জিপটা একটু থেমেই চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে মন্দিরের কাছাকাছি এসে ব্রেক কষল একটা প্রাইভেট কার। গাড়ির দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির ভেতরে আলো জ্বলল এবং দেখলুম বেণীমাধব নামছেন। তিনি একা এসেছেন গাড়ি নিয়ে। উত্তেজনায় আমার দম আটকে যাচ্ছিল। বেণীমাধব গাড়ি থেকে নেমে মন্দিরের সামনে এসে একটু কাশলেন। মন্দিরের সামনে পাঁচিল এবং উঁচু ফটক রয়েছে। ফটক দিয়ে তাকে ভেতরে ঢুকতে দেখলুম। পাঁচিলটা তত উঁচু নয়। বেণীমাধবকে আবছা দেখা যাচ্ছিল। ভেতরে গিয়ে উনি আবার কাশলেন। তারপর টর্চ জ্বেলে মন্দিরের ভেতরে আলো ফেললেন। আমরা এবার উঠে দাঁড়িয়ে ওঁর ক্রিয়াকলাপ লক্ষ্য করছি। টর্চের আলোটা কয়েক সেকেন্ড মাত্র স্থির রইল। তারপর বেণীমাধব আলো নিভিয়ে ফেললেন এবং হন্তদন্ত ফিরে চললেন ওঁর গাড়ির দিকে।
কর্নেল চেঁচিয়ে উঠলেন, “বেণীমাধববাবু! বেণীমাধববাবু!” তারপর দৌড়লেন রাস্তার দিকে। সেই সময় মন্দিরের দুপাশ থেকে কয়েকজন পুলিশ বেরিয়ে টর্চ জ্বালল। ভারিক্তি গলায় পুলিশ অফিসারের হাঁকডাক শুনতে পেলুম-”গাড়ি থামান! নইলে গুলি করব।”
কিন্তু বেণীমাধবের গাড়িটা বোঁ করে গুলতির মতো ছুটে গেল। পুলিশের জিপটা একটু তফাতে গাছের আড়ালে দাঁড় করানো ছিল। পুলিশ অফিসার এবং কনস্টেবলরা দৌড়ে গিয়ে জিপে চাপলেন। তারপর জিপটা দ্রুত ছুটল বেণীমাধবের গাড়ির উদ্দেশে। কর্নেল চেঁচিয়ে কিছু বললেন পুলিশ অফিসারকে, হয়তো কানে গেল না।
ঘটনাটা এত ঝটপট ঘটে গেল যে আমার হকচকানি কাটতে সময় লাগল। কর্নেল ততক্ষণে ফটক দিয়ে মন্দিরবাড়িতে ঢুকেছেন। ডাঃ মজুমদার আর আমি অন্ধকারে বটতলায় দাঁড়িয়ে আছি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে। এবার হুঁশ ফিরল। দুজনে মন্দিরবাড়িতে গিয়ে ঢুলুম।
কর্নেল টর্চ জ্বেলে মন্দিরের ভেতর আলো চমক খাওয়া স্বরে বললেন, “ এ কী!”
যা দেখলুম, শরীর শিউরে উঠল আতঙ্কে। শিবলিঙ্গের নিচে একটা লোক চিত হয়ে পড়ে আছে। তার চোখদুটো ঠেলে বেরিয়েছে। দাঁতের ফাঁকে জিভও বেরিয়ে রয়েছে। বীভৎস দেখাচ্ছে তাকে। নাকের তলায় একটু রক্তও আছে। মনে হল, কেউ লোকটাকে মেরে ফেলেছে। লোকটার মুখে খোঁচাখোঁচা গোঁফ দাড়ি। দেখতে ভিখিরিদের মতো।
ডাঃ মজুমদার বললেন, “সর্বনাশ! এ আবার কে?” তারপর হন্তদন্ত হয়ে মন্দিরে ঢুকলেন জুতো খুলে রেখে। কর্নেল বললেন, “আপনিই পরীক্ষা করে দেখুন। আমি মন্দিরে ঢুকব না।”
টর্চের আলোটা পরীক্ষা করে দেখার পর ডাঃ মজুমদার গম্ভীর মুখে বললেন, “বহুক্ষণ আগেই মারা গেছে। গলায় ফাঁস আটকে মেরে ফেলা হয়েছে সম্ভবত। হা–এই যে দেখছি, নাইলনের দড়ি পড়ে রয়েছে। কর্নেল, আমার মনে হচ্ছে–শিবলিঙ্গের আড়ালে খুনী বসেছিল ওত পেতে। এই লোকটা যে কোনো কারণেই হোক, এখানে ঢুকে সম্ভবত প্রণাম করছিল। সেই সময় গলায় আচমকা ফঁস আটকে হ্যাঁচকা টান দিয়েছে।”
তারপর উনি পায়ের কাছে ঝুঁকে কী কুড়িয়ে নিলেন। উত্তেজিতভাবে বললেন, ফের, “কর্নেল! কর্নেল! এ যে দেখছি সেইরকম কালো-কালো লোম! দেখুন!”
কর্নেল হাত বাড়িয়ে নিলেন। টর্চের আলোয় পরীক্ষা করে বললেন, “হ্যাঁ। প্রাণীটা যে শিম্পাঞ্জি, তাতে কোনো ভুল নেই। কিন্তু পুলিশ অফিসার ভদ্রলোকের কাণ্ড দেখুন। আমি বারণ করলুম বেণীমাধববাবুর পেছনে ছুটতে। শুনলেন না। বেণীমাধববাবুকে তো ওঁরা বাড়িতেই পাওয়া যেত পরে। আসল রহস্য পেছনে ফেলে রেখে ওঁর পেছনে ছোটার মানে হয় না।”
ডাঃ মজুমদার বললেন, “পুলিশ বেণীমাধবকে পাকড়াও করে করবেটা কী? উনি প্রভাবশালী লোক। তাছাড়া ওঁর বিরুদ্ধে অভিযোগটাই বা কী? মন্দিরে আসা নিশ্চয় অপরাধ নয়।”
“আমার ধারণা, পুলিশ আপনার বক্তব্য ঠিক বুঝতে পারেনি।
“আমি ওদের বলেছিলুম, মন্দিরতলায় একটা চোরাই মাল কেনাবেচা হবে। আপনার কথা বলেছিলুম। যাকগে, এখন এই লাশটার ব্যাপারে কী করা যায় বলুন তো?”
কর্নেল রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। একটু হেসে বললেন, “মনে হচ্ছে, বেণীমাধবের সঙ্গে তর্কাতর্কি করে পুলিশ ফিরে আসছে। বেণীমাধবকে গ্রেফতার করা সম্ভব নয়। বিনা অভিযোগে।”
পুলিশের জিপটা সত্যি ফিরে এল। জিপ থেকে নেমে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলেন সেই পুলিশ অফিসার। বললেন, “বেণীমাধব রায় মহা ধড়িবাজ লোক। বলে কী, মন্দিরে প্রণাম করতে গিয়েছিলুম। যাই হোক, ওঁকে ঘাঁটালুম না আপাতত। কিন্তু অন্য পার্টি তো এল না কর্নেল।”
কর্নেল গম্ভীর হয়ে বললেন, “ এসেছিল। কিন্তু তৃতীয় এক পার্টি তাকে খুন করে মাল হাতিয়ে কেটে পড়েছে অনেক আগেই। ওই দেখুন।”
মন্দিরের ভেতর লাশটা দেখেই পুলিশ অফিসার চমকে উঠলেন। “সর্বনাশ! এ আবার কে?”
কর্নেল বললেন, “যেই হোক, একে কিন্তু বেণীমাধববাবু খুন করেননি–তা আপনারা এবং আমরা সবাই দেখেছি। বেণীমাধব এই মড়াটা দেখেই ভয় পেয়ে চলে গেছেন। আইনত উনি বড়জোর একজন সাধারণ সাক্ষী হতে পারেন। যাইহোক, বডিটা মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন এখনই।”
আমরা রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালুম। পুলিশ অফিসার আবার জিপ নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। কনস্টেবলরা মন্দিরে পাহারায় রইল। কর্নেল বললেন, “চলুন ডাঃ মজুমদার। কনস্টেবলদের বলে যাচ্ছি, দরকার হলে আমাদের সঙ্গে আপনার বাড়িতে যোগাযোগ করবে ওরা। এখানে দাঁড়িয়ে কোনো লাভ নেই।”
