কর্নেল বললেন, “হা-ওদের কথা বইয়ে পড়েছি। ওদের সম্পর্কে আমার খুব আগ্রহ।”
অর্জুন সিং বললেন, “ঠিক আছে। ওদের একজনের সঙ্গে আমার আলাপ আছে। তাকে ডেকে পাঠাব।”
কর্নেল বললেন, ‘দরকার নেই। আমি গিয়ে আলাপ করব ওদের সঙ্গে।”
অর্জুন সিং গম্ভীর মুখে বললেন, “নাগপারা এমনিতে খুব ভদ্র। কিন্তু ওরা বাইরের লোকের প্রতি খুব সন্দেহপরায়ণ। তাই বাইরের লোকের সঙ্গে মিশতে চায় না। তাছাড়া ওরা কি দুর্দান্ত হিংস্র প্রকৃতিরও। সাবধানে মেলামেশা করা দরকার।”
কথা হচ্ছিল হোটেলের ব্যালকনিতে বসে। একটু পরেই কর্নেল বললেন, “আচ্ছা ব্রিগেডিয়ার সিং, এখানে কলকাতার ভোমরলাল চোপরা কোম্পানির একটা ব্রাঞ্চ অফিস আছে শুনেছিলুম। কোথায় সেটা?” অর্জুন সিং একটু হেসে বললেন, “চোপরাকে চেনেন নাকি?”
“না । নাম শুনেছি।”
“চোপরা বিপজ্জনক লোক। ও আসলে চোরাচালানি। এখান থেকে চীনের কাশগড়ে যাবার একটা রাস্তা আছে। দুর্গম রাস্তা অবশ্য। চোপরা সেই রাস্তায় চীন থেকে বে-আইনিভাবে জিনিসপত্র আমদানি করে। আমাদের সেনাবাহিনী সারা এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে। কারণ সীমান্ত খুব বেশি দূরে নয়। চোপরার ধূর্ততা অসাধারণ। সেনাবাহিনীর চোখ এড়িয়ে কারবার করে।”
“চোপরার অফিসটা কোন্ এলাকায়?”
অর্জুন সিং আঙুল তুলে শহরের দিকে দেখিয়ে বললেন, “ওই যে একটা সাদা বাড়ি–তার নিচে বাজার দেখা যাচ্ছে। বাজারের পেছনে গম্বুজওলা মসজিদের পাশেই চোপরার অফিস। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না। টিলার আড়ালে পড়ে গেছে।”
এরপর কর্নেল আড়ালে ডেকে নিয়ে গেলেন অর্জুন সিংকে, চুপি চুপি অনেকক্ষণ কথাবার্তা বললেন। তারপর দেখলুম অর্জুন সিং হা-হা করে হেসে উঠলেন প্রচণ্ড উঁড়ি দুলিয়ে। কর্নেল আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন ঘরে। বললেন, “এবেলা বিশ্রাম করা যাক। সন্ধ্যার মুখে আমরা বেরুব। জয়ন্ত, তখন আমি কিন্তু মুশকিল আসান পীর। আর তুমি আমার চেলা।”
ঘাবড়ে গিয়ে বললুম, “ছদ্মবেশ না ধরলেই কি নয়?”
কর্নেল একটু হেসে শুধু বললেন, “যস্মিন দেশে যদাচার।”
ব্রিগেডিয়ার অর্জুন সিং বিকেল গড়িয়ে আমাদের ঘরে এলেন। চাপা গলায় বললেন, “হ্যাঁ-খবর নিয়েছি। চোপরা এসেছে দিন চারেক আগে।”
কর্নেল বললেন, “আমাদের পোশাক পরা শেষ হলে আমরা বেরুব কিন্তু।”
“করিডর দিয়ে এগিয়ে পেছনের দিকে নেমে যাবার সিঁড়ি আছে। ওদিকটা নির্জন। আপনারা নিশ্চিন্তে বেরুতে পারেন। ওদিকে দরজা আমি খুলে রাখছি। নামবার সময় কিন্তু ভেজিয়ে দিয়ে যাবেন।” বলে অর্জুন সিং চলে গেলেন।
কর্নেল দরজা এঁটে দিয়ে স্যুটকেশ খুলে বললেন, “চিৎপুরে দাশ অ্যাণ্ড কোম্পানি যাত্রা থিয়েটারের পোশাক ভাড়া দেয়। এগুলো তাদের কাছ থেকে জোগাড় করেছি। ডার্লিং, তোমার তো দাড়ি নেই। অতএব নকল দাড়ি পরতে হবে। মুখ আর দু-হাতের চামড়া একটু ময়লা দেখানো দরকার। পেন্ট এনেছি। মেখে নাও। আশা করি, কখনও-কখনও থিয়েটারে নেমেছে। অসুবিধা হলে আমি সাহায্য করব।”
কিছুক্ষণ পরে সাজগোজ শেষ করে যখন আয়নার সামনে দাঁড়ালুম, না পারলুম নিজেকে চিনতে, না কর্নেলকে চিনতে। দুজনের পরনে দুটো কালো আলখেল্লা। মাথায় নোংরা রঙিন কাপড়ের পাগড়ি। গলায় ইয়া মোটা রঙিন পাথরের মালা। কর্নেলের হাতে একটা হাতলওয়ালা ধূপদানি, আর প্রকাণ্ড কালো চামর। আমার হাতে একটা মস্তবড় লোহার চিমটে। চিমটেয় আংটা পরানো রয়েছে অনেকগুলো। কর্নেল দেখিয়ে দিলেন, কেমন করে চিমটেটা তুলে বুকে মৃদু ঘা মারতে হবে এবং ঝুনঝুন শব্দ উঠবে। সেইসঙ্গে বিড়বিড় করতে হবে–ঠোঁট দুটো সবসময় কাপবে। তারপর কী বলতে হবে, তাও শিখিয়ে দিলেন।
ধূপদানিতে একগাদা টিকে ভরে আগুন ধরালেন কর্নেল। তারপর ধূপ ছড়িয়ে দিলেন। ধোঁয়ায় ঘর ভরে গেল। তারপর বেরিয়ে পড়লুম।
হোটেলের পেছনে খাড়া পাহাড়। খাঁজকাটা গা দিয়ে নিচের রাস্তায় নামলুম যখন, তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কর্নেল বেমক্কা চেঁচিয়ে উঠলেন, “ইয়া পীর মুশকিল আসান।”
ট্রেনিং মতো আমিও চেঁচিয়ে বললুম, “যাহা মুশকিল তাহা আসান।”
রাস্তা ক্রমশ বাজারের দিকে নেমেছে! ঘোড়ার টানা গাড়ি, মোটরগাড়ি, হরেকরকম যানবাহন চলাচল করছে। তত বেশি ভিড় চোখে পড়ল না। পীরবাবা যে দোকানের সামনে দাঁড়াচ্ছেন এবং ওই বুলি বলে হাঁক দিচ্ছেন, সেই দোকানের লোক এসে ধূপদানির তলার দিকে বাটির মতো গোল পাত্রটাতে ঠকাস করে পয়সা ফেলছে। আর পীরবাবা তার মাথার চামর বুলিয়ে বিড়বিড় করে মন্ত্র আওড়ে ‘মুশকিল আসান করছেন।
কর্নেল ঠিকই বলেছিলেন, প্রচুর মুসলিম এদেশে বাস করে। গম্বুজওলা মসজিদের সামনের ধাপবন্দী সিঁড়িতে আমরা যখন বসলুম, তখন ধাপের নিচে ভিড় জমে গেল। মসজিদ থেকে প্রার্থনা করে দলে দলে লোক বেরিয়ে এল। তারাও ভিড় করে দাঁড়াল। পীরবাবা সমানে হাঁক দিচ্ছেন, “ইয়া পীর মুশকিল আসান!” আমি পাল্টা চেঁচিয়ে উঠছি, “যাহা মুশকিল তাহা আসান!”
আড়চোখে দেখছিলুম, বাঁপাশে–রাস্তার ধারে একটা বাড়ির মাথায় সাইনবোর্ডে লেখা আছে : ‘চোপরা অ্যান্ড কোং।’ অফিস এখন বন্ধ। দোতলার ঘরগুলোতে আলো জ্বলছে।
পীরবাবার ধূপদানির তলাকার বাটিটা পয়সার ভরে গেল। তারপর ভিড় ক্রমশ কমে গেল। মনে হল, খুব সকাল সকাল এখানকার লোকেরা খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ে। একদল লোক আবার প্রার্থনার জন্য মসজিদে ঢুকল এবং কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে গেল। পীরবাবা আর তার চেলা দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। আর কেউ আশীর্বাদ নিতে আসছে না। রাত আটটা বাজে। মসজিদের ভেতর ঘড়ির বাজনা শুনে বুঝলুম সেটা।
