“ঠিক বলেছেন। তবে আলেকজান্ডারের বাঁটুলটা অবশ্য জাল নয় বলে মনে হচ্ছে। কারণ ওর ভেতর হিরে আছে এবং আরিয়ান ঠিক তারই আভাস দিয়েছেন জীবনীগ্রন্থে।”
বেণীমাধব বললেন, “বৈজুনাথের সামনে সেটা তো পরীক্ষা করা যায় না। তাছাড়া সে আমাকে দেবেও না গোপনে তার চোখের আড়ালে পরীক্ষা করতে। তাই ইতস্তত করছিলুম। তখন বৈজুনাথ নিজে থেকে প্রস্তাব দিল, ঠিক আছে। টাকা জোগাড় করে কাগজে বিজ্ঞাপন দেবেন কৌশলে। কারণ আমার পক্ষে আর এখানে আসা সম্ভব হবে না। পুলিশ ওঁত পেতে বেড়াচ্ছে। কোন কাগজে কীভাবে বিজ্ঞাপন দিতে হবে, তাও সে বলে দিয়ে গেল। সে একথাও বলল যে, আমার বাড়িতে যাবে না।”
বৈজুনাথ নামটা তো বাঙালি নয় তাহলে দৈনিক সত্যসেবকে বিজ্ঞাপন দিতে বলেছিল কেন?”
বেণীমাধব হাসলেন। “বৈজুনাথ ওর ছদ্মনাম। ও আসলে বাঙালি। ওর প্রকৃত নাম আমিও জানি না। অনেকগুলো নাম নিয়ে ও কারবার চালাত।”
“তারপর আপনি বিজ্ঞাপন দিলেন?”
“শেষপর্যন্ত দিলাম। আমার লোভ বেড়ে গিয়েছিল। তাছাড়া মনে মনে ঠিক করেছিলুম নির্জন মন্দিরে আমাকে সে বাঁটুলটা বেচামাত্র ওটা খুলে দেখে নেব। যদি হিরে না থাকে, তাহলে….”
“তাহলে পিস্তল দেখিয়ে ওকে ভয় পাইয়ে টাকা ফেরত নেবেন–এই তো?”
“ঠিক বলেছেন।”
“হুঁ–বৈজুনাথ আপনার বাড়ি যেতে চায়নি কেন বোঝা যাচ্ছে। সে ভেবেছিল, বাড়িতে ওকে পেয়ে আপনি ব্ল্যাকমেইল করে কম দাম দেবেন।”
“বৈজনাথ বড় ধুরন্ধর ছিল। কিন্তু বেঘোরে মারা পড়ল শেষ পর্যন্ত।”
এতক্ষণে টের পেলুম, যশোর রোডের সেই মন্দিরে যার মড়া দেখেছি, সেই লোকটা বৈজুনাথ। ভিখিরির ছদ্মবেশেই ওখানে গিয়েছিল সে।
কর্নেল বললেন, “বাঁটুলের ভেতরে হিরের খোঁজ কেউ আগে থেকেই জানত, বেণীমাধববাবু। তাই সে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তার সম্পর্কে আমরা এখনও কিছু জানি না। শুধু এটুকু বুঝতে পারছি যে তার একটা শিক্ষিত শিম্পাঞ্জি আছে। শিম্পাঞ্জিকে দিয়ে সে টেবিলল্যাম্প নিভিয়ে ক্যাসেট বাজিয়ে ভূতপ্রেতের ভয় দেখিয়েছে আপনাকে। সে ভেবেছিল, আলেকজান্ডারের বাঁটুলের ভেতরকার হিরের খবর আপনি জানেন না। অতএব ভূতের উৎপাতে উত্যক্ত হয়ে ভাববেন ওই বাঁটুলটাই এর মূলে এবং ওটা হাতছাড়া করতে চাইবেন। আচ্ছা বেণীমাধববাবু, কেউ কোনোদিন কি আপনার দোকানে এসে বাঁটুলের খোঁজ করেছিল?”
বেণীমাধববাবু বললেন, “বাঁটুল সম্পর্কে কেউ খোঁজ করেনি। তবে হ্যাঁ–একজন খদ্দের কিছুদিন আগে জিগ্যেস করছিল। খ্রীস্টপূর্ব কোনো গ্রিক প্রত্নদ্ৰব্য আমার কাছে পাওয়া যায় নাকি।”
“কেমন চেহারা তার, মনে আছে?”
“আপনার মতোই মুখে দাড়ি ছিল। তবে কালো দাড়ি। বয়স চল্লিশ-বিয়াল্লিশের মধ্যে। লম্বা গড়ন। গায়ের রঙ ময়লা। লোকটাকে আমার মনে আছে। কারণ..” একটু ভেবে বেণীমাধব বললেন, “
হাওর নাকটার জন্য। ওরকম বাঁকা লম্বা নাক সচরাচর দেখা যায় না। বাজপাখির মতো কতকটা। তার চোখে সানগ্লাস ছিল। লোকটাকে আমার পছন্দ হয়নি। কেমন নাকিস্বরে ইংরেজিতে কথা বলছিল।”
কর্নেল গুম হয়ে কী ভাবতে থাকলেন। চোখ বুজে টাকে একবার হাত বুলিয়ে সাদা দাড়িতে আঁচড় কাটতে থাকলেন অভ্যাসবশে। আমি একটা পত্রিকায় চোখ রাখলুম। বেণীমাধব উসখুস করছিলেন। কী বলতে ঠোঁট ফাঁক করলেন। সেই সময় কর্নেল বললেন, “পার্কস্ট্রিটে বৈজুনাথের সেই বন্ধুর চেহারা কেমন?”
বেণীমাধববাবু বললেন, “নাঃ। সে নয়। সে যত ছদ্মবেশে আসুক, আমি চিনে ফেলব। তাছাড়া সে ফর্সা, মোটাসোটা। তার নাকটা বেঁটে। আমার বয়সী লোক।”
“নাম কী?”
“ভোমরলাল চোপরা। অবাঙালি। এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের বড় ব্যবসা আছে। তবে বুঝতেই পারছেন, সে কেমন।”
“ঠিকানাটা লিখে দিন প্লিজ। ফোন নাম্বার জানলে তাও লিখে দিন।”
বেণীমাধব একটুকরো কাগজে ঠিকানাটা লিখে দিলেন। কর্নেল সেটা পকেটে ঢুকিয়ে রেখে বললে, “ঠিক আছে। আপনি কিছু ভাববেন না বেণীমাধববাবু। আপনার মূল্যবান জিনিস নিরাপদেই থাকছে। খুনে শিম্পাঞ্জির মালিককে খুঁজে বের করতে একটু সময় লাগবে এই যা।”.
বেণীমাধববাবু চলে গেলে বললুম। “ভোমরালালের পক্ষে বাঁটুলের গুপ্তরহস্য জানা খুবই সম্ভব। তাই না কর্নেল?”
কর্নেল একটু হেসে ফোন তুলে ডায়াল করলেন। তারপর ওঁর এইসব কথাবার্তা শুনলুম। ইংরেজিতেই কথা বলেছিলেন কর্নেল।…”হ্যালো! আমি মিঃ চোপরার সঙ্গে কথা বলতে চাই।…ও, আচ্ছা! কোথায়! ..আচ্ছা, আচ্ছা।…হ্যাঁ, আমি ওঁর এক বন্ধু কথা বলছি। আমার নাম বি.এম.রায়। কবে ফিরবেন বলে গেছেন? …কিন্তু আমার যে জরুরি দরকার ওঁর সঙ্গে। ট্রাংক কলে কথা বলব, যদি ঠিকানাটা দয়া করে জানান।..বুঝেছি! আচ্ছা, ঠিক আছে।”
কর্নেল ফোন রেখে বললেন, “চোপরা গেছে কাশ্মীরে বেড়াতে। শ্রীনগরে দুদিন থেকে যাবে লাডাকে। ওর পি. এ. ফোন ধরেছিল। বলল, ওঁর সঙ্গে ট্রাংকলে যোগাযোগ করা যাবে না, কোথাও থাকার ঠিক নেই।”
হাসতে হাসতে বললুম, “কলকাতার গরম সহ্য হচ্ছিল না। তাই বুঝি লাডাকে?”
কর্নেল বললেন, “লাডাকের রাজধানী লেহ। সেখানে নাকি চোপরার কোম্পানির একটা ব্রাঞ্চ অফিস আছে। ওর পি. এ. বলল। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, চোপরা একটু কিছু আঁচ করেই কেটে পড়েছে কলকাতা থেকে। কারণ ওর পি. এ. বলল কবে কলকাতা ফিরবে ঠিক নেই। লাভাক থেকে বিদেশেও যেতে পারে।”
