তাদের বাঁটুল কি একালের মার্বেলের গুলির মতো হবে।”
বুঝলুম, রসিকতা করছেন। চটে যাওয়ার ভান করে বললুম, বাজে কথা বলবেন না! বরং এত ভেজাল খেয়ে এবং দূষিত বাতাসে নিঃশ্বাস নিয়েও একালের মানুষ যা করছে, তা সেকালের ওই বীরপুরুষেরা কল্পনাও করতে পারতেন না। আমার ধারণা, বেণীমাধববাবু এই সকালবেলা একটা আজগুবি গল্প বলে তাকে তাক লাগিয়ে দিলেন।”
“তাই বুঝি?”
“ঠিক তাই। ভুঁয়ো বাঁটুলটা একটা ছল। লোমগুলো নিশ্চয় কোনো বাড়ির রোয়াকের আড্ডাবাজ কোনো পাঁঠার। আমার সন্দেহ, ওর কোনো উদ্দেশ্য আছে।”
“কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে তোমার সন্দেহ হচ্ছে?”
“বলা কঠিন এই মুহূর্তে। তবে ভদ্রলোকের চেহারায় কেমন ধূর্ততার ছাপ আছে। চোখ দুটো দেখলেন না বেড়ালের মতো যেন।”
কর্নেল হো-হো করে হেসে বললেন, “বুঝতে পারছি, ওঁকে তুমি পছন্দ করোনি। ডার্লিং! বেণীমাধব রায় একসময়কার বিখ্যাত ব্যবসায়ী বংশের মানুষ। এখন ওঁদের অবস্থা পড়ে গেছে। কিন্তু এদেশে কিউরিও দ্রব্যের কারবারী হিসেবে নাম করতে হবে সবার আগে। বিচিত্র ধরনের প্রাচীন জিনিস উনি কেনাবেচা করেন। ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে ওঁর কিউরিও শপে তুমি দেশবিদেশের বহু কোটিপতি খদ্দেরের দর্শন পাবে দুবেলা। কাজেই ওঁর প্রতি অকারণ সন্দেহ পোষণ কোরো না। কেন উনি আমার সঙ্গে ছলনা করতে আসবেন মিছিমিছি?”
কর্নেলের কথা শুনেও আমার সন্দেহ গেল না। কিন্তু আর কথা না বাড়িয়ে ওঁর বইটার দিকে তাকালুম। খুব পুরনো বই বলে মনে হল। পোকায় যথেচ্ছ কেটেছে বইটাকে। জায়গায়-জায়গায় দুটো-একটা করে শব্দ কামড়ে খেয়েছে। বললুম, “এত মন দিয়ে কী বই পড়ছেন বলুন তো?”
কর্নেল বললেন, “আলেকজান্ডারের জীবনী। তাঁর সমকালের এক গ্রিক ঐতিহাসিক আরিয়ানের লেখা।”
“তার মানে আপনি বিশ্বাস করছেন, জিনিসটা সত্যি আলেকজান্ডারের বাঁটুল?”
কর্নেল বইটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, “সেকথা পরে। কিন্তু গ্রীকসম্রাট আলেকজাণ্ডারের একটা প্রিয় বাঁটুল সত্যি ছিল এবং তা আফগানিস্তানে এসেও হারিয়েও গিয়েছিল। পড়ে দেখলে ‘ব্যাপারটা বুঝতে পারবে।”
বইটা নিয়ে খোলা পাতাটায় দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিলুম! একখানে লেখা আছে :
“….সম্রাট খুব ভেঙে পড়েছিলেন বাঁটুল হারিয়ে। সারারাত ঘুমোননি। সকালে ঘোরবন্দ নদীর ধারে একখণ্ড পাথরের উপর বসে আমাদের বললেন, আমাকে হিন্দুস্থান থেকে হয়তো নিরাশ হয়ে ফিরতে হবে। বাঁটুলটা বড় পয়মন্ত ছিল। আমরা তাকে খুব বোঝালুম। কিন্তু তার মুখ থেকে দুঃখের ছাপ মুছল না। পরে হিন্দুস্থানের রাজা পোরাসের (পুরু) সঙ্গে আমাদের যুদ্ধে জয় হলে তখন সম্রাটকে বললুম, দেবতা জিউস আপনার সহায়-তখন সম্রাট আমার কানে কানে বললেন, কাল রাতে দেবতা জিউস আমাকে স্বপ্নে আদেশ দিয়েছেন, আর এগিও না। ফিরে যাও।”
পড়ার পর বললুম, “হুঁ–তাহলে সত্যিসত্যি একটা বাঁটুল ছিল। কিন্তু..”।
কর্নেল আমার কথা কেড়ে বললেন, “ কিন্তু রহস্যটা হল অন্যত্র। জয়ন্ত, ময়রার যেমন সন্দেশে রুচি থাকে না, তেমনি খবরের কাগজের লোক হওয়াতে কাগজে রুচি নেই।”
অবাক হয়ে বললুম, “হঠাৎ একথার অর্থ?”
“তোমাদের দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার দুইয়ের পাতায় অদ্ভুত বিজ্ঞাপনটা তুমি পড়োনি।”
“কী বিজ্ঞাপন?”
কর্নেল হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে কাগজটা তুলে নিয়ে দুইয়ের পাতার একটা বিজ্ঞাপন দেখালেন। বিজ্ঞাপনটা ছোট। “বাঁটুল, যেখানেই থাক, ফিরে এস। যা চাও, পাবে। রবিবার যশোর রোডে মন্দিরতলায় রাত দশটা পর্যন্ত অপেক্ষা করবো, ইতি মামা।”
বিজ্ঞাপনের শেষ কথাগুলো অদ্ভুত বটে। কিন্তু এখানে সম্ভবত একটা ছেলের নাম। আজকাল কত ছেলে বাড়ি থেকে পালাচ্ছে!
আমার মনের কথা যেন টের পেলেন গোয়েন্দামশাই। একটু হেসে বললেন, ‘কে বলতে পারে বিজ্ঞাপনের বাঁটুল আলেকজান্ডারের বাঁটুল নয়?”
জোর গলায় বললুম, “অসম্ভব। ইনি জনৈক শ্রীমান বাঁটুল চন্দ্র ছাড়া কেউ নয়। আলেকজান্ডারের বাঁটুল কেউ চিনতে চাইলে বেণীমাধববাবুর কিউরিও শপেই যেতে পারত। তাছাড়া ইতি–মামা, যখন লেখা আছে, তখন আর কথা নেই। সম্ভবত বাঁটুলচন্দ্রটি বড় সেয়ানা ছেলে।”
কর্নেল আর কোনো মন্তব্য করলেন না। বইটা টেনে নিয়ে ফের পড়তে শুরু করলেন।…
.
আরেক ধাঁধা
বেণীমাধব রায়ের বাড়ি সল্টলেকের উত্তর সীমায়। পেছনে খাল। তার ওধারে দমদম এয়ারপোর্টগামী ভি. আই. পি. রোড়। বাড়িটা বছর দুই আগে বানিয়েছেন বেণীমাধব। একতলা হলেও বেশ বড় ও নিরিবিলি জায়গায়। এপাশে-ওপাশে অনেকটা তফাতে কয়েকটা বাড়ি সবে তৈরি হচ্ছে। বিকেল পাঁচটায় পৌঁছে ঝটপট চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিয়েছিলুম। উলুকাশ আর ঝোঁপঝাড়-গাছপালায় জায়গাটা জঙ্গল হয়ে আছে। তাছাড়া যে সময়ের কথা বলছি, তখন সল্টলেকে সবে ঘরবাড়ি হচ্ছে। চারদিক প্রায় খাঁ খাঁ করছে। যে ঘরে ভূতের উপদ্রব হয়, সেই ঘরটা একেবারে উত্তর অংশে। পেছনে একটুকরো পোড়ো জঙ্গুলে জমি। তার পেছনে তারকাটার উঁচু বেড়া। বেড়া ঘেঁষে গাছপালা গজিয়েছে। কর্নেল সে দিকটা কিছুক্ষণ ঘুরে দেখলেন। তারপর আমরা ঘরটাতে ঢুকলুম।
বেণীমাধব অবিবাহিত মানুষ। এ বাড়িতে তার এক পিসিমা আর দূরসম্পর্কের এক ভাগ্নে অমল, তাছাড়া একজন রাঁধুনি দয়ার ঠাকুল, দুজন চাকর ভবা ও চাঁদু, দারোয়ান বীরবাহাদুর, ঝি পাঁচুর মালোকজন বলতে এই। বেণীমাধববাবুর গাড়ি আছে দুটো। কিন্তু ড্রাইভার রাখেননি। একটা নিজে চালান, অন্য গাড়িটা অমলকে দিয়েছেন। অমল মামার টাকায় ইলেকট্রোনিক জিনিসপত্রের ব্যবসা করে। তার দোকান আছে চৌরঙ্গী এলাকায়। আমরা অমলকে দেখতে পেলুম না। সে তার দোকান থেকে বাড়ি ফেরে অনেক রাতে। আমরা আসব বলে বেণীমাধববাবু তিনটের মধ্যে তাঁর কিউরিও শপ বন্ধ করে বাড়ি চলে এসেছেন।
