কথাটা মনে ধরল ওঁর। বাড়ির পেছনে আগাছা ঢাকা জমি পেরিয়ে তারকাঁটার বেড়ার ফোকর খুঁজতে দেরি হল না। ওধারের রাস্তা থেকে যথেষ্ট আলো আসছিল। খালের ধারে দাঁড়িয়ে কোনো থেমে থাকা গাড়ি দেখা গেল না। যাবে না, তা তো আমি জানিই। কিন্তু ওঁকে আটকে রাখা দরকার। বললুম, “খাল পেরিয়ে গেল ভাল হত। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না কিছু। রাস্তার মধ্যিখানে আইল্যান্ডে ওইসব জসল করে রেখেছে যে!”
বেণীমাধব বললেন, “ঠিক বলেছেন জয়ন্তবাবু। চলুন!”
কিন্তু পা বাড়াতে গিয়ে কর্নেলের ডাক কানে এল। “বেণীমাধববাবু! জয়ন্ত! কোথায় আপনারা?”
কর্নেল বাড়িটার পেছনের বারান্দা থেকে ডাকছিলেন। অগত্যা আমরা ফিরে এলুম। আসতে আসতে বেণীমাধব রুষ্টভাবে বললেন, “কালই নিজের খরচায় ফোকরটা বন্ধ করে দেব। গভমেন্টের লোকেরা কিছু লক্ষ্য রাখে না।”
ঘরে ঢুকে ক্লান্তভাবে উনি বসলেন। কর্নেল একটু হেসে বললেন, “এভাবে ঘর খোলা রেখে যাওয়া আমি সঙ্গত মনে করিনি। তাই উত্তেজনা দমন করে পাহারা দিলুম। কোন দিকে পালাল দেখলেন?”
বেণীমাধব শ্বাস ছেড়ে বললেন, “দেখতে পেলে তো গুলি করে মারতুম। টর্চ নিতে মনে ছিল না। আলো-আঁধার হয়ে আছে জায়গাটা।”
আমি বললুম, “বোঝা যাচ্ছে, কোনো কারণে, কেউ মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাই জন্তুটা সন্ধ্যা হতে না হতেই পাঠিয়ে দিয়েছিল আপনার বাড়িতে। সম্ভবত ঘরে ঢুকে লুকিয়ে থাকত খাটের নিচে।
বেণীমাধব র্যাকের মাথা থেকে টর্চ দিয়ে ঝটপট খাটের তলাটা দেখলেন। ওঁর মুখে উদ্বেগ ফুটে উঠেছিল। এবার মনে হল, ভেতর ভেতরে খুব ভয় পেয়ে গেছেন।
আবার কফি এল। কফি শেষ করে ঘড়ি দেখে কর্নেল বললেন, “আজ উঠি বেণীমাধববাবু। আপনার ভাগ্নে অমলবাবুর ফিরতে বোধকরি রাত হবে। ওর সঙ্গে পরে সময়মতো আলাপ করা যাবে।
বেণীমাধববাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পৌঁছে হেসে ফেললুম। কর্নেল ধমকের সুরে বললেন, “চুপ। কোনো কথা নয়।”
ইলিয়ট রোডে কর্নেলের ফ্ল্যাটে পৌঁছলুম যখন, তখন রাত আটটা বেজে গেছে। কর্নেল সোফায় আরাম করে বসে চুরুট ধরিয়ে বললেন, “তাহলে বোঝা গেল, একটা আজগুবি জন্তু–ধর, কোনো বাঁদরই তার মনিবের হুকুমে সত্যিসত্যি বেণীমাধবের বাড়ির জানালায় হাত বাড়িয়ে টেবিলল্যাম্প নিভিয়েছিল। এই ঘটনাটা মিথ্যা হলে বেণীমাধব আমার কথা শুনে অমন হুলস্থূল করে ছুটে বেড়াতেন না।“
“কিন্তু ওঁর ঘরে গোয়েন্দাগিরি করলেন কেন আপনি?”
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, “দুটো জিনিস পরীক্ষা করার সুযোগ নিয়েছিলুম। একঢ়িলে দুটো পাখি মারা বলতে পার। প্রথমটার কথা বললুম তোমাকে। দ্বিতীয়টা হল দৈনিক সত্যসেবকের সেই বিজ্ঞাপনসংক্রান্ত। বেণীমাধবের ড্রয়ারে নোটবইয়ের ভেতর বিজ্ঞাপনের একটা কাটিং দেখলুম। সেটার চেয়ে বিস্ময়কর হল, দৈনিক সত্যসেবকের সেই বিজ্ঞাপন বিভাগের একটা রসিদ। একশো কুড়ি টাকা দিয়ে বেণীমাধবই ওই বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। হ্যাঁ–তোমাকে বললে তুমিই তোমাদের কাগজের বিজ্ঞাপন বিভাগ থেকে ওই তথ্যটুকু এনে দিতে পারতে। কিন্তু বেণীমাধববাবুর বাড়ি যাওয়ার পর কথাটা আমার মাথায় এসেছিল হঠাৎ।”
“কেন?” কর্নেল আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন না। চোখ বুজে চুরুট টানতে থাকলেন। তারপর একসময় চোখ খুলে বললেন, “আজ শুক্রবার। রবিবার আগামী পরশু। তৈরি থেকো জয়ন্ত।”
কিছুক্ষণ পরে কর্নেলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যখন বাড়ির পথে চলেছিল, তখন মাথাটা ভো ভো করছে। কিছুতেই মাথায় আসছে না, বেণীমাধবের ওইরকম অদ্ভুত বিজ্ঞাপন দেওয়ার কারণ কী?
.
মন্দিরে মৃত্যুর ত্রাস
দমদম এয়ারপোর্ট ছাড়িয়ে কিছুদুর যাওয়ার পর যশোর রোডের ধারে কর্নেলের এক বন্ধু ডাক্তার শিবকালী মজুমদারের বাড়ি। ডাঃ মজুমদার কর্নেলের বয়সী। কিন্তু কর্নেলের মতো মোটাসোটা তাগড়াই নন। বেঁটে রোগাটে গড়ন। প্রকাণ্ড গোঁফ। তাঁর সঙ্গে আমার চেনাজানা অনেকদিনের। রবিবার সন্ধ্যায় কর্নেলের সঙ্গে পৌঁছে দেখি, ডাঃ মজুমদার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।
বাড়ির সামনে ঢাকা লনে চেয়ার পেতে বসে অনেক গল্পসল্প হল। রাতের খাওয়াদাওয়ার পর ডাঃ মজুমদার বললেন, “সাড়ে নটা বাজে। এখনই বেরিয়ে পড়া যাক। মন্দিরতলা অবশ্য কাছেই। থানাতেও আপনার কথামতো সব জানিয়ে রেখেছি। আমরা মন্দিরের পেছনে পুকুরপাড় ঘুরে যাব। মন্দিরে রাতে কেউ থাকে না।”
ডাঃ মজুমদার এর আগে কয়েকটা কেসে কর্নেলকে সাহায্য করেছেন। সেগুলো ছিল হত্যাকাণ্ড। ডাঃ মজুমদার একজন নামকরা ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ। এটা অবশ্য হত্যাকাণ্ডের কেস নয়। তবু সঙ্গে তিনি থানায় আমার ভালই লাগছিল।
ওঁর বাড়ির পেছনে অন্ধকার মাঠের ধানক্ষেত, সজিক্ষেত আর চাষ জমিতে জলকাদায় একাকার হয়ে সেই পুকুরপাড়ে পৌঁছলুম। ঘন আগাছার জঙ্গল সেখানে। টর্চের আলো সাবধানে পায়ের কাছে ফেলে তিনজনে হাঁটছিলুম। পুকুরটা খুব গভীর মনে হল। যশোর রোডে মোটরগাড়ি চলাচলের বিরাম নেই। হেডলাইটের ছটা বারবার দেখিয়ে দিচ্ছিল সামনের মন্দিরটাকে। সেকালের বিশাল মন্দির। বটগাছ আছে পাশে। আমরা বটগাছের আড়ালে ওঁত পেতে বসলুম। ঘড়িতে নটা পঁয়তাল্লিশ, তখন রাস্তায় একটা জিপ যাচ্ছে দেখতে পেলাম। পেছনে একটা ট্রাক আসছিল, তার আলোয় জিপটাকে পুলিশের বলে মনে হল। জিপটা ট্রাকটাকে যেতে দিয়ে বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়ে থামল। ডাঃ মজুমদার ফিসফিস করে বললেন, “পুলিশ এসে গেল তাহলে।”
