জিনিসটা দেখতে ক্রিকেটবলের মতো। কিন্তু বেজায় খসখসে এবং কালো রঙের। হাতে নিয়ে দেখলুম বেশ ওজনদারও বটে। সারা গায়ে হিজিবিজি কী সব লেখা আছে দুর্বোধ্য ভাষায়। সেই সঙ্গে জায়গায় জায়গায় সূক্ষ্ম নকশার কারিকুরি। নাড়াচাড়া করে দেখে বললুম, “জিনিসটা কী?”
যিনি এটা নিয়ে সকালবেলা কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের ড্রইংরুমে হাজির হয়েছেন, তার নাম বেণীমাধব রায়। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স। স্বাস্থ্যবান শক্তসমর্থ চেহারার মানুষ। আমার প্রশ্ন শুনে একটু হেসে বললেন, “বুঝতে পারলেন? এটা আসলে একটা লোহার বাঁটুল। কিন্তু ও লোহায় মরচে ধরার যো নেই।”
অবাক হয়ে বললুম, ‘বাঁটুল? তার মানে যা ছুঁড়ে আদিবাসীরা পাখি-টাকি শিকার করে? বাঁটুল তো আমি দেখেছি। গুলতি থেকে মার্বেলের গুলির সাইজের মাটির বাঁটুল আমিও ছেলেবেলায় কতবার ছুঁড়েছি কার্নিশে পায়রা মারতে। বাঁটুল কখনও এমন প্রকাণ্ড হয়, দেখিনি তো! তাছাড়া এটার ওজন মনে হচ্ছে প্রায় আধকিলো। গুলিত থেকে ছোঁড়াও তো অসম্ভব মশাই।”
বেণীমাধবাবু রহস্যময় হাসলেন। “এটা প্রায় তেরশো বছরের পুরোনো গ্রিক বাঁটুল। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ সালে গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণে আসার সময় আফিগানিস্তানে পাঞ্জশির উপত্যকায় ঘোরবন্দ নদীর ধারে তাবু ফেলেছিলেন। ওই সময় তার বাঁটুলটা হারিয়ে যায়। ওই আমলের ইতিহাসে এসব কথা আছে। যাই হোক, তার প্রায় ২২৩৯ বছর পরে ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে পুরাবিজ্ঞানী জন মার্শাল ওই এলাকায় এক লুপ্ত সভ্যতার ধ্বংশাবশেষ পুনরুদ্ধারের সময় মাটির তলা থেকে এমনি একটা বাঁটুল কুড়িয়ে পান। তেমনি একটা বাঁটুল আমার ভাগ্যেও জুটেছে। তবে আমি এটা কোথায় পেয়েছি, তা বলা যাবে না। জিনিসটার দাম কয়েক কোটি টাকা। মার্শালের বাঁটুলটা লন্ডনের জাদুঘরে আছে সেটা কিন্তু আলেকজান্ডারের নয়।”
হাঁ করে শুনছিলুম। শোনার পর বললুম, “কিন্তু এটাই যে সম্রাট আলেকজান্ডারের বাঁটুল, তার প্রমাণ কী?”
বাঁটুলটার গায়ে খোদাই করা হিজিবিজিতে আঙুল রেখে বেণীমাধববাবু বললেন, “এই তো সব লেখা আছে প্রাচীন গ্রিক হরফে। আর এই গোল চিহ্নটা দেখছেন, এটা হল গ্রিক সম্রাটের শিলমোহর।”
কর্নেলের দিকে তাকিয়ে দেখলুম, উনি দাঁতে চুরুট কামড়ে একটা প্রকাণ্ড ইংরেজি বই খুলে গম্ভীর মুখে পড়ছেন। ওঁরা সাদা দাড়িতে চুরুটের ছাই পড়ছে, সেদিকে লক্ষ্যই নেই। বেণীমাধববাবু বাঁটুলদা কফিটেবিলে চৌকোণা কৌটোয় রাখলে এতক্ষণে মুখ তুলে কর্নেল বললেন, “হাকী যেন বলছিলেন বেণীমাধব? রাতবিরেতে আপনার ঘরে ভূতের উপদ্রব হয়?”
বেণীমাধব গম্ভীর হয়ে গেলেন। “হ্যাঁ কর্নেল। একমাস হল জিনিসটা আমি পেয়েছি। তারপর থেকেই প্রায়ই রাত্রিবেলা অদ্ভুত সব কাণ্ড হচ্ছে আমার ঘরে। দেয়ালে টাঙানো ছবি পড়ে যাচ্ছে। ঝনঝন শব্দে। কিন্তু আলো জ্বালিয়ে দেখি কিছু পড়েনি–কিংবা ভাঙেনি। কোনো রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে শুনি, কেউ ধুপধুপ শব্দ করে ঘরের ভেতর হেঁটে বেড়াচ্ছে! অথচ আলো জ্বাললে আর তাকে দেখতে পাচ্ছি না। কোনোরাতে হঠাৎ শুনি, ফিসফিস করে কারা কথাবার্তা বলছে। আলো জ্বাললে আর তাকে দেখতেন, কেউ ধুপধুপশয়ে দেখি কিছু পরে ঘরে। দেয়ালে টাগ্রাম পেয়েছি। তারপর জ্বাললেই সব চুপ। সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে গতরাতে। এতসব কাণ্ডের পর এমনিতেই আতঙ্কে ঘুম আসতে চায় না। প্রায় জেগেই কাটাই। কাল সাড়ে তিনটেয় এক কাণ্ড হল। টেবিলল্যাম্পটা জ্বেলেই রাখি সারারাত। হঠাৎ দেখি কালো কুচকুচে একটা হাত মাথার দিকের জানালা দিয়ে ঢুকে টেবিলল্যাম্পের সুইচ অফ করে দিল। লাফিয়ে উঠে বসলুম। পিস্তল আছে আমার। পিস্তল নিয়ে সুইচ টিপে বড় আলো জ্বেলে দিলুম। উঁকি মেরে কাউকে দেখতে পেলুম না। সকালে দেখি টেবিল আর জানালার ধারে এই লোমগুলো পড়ে আছে।”
পকেট থেকে বেণীমাধববাবু একটা কাগজের মোড়ক বের করে কর্নেলকে দিলেন। কর্নেল মোড়কাটা খুললেন। কয়েকটা কালো দু-তিন ইঞ্চি লোম। কর্নেল একটা লোম চিমটি কেটে তুলে বললেন, “বেজায় শক্ত দেখছি। যেন সূচ। ঠিক আছে। এগুলো থাক। আর বাঁটুলটা…”
কথা কেড়ে বেণীমাধববাবু বললেন, “ওটা আপাতত আপনার কাছেই থাক কর্নেল। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেছি এবার। জিনিসটা ঘরে রাখতে সাহস হচ্ছে না। ভেবেছিলুম ব্যাংকের লকারে নিয়ে গিয়ে রাখব কি না। কিন্তু আজকাল কাউকে বিশ্বাস করা যায় না। লকার ভেঙে চুরি যাওয়া কিছু আশ্চর্য নয়। আপনিই ওটা রাখুন।”
কর্নেল মোড়ক এবং বাঁটুলের সুদৃশ্য কৌটোটা হাতে নিয়ে পাশের ঘরে রেখে এলেন। তারপর বললেন, “ঠিক আছে বেণীমাধববাবু। আমরা তাহলে ওবেলা একবার আপনার বাড়িতে যাচ্ছি। আপনার ঘরটা একবার পরীক্ষা করা দরকার।”
বেণীমাধববাবু নমস্কার করে চলে গেলেন। কর্নেল আবার সেই ইংরেজি বইটা খুলে বসলেন। বললুম, “এটা কি সত্যি বাঁটুল? এবং আলেকজান্ডারেরই বাঁটুল বলে মনে করেন?”
গোয়েন্দাপ্রবর বই থেকে মুখ তুলে হাসলেন। “ডার্লিং! সেকালের বীরপুরুষরা ছিলেন সবই তাগড়াই মানুষ। খাদ্যে তখনও কেউ ভেজাল দিতে শেখেনি। হাওয়াবাতাসও এমন বিষিয়ে যায়নি। বিশুদ্ধ বাতাসে তারা শ্বাসপ্রশ্বাস নিতেন এবং অনেকে আস্ত একটা রামপাঁঠা খেয়ে হজম করতেন।
