বেণীমাধবের শোবার ঘরটা বেশ বড়। খাটের পাশে একটা টেবিল। তার গা ঘেঁষে জানালা। সেই জানালা দিয়ে একটা লোমশ হাত ঢুকে টেবিলল্যাম্প নিভিয়ে দিয়েছিল। কর্নেল খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে বললেন, “হ্যাঁ–অনেক লোম পড়ে আছে দেখা যাচ্ছে। আচ্ছা বেণীমাধববাবু, কাল রাতে যখন ঘটনাটা ঘটল, তারপর কোনো মোটরগাড়ির শব্দ শুনেছিলেন কি?”
বেণীমাধব বললেন, “পেছনে খালের ওধারে ভি. আই. পি. রোড। সে শব্দ তত দিনরাত সবসময় শোনা যায়।”
“না। ধরুন, কাছাকাছি কোনো গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার শব্দ শুনেছিলেন কি?”
“খেয়াল করিনি।”
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, “খালের ধারে তারকাটার বেড়ার একটা জায়গা কেউ ফঁক করে রেখেছে দেখে এলুম। সেখানেও এমনি কালো লোম পড়ে আছে কাজেই বানরজাতীয় প্রাণী ওই পথেই এসেছিলাম। ওদিকে খালের ওপর একটা কাঠের পোলও দেখতে পেলুম। আমার ধারণা, প্রাণীটা কেউ পুষেছে এবং ট্রেনিং দিয়েছে। তারপর গাড়ি করে তাকে এনে আপনার বাড়ির দিকে পাঠিয়েছে।”
বেণীমাধববাবু চিন্তিতমুখে বললেন, “কিন্তু কেন? টেবিলল্যাম্পটা নিভিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য কী?”
“টেবিলল্যাম্প তো সারারাত জ্বালিয়ে রাখেন বলেছিলেন?”
“হ্যাঁ কর্নেল। ভূতুড়ে কাণ্ড কয়েকরাত চলার পর ওটা জ্বালিয়ে রাখতে শুরু করি।”
“টেবিলল্যাম্প জ্বললে আর কোনো উৎপাত ঘটে না বুঝি?”
“না।”
“তাহলে বোঝা যাচ্ছে, টেবিলল্যাম্প কেন নেভানোর দরকার হয়েছিল।” কর্নেল অন্যমনস্কভাবে বললেন। তারপর একটু হাসলেন। “টেবিলল্যাম্পটা এপাশে সরিয়ে ভালই করেছেন। মে মাসের এই গরমে জানালা বন্ধ করা যাবে না। প্রাণীটার নাগালের বাইরে রাখাই ভাল। তা আপনি কি মশারি খাঁটিয়ে শোন?”
“উপায় নেই কর্নেল। সল্টলেকে বারমাস যা মশার উৎপাত।”
ঘরের ভেতর আসবাবপত্র প্রচুর। বেশিরভাগই সেকেলে ডিজাইনের জিনিস। আমি প্রকাণ্ড একটা কাঠের আলমারির দিকে তাকিয়ে আছি দেখে বেণীমাধব একটু হেসে বললেন, “এসব জিনিস আমার ঠাকুরদার আমলের। মায়াবশে এগুলো বদলে আধুনিক ডিজাইনের ফার্নিচার কিনিনি। তাছাড়া আজকালকার জিনিস বড় ঠুনকো।”
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, “পুরানো জিনিসের প্রতি ওঁর মায়া থাকা স্বাভাবিক, জয়ন্ত। ওঁর কিউরিও শপ তার প্রমাণ।”
বেণীমাধব বললেন, “ঠিক বলেছেন, কর্নেল। যে জিনিস যত পুরনো, তার প্রতি আমার তত মায়া। বাতিকও বলতে পারেন। ওই যে ব্রোঞ্জের প্রদীপটা দেখছেন, ওটা গুপ্তযুগের। টাকার অংকে ওটার দাম লক্ষ টাকা–কিন্তু ওটা বেচিনি। দোকান থেকে এনে রেখেছি। আর এই পোড়ামাটির সিংহটা দেখছেন, ওটা ভারহুত স্তূপ থেকে সংগৃহীত। নানা হাত ঘুরে আমার হাতে এসেছিল। এটাও বেচিনি।” তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে ফের বললেন। “বাঁটুলটাও আমি মায়ায় পড়ে বেচিনি। বিক্রী করতে চাইলে ওর দাম পেতুম দেড়কোটি টাকা।”
কথা বলতে বলতে কখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ঘরে আলো জ্বলেছে। একবার কফি, একবার চা এবং কিছু মিষ্টদ্রব্যও খাওয়া হয়েছে আমাদের। হঠাৎ কর্নেল উত্তেজিতভাবে একটা জানালার দিকে আঙুল তুলে বলে উঠলেন, “আরে ওটা কী।” তারপর হন্তদন্ত হয়ে ওদিকে উঠে গেলেন। পর্দা তুলে প্রায় চৈচিয়ে বললেন, “বেণীমাধববাবু! সেই আজগুবি বাঁদরটা পালাচ্ছে! এই মাত্র উঁকি দিচ্ছিল এখানে।”
বেণীমাধব লাফিয়ে উঠে বললেন, “তবে রে ব্যাটা!” তাপর বিছানার চাদর তুলে ওঁর পিস্তলটা নিয়ে রাগে অস্থির হয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। বাইরে ওঁর চেঁচামিচি শুনলুম।
আমি হকচকিয়ে গিয়েছিলুম। এবার আরও ভড়কে গেলুম কর্নেলের কাণ্ড দেখে। বেণীমাধববাবু বেরিয়ে যেতেই উনি তার বিছানার তলায় হাত ভরে একটু চাবির গোছা টেনে নিলেন। তারপর ঝটপট একটা টেবিলের ড্রয়ারের চাবি মেলাতে থাকলেন। কয়েকটা চাবির পর একটা চাবি ফিট করল। তখন ড্রয়ার খুলে কী সব হাতড়াতে-হাতড়াতে চাপা গলায় বললেন, “জয়ন্ত! তুমি ওঁকে কিছুক্ষণ আটকে রাখো গিয়ে। বুঝতে পেরেছ কী বলছি?”
কর্নেলের সঙ্গে বহুবছর কাটাচ্ছি। আমাকে কী করতে হবে তখনই টের পেয়েছিলুম। পেছনের দরজায় বেরিয়ে দেখি, ঠাকুর-চাকর-দারোয়ান সবাই বেরিয়ে পড়েছে। তারা খামোকা “চোর! চোর!” বলে চেঁচাচ্ছে। বেণীমাধব পিস্তল উঁচিয়ে কাঁটাতারের বেড়াটার দিকে নজর রেখে দাঁড়িয়ে আছেন সম্ভবত তার ধারণা, প্রাণীটা ফোকর গলিয়ে পালানোর চেষ্টা করবে। অমনি তাকে গুলি করবেন।
আমি গিয়ে তফাতে অন্ধকারে একটা ঝোঁপের দিকে আঙুল তুলে চেঁচিয়ে উঠলুম, “ওই পালাচ্ছে।”
বেণীমাধব “কই, কই,– বলে সেদিকে ছুটলেন। আমি তার পেছনে দৌড়লুম। তারপর ফের প্রাণীটাকে দেখতে পাওয়ার ভান করে বললুম, “দেখুন তো, ওটা কুকুর, না সেই জন্তু?
বেণীমাধব হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, “কোথায় কোথায়?”
“ওপাশে ওই যে বাড়িটা তৈরি হচ্ছে, তার ভেতর ঢুকল যেন।”
“চলুন তো দেখি!”
বাড়িটার ভেতর অন্ধকার ঠাসা। বেণীমাধব বললেন, “টর্চটা আনা উচিত ছিল। থাগে। মনে হচ্ছে, ব্যাটাচ্ছেলে কেটে পড়েছে, চলুন।”
আসতে আসতে বললুম, “এক কাজ করলে হত না বেণীমাধববাবু? কর্নেল বলেছিলেন, ভি. আই. পি.রোডে গাড়ি চাপিয়ে কারা প্রাণীটাকে নিয়ে আসে। চলুন তো, সেই ফোকর গলিয়ে আমরা দেখে আসি। অন্তত গাড়ির নম্বর নিতে পারব।”
