখনও পড়িনি। কর্নেলের বার্ধক্যজনিত বুদ্ধি বিভ্রম ছাড়া একে কী বলব? কেন যে যেচে এমন করে বাঘের মুখে গলা বাড়িয়ে দিতে এলেন!
