ডাঃ ঢোল বললেন, –খাবেন বইকী রাজাবাহাদুর! জয়গোপালবাবু আপনাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে চাইতেন বলেই তো কফি খেতে দিতেন না।
রাজাবাহাদুর উৎসাহে নেচে উঠলেন। রাঘবের দিকে চোখ পাকিয়ে বললেন, –এই হতচ্ছাড়া! হাঁ করে দেখছিস কী? ঠাকুরমশাইকে ওঠা গিয়ে। দ্যাখগে, সে আমার এই তারানাথের চেলা হয়ে আফিং গিলে পড়ে আছে নাকি।
রাঘব চলে গেল।
রাজাবাহাদুর সেই ঢ্যাপসা মোটা কবচটার সুতো ধরে দোলাতে-দোলাতে বললেন, -এই অলুক্ষুণে কবচটাই যত কাণ্ডের মূলে। কাল এটাকে নদীতে ছুঁড়ে ফেলতে হবে, বুঝলেন কর্নেল?
কর্নেল বললেন, -খুব ভালো কথা। তবে কবচটা আমি একবার দেখতে চাই রাজাবাহাদুর!
রাজাবাহাদুর কবচটা দিলে কর্নেল খুঁটিয়ে দেখে বললেন, প্রফেসর তানাচা, আপনি কি কবচটা খুলেছিলেন? মনে হচ্ছে, কবচের মুখে আঁটা গালা বেশিদিনের নয়।
প্রফেসর তানাচা সে কথায় কান না করে বললেন, -আমার বড্ড ঘুম পাচ্ছে রাজাবাহাদুর! আমি শোব কোথায়?
রাজাবাহাদুর দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বললেন, আমার মাথায় শো হতভাগা আফিংখোর!
কোনার দিকের ডিভানে প্রফেসর তানাচা সটান চিত হলেন এবং চোখ বুজে ঠ্যাং দোলাতে শুরু করলেন। কর্নেল বললেন, –প্রফেসর তানাচা, কবচ আপনার কাছে ছিল। কাজেই আপনি ছাড়া কেউ খোলেনি। এর ভেতর নাকি অলক্ষ্মীর হিরের নেকলেসের সন্ধান আছে। আপনি ভেবেছিলেন, গয়নাটা পেলে বিক্রি করে দেবেন। কিন্তু…
কর্নেলের কথা কেড়ে প্রফেসর তানাচা চোখ বুজে এবং ঠ্যাং দোলাতে-দোলাতে বললেন, –বড্ড সাংঘাতিক মন্ত্রপূত কবচ স্যার! খুললে শাপ লাগবে। আমার লেগেছে দেখছেন না! লক্ষ্মীছাড়া হয়ে গেছি একেবারে। অলক্ষ্মীর শাপ যা তো কথা নয়।
কর্নেল রাজাবাহাদুরকে বললেন, -একটা চিমটে দিতে পারেন রাজাবাহাদুর?
খুব পারি। বলে রাজাবাহাদুর একটা টেবিলের ড্রয়ার থেকে ছোটো চিমটে বের করলেন। একগাল হেসে বললেন, চিমটেটা এনে দিয়েছিল পাজি জয়গোপাল। নাকের ভেতর বড় লম্বা-লম্বা লোম হয় দেখছেন তো! এ দিয়ে দুপুরবেলা পটাপট সেই লোম ওপড়াই।
কর্নেল চিমটে দিয়ে কবচের মুখ সাফ করছিলেন। প্রফেসর তানাচা শুয়ে থেকে চোখ বোজা অবস্থায় বললেন, –আমারও ওই অবস্থা। তা রাজাবাহাদুর, আপনার হাঁচি পায় না?
পায়। চিমটে দেখলেই। রাজাবাহাদুর হেঁচে ফেললেন বারকতক।
কর্নেল কবচের গালা সাফ করে চিমটে দিয়ে একটুকরো গোল করে পাকানো হলদে রঙের জিনিস বের করলেন। সেই সময় রাঘব কফির ট্রে আনল।
কফি খেতে-খেতে আমরা টেবিলের ওপর ঝুঁকে হলদে জিনিসটা দেখতে থাকলুম। ওটা পুরোনো আমলের একটুকরো তুলোট কাগজ। ছেঁড়াখোঁড়া অবস্থা। কর্নেল ভাজ খুলে বিছিয়ে দিলেন কাগজটা।
কাগজটা চারধারে চমৎকার লালরঙের নকশার বর্ডার আঁকা। জায়গায়-জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। কয়েক জায়গায় কাগজও ফেটে-তুবড়ে রয়েছে। কিন্তু তাতে লালকালিতে বড়ো-বড়ো হরফে যা লেখা আছে, তাই দেখে আমি অবাক হয়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলুম, –তাসের ম্যাজিক যে!
কারণ, কাগজে সেই তাসের ম্যাজিকের সংকেত-সূত্রটাই লেখা রয়েছে।
কবে যাবিরে সেই সমাজে
ছাড় কুইচ্ছে পোড়া পাম রে
কর্নেলের মুখেও বিস্ময় ফুটে উঠেছিল। বললেন, তাহলে এ শুধু ম্যাজিকের সূত্র নয়, গুপ্তধনেরও সংকেত!
প্রফেসর তানাচা খিকখিক করে হাসছিলেন। সুর ধরে ছড়াটা আওড়ে বললেন, -নদীর ধারে বিস্তর খুঁজে বেড়িয়েছি। হদিশ করতে পারিনি স্যার!
কর্নেল জিগ্যেস করলেন, -নদীর ধারে কেন প্রফেসর তানাচা?
প্রফেসর তানাচা চোখ বুজেই জবাব দিলেন, –অলক্ষ্মীর গয়না কি রাজবাড়ির ত্রিসীমানায় কেউ রাখার সাহস পায় স্যার? অলক্ষ্মীর জিনিস অলক্ষ্মীর ডেরার ওখানেই কোথাও থাকবে। আমার সাধারণ বুদ্ধিতে এইটুকুন বুঝি।
-কিন্তু এ ছড়াটা তো তাসের ম্যাজিকের সূত্র! সেটাই তো ধাঁধা স্যার! প্রফেসর তানাচা ফের খিকখিক করে হাসতে লাগলেন। ঠ্যাং দুটোও জোরে দুলতে থাকল ডিভানের ওপর।
তাই দেখে রাজাবাহাদুর থাপ্পড় তুলে গর্জালেন, -নাচ থামা উল্লুক! ঠ্যাং কেটে ফেলব বলে দিচ্ছি।
তখন প্রফেসর তানাচা মড়ার মতো লম্বা হয়ে গেলেন। ঠ্যাংদুটোও থেমে টান হয়ে গেল। দুরে নিচের তলা থেকে হলঘরের ঠাকুরদাঘড়ির ঘণ্টার বিকট শব্দে বাড়ি কেঁপে উঠল। রাত তিনটে বাজে। …
.
০৭.
সকালে দেরি করে ঘুম ভেঙেছিল। কিন্তু উঠে দেখি, বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ যথারীতি প্রাতঃভ্রমণে উধাও হয়েছেন। ডাঃ ঢোলের কাছে শুনলুম, শেষরাতে কখন লোহাগড়া থানার দারোগা ভজগোবিন্দবাবু সদলবলে এসেছিলেন। আসামী না পেয়ে খুব খাপ্পা হয়ে বলে গেছেন, সে রাতে অলক্ষ্মীর থানে ডেডবডির নাম করে খামোক হয়রান করা হয়েছে ওঁকে। আজ ফের আসামী ধরার নাম করে হয়রান। উনি দেখে নেবেন কর্নেলকে। দু-দুবার ওঁর ঘুম নষ্ট!
ডাঃ ঢোল বললেন, -চলুন জয়ন্তবাবু! শরীর ম্যাজম্যাজ করছে। কিছুক্ষণ জগিং করে আসি।
দুজনে বেরোলুম। রাজবাড়ির ভেতর উত্তর-পূর্বের ঘাসের মাঠে দেখলুম রাজাবাহাদুর দাঁড়িয়ে আছেন এবং জয়গোপালবাবুর কুকুরদুটো ওঁকে বুড়ি করে খেলছে। রাজাবাহাদুর বাচ্চাছেলের মতো হাসছেন।
ডাঃ ঢোল আঁতকে উঠে বললেন, –সর্বনাশ! আমাকে দেখলেই ব্যাটারা খেপে যাবে। কাল রাতে যা করেছি! শিগগির কেটে পড়ন জয়ন্তবাবু!
