“দেশবিদেশে যাদের কারবার তাদের পক্ষে এটা স্বাভাবিক তাই না?”
কর্নেল জবাব না দিয়ে আবার চোখ বুজলেন। কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ উঠে গিয়ে সেই পুরনো ইংরেজি বইটা নিয়ে এলেন। দ্রুত পাতা উল্টে একখানে চোখ রেখে বললেন, “হুঁ-লাড়াক। আরিয়ান লিখেছেন, মৃত্যুকাল পর্যন্ত সম্রাটের সন্দেহ ছিল, পলাতক দেহরক্ষী অ্যাস্টিডোনা তার অমূল্য বাঁটুল চুরি করে নিয়ে পূর্বদিকে পালিয়ে গেছে। তাঁর মৃত্যুর পর এক চীনা পরিব্রাজক আলেকজান্দ্রিয়ায় আমাকে বলেছিলেন, কাশ্মীরের উত্তরে ডাক রাজ্যে একদল গ্রিককে দেখেছেন। বুঝলুম, ওরা সম্রাটের বাহিনী থেকে পলাতক গ্রিক দেহরক্ষী সেনাদল। বাঁটুল হারিয়ে সম্রাট এত খাপ্পা হয়েছিলেন যে তার দেহরক্ষী পঞ্চাশজন সৈনিককেই প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করেন। অ্যাস্টিড়োনা এদের নায়ক ছিল। সে পালিয়ে যায় প্রথমে। পরে তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আরো চল্লিশজন। বাকি ন’জনের মুণ্ডচ্ছেদ করা হয়। চীনা পরিব্রাজকের কথায় জানা গেল, সেই একচল্লিশ জন গ্রিক সৈনিক লাক রাজ্যে বাস করছে।”
কর্নেল ওই অংশটুকু পড়ার পর বললেন, “আরিয়ানের প্যাপিরাসে লেখা পুঁথি পাওয়া গিয়েছিল আলেকজান্দ্রিয়ার একটি ধ্বংসবশেষে। তা ১৮৯৪ সালে ইংরেজ ঐতিহাসিক হালডেন ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। এই বইটা ১৯০৮ সালে প্রকাশিত চতুর্থ সংস্করণ। কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাতে পেয়ে গিয়েছিলাম। এটা এত কাজে লাগবে ভাবতেই পারিনি।”
বললুম, “কাজে আর কতটুকু লাগল? শিম্পাঞ্জিওয়ালা খুনীকে যদি ধরিয়ে দিতে পারত, তাহলে বুঝতাম!”
কর্নেল আমার পরিহাসে কান করলেন না। আপনমনে বিড়বিড় করে কিছুক্ষণ ‘লাডাক’ এবং ‘গ্রিক দেহরক্ষীদল’ কথাদুটো উচ্চারণ করলেন। তারপর আমার দিকে চেয়ে মিটিমিটি হেসে বললেন, “জয়ন্ত! এই প্রচণ্ড গরমে প্রাণ আইঢাই করছে। যাবে নাকি, লাডাকে? সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পনেরোহাজার ফুট উঁচুতে লাডাকের অবস্থান। এখন সেখানে দারুণ স্নিগ্ধ আবহাওয়া। চিরবসন্তের দেশ ডার্লিং।”
হুঁউ, আমার বৃদ্ধ বন্ধু আমাকে লোভ দেখাচ্ছেন। বললুম, “যেতে আপত্তি নেই। কিন্তু সেখানে সেই খুনে শিম্পাঞ্জি, আর তার দুষ্ট মনিবটির সঙ্গে দেখা হবার চান্স আছে কি?”
“থাকতেও পারে!”
“তাহলেই তো মুশকিল!”
“মুশকিল কীসের?” প্রাজ্ঞ গোয়েন্দাপ্রবর নিভে যাওয়া চুরুটে অগ্নিসংযোগ করে বললেন, “যেখানে মুশকিল, সেখানেই মুশকিল আসান। ডার্লিং জয়ন্ত, শেষপর্যন্ত এই বুড়োকে কিন্তু সত্যি মুসলিম পীর মুশকিল আসান সাজতে হবে এবং তুমি হবে আমার চেলা।”
“ছদ্মবেশ ধরতে হবে নাকি?”
“হুঁউ। লাডাকের অধিবাসীরা মোটামুটি দুটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত। মুসলিম এবং বৌদ্ধ। হিন্দুর সংখ্যা খুবই কম। কাজেই মুসলিম পীর সাজাটা নিরাপদ। কারণ আমাকে বৌদ্ধলামা মানাবে না, যতই নিখুঁত ছদ্মবেশ ধারণ করি, তাছাড়া…” কর্নেল নিজে সাদা দাড়ি দেখিয়ে বললেন, “লামাদের দাড়ি থাকে না। তাই লামা সাজতে হলে আমার এই সুন্দর দাড়িটা হেঁটে ফেলতে হবে। জয়ন্ত, প্রাণ ত্যাগ করতে পারি, কিন্তু এই দাড়ি ত্যাগ করা অসম্ভব।”
উদ্বিগ্ন হয়ে বললুম, “আপনি না হয় সর্বশাস্ত্রজ্ঞ মানুষ। মুসলিম মন্ত্র আওড়ানো আপনার পক্ষে সম্ভব। কিন্তু আমি ওসব কিছু জানিনে!”
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, “ভয় নেই। আমি মাঝে মাঝে যা আওড়াব–তুমিও তাই আওড়াবে।”
সায় দিলুম বটে, কিন্তু ব্যাপারটা ভাল লাগছিল না।
.
পীরবাবার কেরামতি
শ্রীনগর থেকে লাডাকের রাজধানী লেহ-এর দূরত্ব ৪৩৪ কিলোমিটার। শোনমার্গ নামে একটা জায়গা থেকে রাস্তার দু’ধারের দৃশ্য বদলাতে শুরু করেছিল। ফুলে-ফুলে ঢাকা মাঠ, দূরে সাদা তুষারে ঢাকা পর্বতশ্রেণি। রাস্তা ক্রমশ এঁকেবেঁকে চড়াইয়ে উঠছিল। তারপর পাহাড়ের রাজ্য। পিলে চমকানো বাঁকের নিচে অতল খাদ দেখে মাথা ঘুরে যাচ্ছিল। আর কী অদ্ভুত গড়নের সব পাহাড়! কত রকম রঙ তাদের–সোনালী, খয়েরী, কালো, কোনোটা নীল। দিগন্তে যেন আদিম যুগের সব অতিকায় ডাইনোসর দাঁড়িয়ে রয়েছে। কোনো পাহাড়ের গড়ন বেঁটে, কোনোটা যেন দৈত্যের মতো। কোনোটার মাথায় সেকালের ভাঙাচোরা দুর্গ–নিচে পর্যন্ত পাথর ছড়ানো। বৌদ্ধ মন্দির গুম্ফাও দেখতে পাচ্ছিলুম। হদলে রঙের আলখেল্লাধারী বৌদ্ধ ধর্মগুরু লামাদেরও দেখতে পাচ্ছিলুম। দুপুরে লেহ পৌঁছে বাস থেকে আমরা নেমেছিলুম। তখন ছদ্মবেশ ধরিনি।
যে হোটেলে আমরা উঠলুম, তা থিসে গুম্ফার কাছাকাছি নিরিবিলি একটা পাহাড়ের গায়ে, হোটেলের নাম ‘সানি লজ’। তার মালিক সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার। পাঞ্জাবের লোক। অর্জুন সিং নাম। দেখলুম, উনি কর্নেলের পরিচিত। নিচের উপত্যকায় ঘাসের মাঠে গুজ্জর রাখালরা ভেড়া চরাচ্ছিল। অর্জুন সিং বললেন, “ওরা যাযাবর জাতি। ওদের বলা হয় গুজ্জর বখরাওয়ালা। কর্নেল, আপনি নাগপা উপজাতির কথা জানতে চাইছেন তো? নাগপারা থাকে সামনের ওই পাহাড়টার পেছনে। ওদের চেহারা ভারি সুন্দর। কিংবদন্তি আছে যে ওরা নাকি গ্রিকদের বংশধর। গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনী আফগানিস্তানে পৌঁছলে কোনো
কারণে একদল গ্রিক সৈনিক পালিয়ে এসেছিল লাডাকে। নাগপারা তাদেরই নাকি বংশধর।”
