এবার কোত্থেকে দুটো রাস্তার কুকুর এসে আমাদের বেজায় ধমকাতে শুরু করল। কিছুতেই তাড়ানো গেল না তাদের। তখন হঠাৎ পীরবাবা গলা চড়িয়ে বলে উঠলেন, “বেটা! বাঁটুলঠো নিকালো! মার দো দোনো কুত্তাকো!”
আমি অবাক হয়ে তাকাচ্ছি। পীরবাবা ফের জোরগলায় ধমক দিলেন, “কঁহা তেরা বাঁটুল? হাম তুমকো যো বাঁটুল দিয়া, কঁহা রাখা তুম? দেখো আভি ছুঁড়কে।”
তারপর কুকুর দুটোর দিকে ঘুরে চেঁচালেন আগের মতো হিন্দিভাষায়–”যে-সে বাঁটুল নয়, পাঁচ-পাঁচশো গ্রাম ওজন। মারলে তোদের মাথা ফুটো হয়ে যাবে জানিস ব্যাটারা?”
কুকুর দুটো কী বুঝল কে জানে, হয়ত মুঠো নাড়া দেখেই কেটে পড়ল লেজ গুটিয়ে। তারপর দেখি চোপরা অ্যান্ড কোং-এর পাশের গলি থেকে একটা লোক বেরিয়ে এল। সে হনহন করে এসে আমাদের সামনে দাঁড়াল। পরনে প্যান্টশার্ট, ফর্সা, মোটাসোটা গড়ন। নাকটা মোটা। সে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, “সেলাম পীর বাবা।”
পীরবাবা চামর তুলে মিঠে গলায় বললেন, “এস বেটা! মুশকিল আসান করে দিই!”
লোকটা নিচের সিঁড়িতে ধপাস করে বসে পড়ল।
“বেটা তোমার নাম কী?”
“জী পীরবাবা, আমার নাম ভোমরলাল চোপরা। সামান্য ব্যবসাদার।”
আমি চমকে উঠলুম। তারপর সামলে নিয়ে বিড়বিড় করার ভঙ্গিতে ঠোঁট কাঁপাতে থাকলুম। কর্নেল একটু হেসে বললেন, “কী মুশকিলে পড়েছ, বলো তো বেটা ভোমরলাল?”
ভোমরলাল এদিক-ওদিক তাকিয়ে চাপাগলায় বলল, “পীরবাবা আমার ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিলুম, আপনি কত লোকের মুশকিল আসান করছেন। তাই আপনার কাছে এলুম। বাবা, আমি বড্ড মুশকিলে পড়েছি। কিন্তু এখানে রাস্তার ধারে সে সব কথা খুলে বলা যাবে না। দয়া করে যদি
আমার ঘরে পায়ের ধুলো দেন, ভাল হয়।”
পীরবাবা উঠে দাঁড়ালেন। “ঠিক হ্যায় বেটা! চলো।”
আমার অস্বস্তি হচ্ছিল। ধূর্ত চোপরা নিশ্চয় ঘরের ভেতর উজ্জ্বল আলোয় আমাদের ছদ্মবেশ ধরে ফেলবে। কর্নেল কাজ ঠিক করছেন না। কিন্তু কর্নেল দেখলুম, দিব্যি হেঁটে চলেছেন ওর পেছনে।
পাশের সরু গলিতে ঢুকে একটা দরজা। তারপর সিঁড়ি। ওপরে গিয়ে একটা ঘরে আমাদের বসাল চোপরা। তারপর দরজা বন্ধ করে দিল।
পীরবেশী কর্নেল মিষ্টি হেসে বললেন, “এবার বলো বেটা কী মুশকিলে পড়েছ?”
অমনি প্যান্টের পকেট থেকে পিস্তল বের করে বলল, “টু শব্দ করলে মরবে। কৈ বাঁটুলটা বের কর। চটপট। নইলে খুলি উড়িয়ে দেব দুজনের!”
.
শিম্পাঞ্জির কবলে
হকচকিয়ে গিয়েছিলুম চোপরার কাণ্ড দেখে। লোকটা দেখছি, সত্যি খুনে প্রকৃতির। ইচ্ছে করল, এই ফুট আড়াই লম্বা ও ভারি লোহার চিমটেটা নিয়ে ওর পিস্তলধরা হাতটাকে গুঁড়িয়ে দিই। কিন্তু কর্নেল ততক্ষণে মুখে প্রচণ্ড ভয় ফুটিয়ে ধুপ করে বসে পড়েছেন তারপর হাউমাউ করে বললেন, “দিচ্ছি বাবা, আগে তোমার এই সাংঘাতিক জিনিসটা সরাও!”
বলে আমার দিকে ঘুরলেন। “ব্যাটা! তুম ভি বৈঠ যাও।” তখন আমিও করুণ এবং ভীত মুখ করে ওঁর ভঙ্গিতে হাটু দুমড়ে আসন করে বসলুম।
চোপরার একহাতে পিস্তল, অন্য হাতটা বাড়িয়ে আছে। কর্নেল তার আলখেল্লার ভেতর থেকে সত্যি একটা বাঁটুল বের করলেন। ঠিক যেমনটি বেণীমাধব ওঁকে রাখতে দিয়েছেন, তেমনটি। উদ্বিগ্ন হয়ে ভাবলুম, বেণীমাধবের বাঁটুলটাই কি শয়তান চোপরাকে দিয়ে দিচ্ছে কর্নেল?
চোপরা খপ করে বাঁটুলটা কেড়ে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এবং নেড়েচেড়ে দেখল। গায়ের ওপরকার খোদাই করা নকশা ও লেখাজোখাও দেখল। দেখে বলল, “এই ব্যাটা ফকির! কোথায় পেলি এ জিনিস?”
কর্নেল বললেন, “নাগপাদের বস্তির কাছে একটা পাহাড়ী গুহায় কুড়িয়ে পেয়েছি বাবা!”
“ওখানে মরতে গিয়েছিলি কেন?”
“ওটাই যে আমার ডেরা বাবা!” কর্নেল মিষ্টি হেসে বললেন। তারপর চোখদুটো ধুরন্ধর লোকের মতো একটু টিপে চাপা গলায় ফের বললেন “মাসখানেক আগে তোমার মতো এক বড়া আদমিকে এমনি একটা জিনিস দিয়েছিলুম। কিন্তু সে তোমার মতো পিস্তল বের করেনি। তাকে খুশি হয়ে দিয়েছিলুম। জিনিসটা খুব পয়মন্ত। ঘরে থাকলে মুশকিল আসান হয়। তারপরে…”
চোপরার চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, “আর কাউকে দিয়েছিস নাকি?”
কর্নেল বললেন, “আহা, বলতে দাও সেকথা। পয়মন্ত জিনিসটা পেয়ে লোকটার কপাল ফিরে গিয়েছিল। কিছুদিন পরে এসে বলল, জিনিসটা হারিয়ে ফেলেছে। আর একটা যদি দিই, তার খুব উপকার হয়।”
“তুই আবার দিলি তাকে?”
“হ্যাঁ বাবা। গুহার ভেতর খুঁজলেই এ জিনিস পাওয়া যায়।”
চোপরা পিস্তল পকেটে ভরে বলল, “নাগপারা তোকে থাকতে দেয় ওদের এলাকায়? শুনেছি ওরা খুব দুর্ধর্ষ প্রকৃতির মানুষ। বাইরের লোককে ওদের এলাকায় যেতেই দেয় না!”
কর্নেল হাসলেন। “ব্যাটা আমি খোদার ফকির। পীর মুশকিল আসানের চেলা। আমাকে নাগপারা কিছু বলে না।”
চোপরা বাঁটুলটা আবার ভাল করে দেখে নিয়ে বলল, “এই ব্যাটা ফকির! জিনিসটার জন্য তোকে দুটো টাকা দিচ্ছি। আর শোন, এ জিনিস আমার আরও চাই। তোকে আরও টাকা দেব। তোর ডেরায় আমাকে নিয়ে চল।
কর্নেল আঁতকে ওঠার ভঙ্গি করে বললেন, “সর্বনাশ! নাগপারা যদি টের পায়, তাহলে আমাকে আর আমার চেলাকে তো বটেই, তোমাকেও মেরে ফেলবে। বাবা, একটু ধৈর্য ধরো। আমি কাল সকালে তোমাকে আরও কয়েকটা এনে দেব। ভেব না!”
