ডাঃ ঢোল জগিং অর্থাৎ দৌড়ব্যায়ামের ছলে গুলতির বেগে পুবের ফটক পেরিয়ে গেলেন। অগত্যা আমিও ওঁকে অনুসরণ করলুম।
ডাঃ ঢোল হাঁফাতে-হাঁফাতে বললেন, -ফলো করেনি তো ওরা?
ওঁকে আশ্বস্ত করে বললুম, -না। আমাদের দেখতে পায়নি। নতুন মনিব পেয়েই মশগুল ওরা।
ডাঃ ঢোল হঠাৎ থেমে দাঁড়িয়ে বললেন, যথেষ্ট হয়েছে। এ বয়সে জগিং খুব কষ্টকর। তাছাড়া…বলে কেমন চোখে এদিক-ওদিক তাকাতে থাকলেন।
জিগ্যেস করলুম, –কী ডাক্তার ঢোল?
ডাঃ ঢোল চাপাগলায় বললেন, এখানে নাকি এক পিশাচসিদ্ধ তান্ত্রিক সাধুর আড্ডা। সে নাকি মড়া খায়। দেখেছেন ওনার আড্ডাটা?
-দেখেছি। সাধু নয়, নিছক পাগল। আপনার পেশেন্ট আর কী!
কথা বলতে বলতে আমরা অলক্ষ্মীর মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেলুম। জনাই-পাগলার কাহিনি শুনে ডাঃ ঢোল বললেন, –রাঘবকে বলব। আমার কাছে কলকাতায় পাঠিয়ে দেবে ওর দাদাকে। ভালো মেন্টাল হসপিটালে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেব।
ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে অলক্ষ্মীর মন্দিরের চত্বরে পৌঁছে দেখি, অলক্ষ্মীমূর্তির সিংহাসনে হেলান দিয়ে বসে আছেন ঘুঘুপ্রবর কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। তাঁর মাথায় টুপি। পাশে একটা ছোটো প্রজাপতি ধরা জাল। আর জালের মধ্যে রংবেরঙের একটা প্রজাপতি চুপচাপ ঝিমুচ্ছে।
কিন্তু তার চেয়ে চোখে পড়ার মতো দৃশ্য, কর্নেল একটা প্রকাণ্ড বই পড়ছেন আপন মনে। বুঝলুম না, অলক্ষ্মীর ডেরায় নিশ্চিন্তে বসে এমন বই পড়ার খেয়াল কেন মাথায় চাপল!
ডাঃ ঢোল মূর্তিটা ভয়েভয়ে দেখে বললেন, -প্রণাম করা কি উচিত হবে? অলক্ষ্মীকে কি প্রণাম করব জয়ন্তবাবু?
কর্নেল চোখ তুলে একটু হেসে বললেন, –ভক্তি হলে করুন ডাক্তার ঢোল।
ডাঃ ঢোল বাঁকা মুখে বললেন, -না মশাই! ভক্তি জাগছে না। কী সাংঘাতিক চোহারা! যেন গলা টিপে মারতে আসছে।
চত্বরে উঠে বললুম, -হ্যালো ওল্ডম্যান! এখানে এসে বই পড়ার মানেটা কী?
কর্নেল বললেন, -লোহাগড়া রাজবংশের কুলকারিকা–সেই বইটা জয়ন্ত। যত পড়ছি, রোমাঞ্চকর মনে হচ্ছে। এ বংশের সবাই কেমন যেন বাতিকগ্রস্ত। বর্তমান রাজাবাহাদুরের ঠাকুরদা ছিলেন প্রসিতেন্দ্রনারায়ণ। তার বাতিক অসামান্য। তিনি নিজেকে এই কলিযুগে ভগবানের অবতার বলে প্রচার করতেন। অর্থাৎ তিনিই নাকি কল্কি অবতার। সাদা পোশাক পরতেন। সাদা ঘোড়ায় চেপে বেড়াতেন। তার বাবা হরষিতেন্দ্র তার মতিগতি দেখে শেষে বাড়ি থেকে বের করে দেন। তখন প্ৰসিতেন্দ্র এখানেই লোহানদীর তীরে একটা আশ্রম তৈরি করেন। আশ্রমের নাম দেন কল্কিসমাজ। তবে ভক্ত বিশেষ জোটেনি–শুধু প্রফেসর তানাচার ঠাকুরদা ব্রজনাথ ছাড়া। তাও ব্রজনাথ রাতবিরেতে লুকিয়ে কল্কি অবতারকে প্রণাম করতে আসতেন।
ব্রজনাথ তো নায়েব ছিলেন। তিনিই অলক্ষ্মীর গয়নার সন্ধান পেয়েছিলেন। তাই না?
–হ্যাঁ। কিন্তু সেই আশ্রমটা কোথায় ছিল কে জানে? নদীর ধারে তো তেমন কোনও চিহ্ন দেখছি না।
এই সময় পুবের ফটক দিয়ে রাজাবাহাদুরকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল। সঙ্গে সেই কুকুরদুটো। ডাঃ ঢোল এতক্ষণ চত্বরের নিচে দাঁড়িয়েছিলেন। এবার তড়াক করে এক লাফে চত্বরে উঠে অলক্ষ্মীর সিংহাসনের আড়ালে চলে গেলেন। কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে ডাকলেন, রাজাবাহাদুর! রাজাবাহাদুর!
রাজাবাহাদুর ওখান থেকে হাত নেড়ে বললেন, -যাব না।
কর্নেল একটু হেসে চত্বর থেকে নামলেন। বইটা বগলদাবা করে প্রজাপতিধরা জালটা কাঁধে নিয়ে পা বাড়ালেন। আমি ওঁর সঙ্গে চললুম। কিন্তু ডাঃ ঢোল চোখের ইশারায় জানালেন, যাবেন না।
কাছে গেলে রাজাবাহাদুর বললেন, –ওই অলুক্ষণে জায়গায় আমি মশাই যাই-টাইনে। নদীর ধারে আসাই ছেড়েছি কতকাল। এখন জয়গোপালের কুকুরদুটোর সাহসে এলুম।
কুকুরদুটো ওঁর দু-পাশে দু-ঠ্যাঙে বসে আছে। কর্নেল বললেন, -এরা আপনার বশ মেনেছে। দেখছি।
মানবে না? ওদের বুদ্ধি নেই? এতদিন এরা কার পয়সায় খেয়েছে? আর জয়গোপাল তো আমারই পয়সায় এদের কিনা এনেছিল। বুঝলেন ব্যাপারটা? আমারই পয়সায়–অথচ আমাকেই ভূতের ভয় দেখাত হতচ্ছাড়া। -রাজাবাহাদুর ছড়ি তুলে শাসালেন, পালিয়ে যাবে কোথায়? একবার পেলে হাড় ভেঙে দেব মারের চোটে। তারপর ভজু-দারোগার কাছে চালান করে দেব। বুঝবে ঠেলা।
কর্নেল এদিক-ওদিক তাকাতে-তাকাতে বললেন, -আচ্ছা রাজাবাহাদুর, এখানে আপনার ঠাকুরদার আশ্রমটা কোথায় ছিল জানেন?
রাজাবাহাদুর ভুরু কুঁচকে বললেন, -কল্কি সমাজের কথা বলছেন কি?
–ঠিক তাই।
খিকখিক করে হেসে রাজাবাহাদুর বললেন, -ঠাকুরদা ছিল ষোলোআনা পাগল। ওই যে নদীর ভাঙনটা দেখছেন, আগের বছর বর্ষায় ওটা ধসে গেছে। প্রায় এক একর জায়গা খেয়ে নদী এত কাছে সরে এসেছে। আশ্রম-টাম তলিয়ে গেছে কোথায়।
–হুঁ। আচ্ছা রাজাবাহাদুর, আশ্রমে কি পামগাছ ছিল?
–ছিল। গেটের দুধারে ছিল দুটো। ভেতরেও কয়েকটা ছিল। বিরাট-বিরাট সব পামগাছ।
–কোনও পামগাছের মাথায় বাজ পড়েছিল কি?
রাজাবাহাদুর অবাক চোখে তাকালেন। তারপর একটু হেসে বললেন, আপনি কি আমার ঠাকুরদার আমলে এসেছিলেন লোহাগড়ায়? তখন তো আপনি দুগ্ধপোষ্য বালক মশাই!
কর্নেল বললেন, –ঠিকই বলেছেন রাজাবাহাদুর।
-তাহলে কেমন করে জানলেন কোনও পামগাছের মাথায় বাজ পড়েছিল নাকি?
