ডাঃ মজুমদারের বাড়ির সামনের লনে আমরা বসলুম। রাত প্রায় সাড়ে দশটা বাজে। জোরাল হাওয়া দিচ্ছিল বলে মশার উৎপাত নেই। কফি এল একপ্রস্থ। কফি খেতে খেতে ডাঃ মজুমদার বলেন, “লোকটার পরিচয় না পেলে কিছু বোঝা যাবে না। দেখে মনে হল, পাগলা ভিখিরি-টিখিরি যেন। ওকে খুন করল কেন?”
কর্নেল হাসলেন। “বাঁটুল রহস্য আরো ঘনীভুত হলে ডাঃ মজুমদার। শুধু এটুকুই আপাতত বলতে পারি।”
আমি বললুম, “বেণীমাধবের কাছেই সব রহস্যের চাবি রয়েছে। চলুন না, তার কাছে যাই!”
কর্নেল হাসলেন। “দরকার নেই ডার্লিং! উনিই কাল সকালে আমার কাছে হাজির হবেন।”
ডাঃ মজুমদার বললেন, “আচ্ছা কর্নেল, শিম্পাঞ্জিকে দিয়ে মানুষ খুন করানো কী সম্ভব?”
“নিশ্চয় সম্ভব। শিম্পাঞ্জি বুদ্ধিমান প্রাণী। তাকে খুন করতে শেখানো মোটেও অসম্ভব কিছু নয়। প্রথমে মানুষের ডামি তৈরি করে ডামির গলায় ফাঁস আটকানোর ট্রেনিং দিলেই শিখে নেবে। বেণীমাধবের ঘরে টেবিলল্যাম্প না নিভলে ভৌতিক উপদ্রব শুরু হয় না। তাই শিম্পাজিটাকে তার মালিক টেবিলল্যাম্পের সুইচ অফ করতেও শিখিয়েছে। আরো কত কী শিখিয়েছে কে জানে!”
“ভৌতিক উপদ্রবটা সত্যি অদ্ভুত!” ডাঃ মজুমদার বললেন। “ব্যাপারটা কী হতে পারে?”
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, “নিছক একটা ক্যাসেটে টেপের ব্যাপার সম্ভবত। বেণীমাধবের ঘরে আলো না থাকলেই ব্যাপারটা জমে ওঠে। আলো জ্বললে ভূতুড়ে উৎপাত মোটেও জমে না। বরং ধরা পড়ার চান্স থাকে। আমার ধারণা, শিম্পাঞ্জিটা খুদে টেপরেকর্ডার নিয়ে এসে জানালা ধারে সেটা চালিয়ে দেয়। ক্যাসেটে কাঁচ ভাঙার শব্দ, ফিসফিস করে কথাবলার শব্দ, হাঁটাচলার শব্দ–সবই রেকর্ড করা আছে।”
অবাক হয়ে বললুম, “কিন্তু এর উদ্দেশ্য কী?”
কর্নেল বললেন, “হয়তো কেউ কোনো কারণে বেণীমাধববাবুকে ভয় দেখাচ্ছে।” ডাঃ মজুমদার মন্তব্য করলেন, “কিছু বোঝা যাচ্ছে না। রহস্য সত্যিই ঘনীভূত…”।..
.
পলাতক দেহরক্ষী অ্যাস্টিডোনা
পরদিন সকালে কর্নেলের বাড়ি গিয়ে দেখি বেণীমাধব হাজির। এদিন ওঁকে ভীষণ বিপর্যস্ত দেখাচ্ছিল। চোখদুটো লাল। উস্কখুস্ক চুল। আমাকে দেখে কোনো সম্ভাষণ করলেন না। কর্নেলের সঙ্গে আগের কোনো কথার জের টেনে বললেন, “যা বলছিলুম, কর্নেল! সত্যি আমি এতখানি তলিয়ে ভাবিনি। নইলে আপনাকে ব্যাপারটা জানাতুম। বৈজুনাথের সঙ্গে আমার অনেকদিনের কারবার। দুনিয়া জুড়ে ওর ঘাঁটি। অদ্ভুত-অদ্ভুত পুরনো জিনিস জোগাড় করে সে কিউরিও শপে বেচে। আলেকজান্ডারের বাঁটুল আমি তার কাছেই কিনেছিলুম। বাঁটুলটা কেনার পর বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলুম। জিনিসটা বেচার ইচ্ছে ছিল না। ভেবে ছিলুম সাজিয়ে রাখব ঘরে। কিন্তু রাখতে গিয়ে হাত থেকে পড়ে গেল। তারপর দেখি…”
কর্নেল কথা কেড়ে বললেন, “দেখলেন না যে ওটা দুভাগ হয়ে গেছে এবং ভেতরে আছে। একটা প্রকাণ্ড হিরে!”
আমি চমকে উঠলাম। বেণীমাধবের মুখেও বিস্ময় ফুটে উঠল। বললেন, “তাহলে আপনি দেখেছেন।”
“হ্যাঁ।” কর্নেল বললেন। “তবে বাঁটুলটা আমার হাত থেকে দৈবাৎ পড়ে যায়নি। ওর ভেতরে, হিরে লুকানো আছে, সেটা আরিয়ানের লেখা সম্রাট আলেকজান্ডারের জীবনী পড়েই জেনেছি। ওটা দেখতে বাঁটুলেরই মতো এবং গ্রিক যোদ্ধারা আত্মরক্ষার জন্য এ জিনিস কাছে রাখতেন বটে, কিন্তু কিছু বাঁটুলের ভেতর মূল্যবান পাথর রা মণিমুক্তাও লুকিয়ে রাখা হত। সেগুলো আসলে বাঁটুল নয়, কৌটো। বিশেষ করে দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে কিংবা পররাজ্যে হানা দেবার সময় এই অদ্ভুত কৌটো কাজে লাগাত। লুণ্ঠিত বিশেষ মণিমুক্তা এর ভেতর নিরাপদে রাখা যেত। কেউ টের পেত না। ভাবত, ওটা আত্মরক্ষার অস্ত্র মাত্র।”
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে ফের বললেন, “আপনি বাঁটুলটা দিয়ে গেলে আতস কাঁচের সাহায্যে পরীক্ষা করে দেখেছিলুম, ওটার মাঝামাঝি জোড়া দেওয়া এবং একটা কালো বিন্দু রয়েছে। সেখানে ছুরির ডগার চাপ দিতে খুলে গেল। অবাক হয়ে দেখলুম, ভেতরে প্রকাণ্ড একটা হিরে ঝলমল করছে। তখন বুঝলুম কেন এটা আপনি আমার জিম্মায় রাখতে দিয়ে গেছেন।”
বেণীমাধব বললেন, “বৈজুনাথ বলেছিল, এরকম গ্রিক বাঁটুল তার কাছে আরো একটা আছে। সেটা নাকি সম্রাট আলেকজাণ্ডারের বাবা ফিলিপের। বৈজুনাথ সেটার দাম দেড়গুণ বেশি চেয়েছিল। আমি তখনও জানি না এর ভেতর কী আছে। তাই বেশি দাম শুনে নিতে রাজি হইনি। পরে পস্তাম খুব। বৈজুনাথের বিরুদ্ধে দেশবিদেশের প্রত্নদ্রব্য নিয়ে চোরাকারবারের অভিযোগে পুলিশের হুলিয়া ঝুলছে। প্রকাশ্যে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন। সে-ও বরাবর গোপনে দেখা করত। তার এক বন্ধু থাকে পার্কস্ট্রিটে। তাকে বলে এলুম বৈজুনাথ যেন শিগগির দেখা করে আমার সঙ্গে। কিন্তু কদিন পরে বৈজুনাথ আমার দোকানে এল ভিখিরির ছদ্মবেশে। কিন্তু আমার গরজ দেখে সে এবার বাঁটুলটার দাম আরো বাড়িয়ে দিল।”
কর্নেল জিগ্যেস করলেন, “কত চাইল বৈজুনাথ?”
“আলেকজান্ডারের বাঁটুলের দাম চেয়েছিল পাঁচহাজার টাকা। দরাদরি করে তিনহাজারে কিনেছিলুম। এটার দাম চাইল দশ হাজার টাকা। অথচ প্রথমে চেয়েছিল মোটে ছ’হাজার টাকা।”
“তারপর আপনি কী বললেন ওকে?”
“আমি একটু দ্বিধায় পড়লুম। যদি এ বাঁটুলটার ভেতর হিরে না থাকে? তাছাড়া….” একটু বিষণ্ণভাবে হাসলেন বেণীমাধব। তাছাড়া বাঁটুলটা যে সত্যিসত্যি ফিলিপের, তার প্রমাণ কী? ওটা। জাল বাঁটুলও তো হতে পারে। প্রত্নদ্রব্য হিসেবে এসব জিনিসের বাজার দর প্রচণ্ড। তাই জাল হওয়া খুব স্বাভাবিক।”
