–আমার অনুমান।
আপনার ধুরন্ধর গোয়েন্দাগিরির কথা ঢের শুনেছি। এবারও দেখলুম। কিন্তু আপনি দেখছি, দিব্যদ্রষ্টা কর্নেল! অ্যাঁ!–রাজাবাহাদুর বেজায় হাসতে থাকলেন।
-বাজপোড়া পাম ছিল তাহলে?
-হঁ। ছিল একটা। সেটা একেবারে ভেতরে। আশ্রমের একতলা দালানের উত্তর-পশ্চিম কোনায়। সেটা ছিল সবচেয়ে লম্বা পামগাছ। ঠাকুরদার সঙ্গে এক সায়েবের খাতির ছিল। তিনি মেক্সিকোর মরুভূমি থেকে আনিয়ে দিয়েছিলেন পামগাছের কয়েকটা চারা।
–তাহলে আর অলক্ষ্মীর গয়না উদ্ধারের আশা নেই। নদীতে তলিয়ে গেছে।
রাজাবাহাদুর চমকে উঠেছিলেন কর্নেলের কথা শুনে। আমিও রাজাবাহাদুর বললেন, –তার মানে?
কর্নেল হাসলেন। –অলক্ষ্মীর হিরের গয়না সেই বাজপড়া পোড়া পামগাছের নিচে পোঁতা ছিল।
-কী করে বুঝলেন?
–কবচের ভেতরকার কাগজে লেখা ছড়াটা থেকে।
বলেন কী!–রাজাবাহাদুর ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন।
এইসময় পেছনের এক ঝোপ থেকে প্রফেসর তানাচাকে বাঘের মতো বেরুতে দেখলুম সম্ভবত ভদ্রলোক ওখানে জংলি আফিমগাছ থেকে আফিং সংগ্রহ করছিলেন। এবং ওত পেতে আমাদের কথাবার্তাও শুনছিলেন। সটান এসে আর্তনাদের ভঙ্গিতে বললেন, –অলক্ষ্মীর গয়না নদীতে তলিয়ে গেছে? হায়, হায়! আমিও ঠিক এই কথাটা ভেবেছিলুম গো!
রাজাবাহাদুর ছড়ি তুলে বললেন, -চোপ! কুকুর লেলিয়ে দেব। মড়াকান্না শুরু করলে হতচ্ছাড়া আফিংখোর! প্রফেসর তানাচা ভড়কে দু-পা পিছিয়ে গেলেন তক্ষুনি।
কর্নেল বললেন, –ছড়াটাতে পরিষ্কার বলা হয়েছে :
কবে যাবি যে সেই সমাজে
ছাড় কুইচ্ছে পোড়া পাম রে।
….এবার লক্ষ করুন কথাগুলো। গদ্য করে বললে দাঁড়ায় : সেই সমাজে কবে যাবি রে? কোন সমাজে? না-কল্কি সমাজে। তার মানে আশ্রমে। তারপর বলা হয়েছে : ছাড় কুইচ্ছে। অর্থাৎ এই ইচ্ছাটা কু। কারণ অলক্ষ্মীর গয়না নেওয়ার ইচ্ছে খারাপ ইচ্ছে। অতএব এ ইচ্ছে না করাই ভালো। এবার দেখুন, কাগজে পোড়া পাম রে কথাটায় পাম এবং রে আলাদা করে লেখা। কোন পাম। অর্থাৎ পাম গাছ? না-পোড়া পামগাছ। বোঝা যাচ্ছে, পোড়া পামগাছই লুকিয়ে রাখা গয়নার ডেরা।
প্রফেসর তানাচা কপাল চাপড়ে বললেন, আমি জানতুম, ওটা নিছক তাসের ম্যাজিক নয়-ওর মধ্যেই মজা আছে। অথচ একটুও আঁচ করতে পারিনি। পামগাছটায় বাজ পড়েনি-আমার কপালেই বাজ পড়েছিল! হায়-হায়! অমন দামি জিনিসটা! পেলে কোটিপতি হতুম গো!
রাজাবাহাদুর তেড়ে গেলেন। –কোটিপতি হতে, না আফিংপতি হতে! আফিংয়ের পাহাড় কিনে ফেলতে। তার চেয়ে এ বেশ হয়েছে।
মনের দুঃখে প্রফেসর তানাচা ফটক দিয়ে রাজবাড়ি এলাকায় চলে গেলেন। বুঝলুম, বেচারা বেজায় ভেঙে পড়েছেন।
কুকুরদুটো কিছুক্ষণ থেকে উসখুস করছিল। এতক্ষণে হঠাৎ বোট-হাউসের দিকে দৌডুল। রাজাবাহাদুর ছড়ি তুলে তাদের ডাকতে-ডাকতে সেদিকে গেলেন। তারপর দেখি, জনাই-পাগলা বোট-হাউস থেকে বেরিয়ে ঝপাং করে নদীতে গিয়ে পড়ল। তারপর সে আঁকুপাঁকু করে সাঁতার কাটতে-কাটতে ওপারে উঠল এবং এদিকে হাত নেড়ে তিড়িংবিড়িং করে নাচতে-নাচতে গালমন্দ করতে থাকল। এপারে বোট-হাউসের সামনে দাঁড়িয়ে রাজাবাহাদুর পালটা ছড়ি নাচিয়ে তাকে শাসাচ্ছিলেন।
কুকুরদুটো বোট-হাউসে ঢুকে পড়েছে। কর্নেল ভুরু কুঁচকে ব্যাপারটা দেখছিলেন। বললেন, –এসো তো দেখি জয়ন্ত! কুকুরদুটো ওখানে ঢুকে কী করছে।
বোট-হাউসের সামনে গিয়ে উঁকি দিয়েই থমকে দাঁড়ালুম। ভাঙাচোরা বোটের খোঁদলে জয়গোপালবাবু আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। কুকুরদুটো তাকে শুঁকছে।
রাজাবাহাদুরও এদিকে ঘুরে দৃশ্যটা দেখতে পেয়ে বললেন, -এ কী! জয়গোপাল যে?,
কর্নেল ওঁর বাঁধন খুলে দিলেন। জয়গোপালবাবুর চেহারা এখন অন্যরকম। চোখমুখ ফুলো-ফুলো। প্যান্ট জামা ফর্দাফাই। কর্নেল বললেন, -ব্যাপার কী জয়গোপালবাবু? রাতে রাজবাড়ি থেকে পালিয়ে নিশ্চয়ই জনাই-পাগলার পাল্লায় পড়েছিলেন?
জয়গোপালবাবু গলার ভেতর বললেন, -হ্যাঁ!
রাজাবাহাদুর চোখ পিটপিট করে বললেন, -তোমার অবস্থা দেখে আমার বড়ো কষ্ট হচ্ছে। জয়গোপাল! তোমাকে অ্যাট্টুকুন থেকে মানুষ করেছি নিজের ছেলের মতো। আমার ছেলেপুলে নেই। ভেবেছিলুম, যা আছে সব তোমার নামে উইল করে দেব। আর তুমি কিনা অলক্ষ্মীর গয়নার লোভে আমার পেছনে ভূত লেলিয়ে দিলে?
জয়গোপালবাবু উঠে এসে রাজাবাহাদুরের পাদুটো জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে বললেন, -খুব শিক্ষা হয়ে গেছে। আমায় আপনি ক্ষমা করে দেন। আর কখনও এমন কাজ করব না।
রাজাবাহাদুর চোখ মুখে বললেন, দিলুম। ওঠো। ঘরে চলো। আহা, সারারাত কী কষ্ট গেছে তোমার! জয়গোপালবাবুর কাঁধে হাত রেখে পা বাড়িয়ে ফের বললেন, –আর কখনও ছুরিটুরি ছুঁয়ো না। আমাদের অস্ত্রাগারের ওই ছুরিটা খুব অলুক্ষুণে। আমারই ওটা হাতে নিলে মনে হতো। খুনখারাপি করে ফেলি। তা হ্যাঁ রে গোপাল, জনাই-পাগলা খুব মেরেছে বুঝি?
জয়গোপালবাবু কচিখোকার মতো বললেন, -হ্যাঁ। হঠাৎ পাথর মেরেছিল। আর যেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছি, ব্যাটা আমাকে ধরে ফেলেছে। বোট-হাউসে চ্যাংদোলা করে নিয়ে গিয়ে পুরোনো দড়িগুলো দিয়ে বেঁধে…
রাজাবাহাদুর বললেন, -চুপ। আর কথা বলে না।
ফটকে ঢোকার মুখে ডাঃ ঢোলকে খুঁজলুম। দেখি, অলক্ষ্মীর চত্বর থেকে হাত নেড়ে ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা জনাইকে ক্রমাগত ডাকছেন। বুঝলুম, সাইকিয়াট্রিস্ট ডাক্তার একজন সত্যিকার পেশেন্টের দেখা পেয়ে গেছেন–তাকে হাতছাড়া করতে চান না। বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কলকাতা নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার মতলব জেগেছে মাথায়।…
৩.০১ আলেকজান্ডারের বাঁটুল
বাঁটুল, ফিরে এস
