-বলল, এক্ষুনি এসে পড়ছি, মিনিট-পাঁচেকের মধ্যে।
প্রফেসর তানাচা এতক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিলেন। এবার বললেন, –আচ্ছা, আপনারা কি মনে করেন এই গোপলা হতচ্ছাড়া আমাকেও খুন করে ফেলত?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, -হা, কবচ না পেলেই করত। কারণ, আপনি ওর কীর্তিকলাপ সব জানেন। আপনাকে এরপরও বাঁচিয়ে রাখলে রাজবাড়িতে জয়গোপালবাবুর থাকা খুব রিস্কি হতো।
প্রফেসর তানাচা ঢোক গিলে ভয়ার্ত স্বরে বললেন, ওরে বাবা! তাহলে ওর কথায় রাজি হয়ে ভুল করেছিলুম। আপনার মুখে চুরির কথা শুনেই খেয়াল হয়েছিল, কবচটা যদি চুরি না যায়, তাহলে কোনও নিরাপদ জায়গায় রেখে আসব। সেনবাড়িতে গিয়ে দেখলুম, চুরি যায়নি চোর খুঁজে পায়নি। তখন সেই দিনই লোহাগড়া চলে এলুম। এসেই চুপিচুপি রাজবাড়ি ঢুকে রাজাবাহাদুরের জিম্মায় রেখে কলকাতা ফিরে গেলুম। দিন-দুই পরে হঠাৎ এই গোপলা হতচ্ছাড়ার চিঠি পেলুম।
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ, চিঠিটা আপনার পকেটে ছিল। এই দেখুন, এখন আমার কাছে।
খামটা দেখে প্রফেসর তানাচা বললেন, –আপনি স্যার সত্যি মহা ঘু… জিভ কেটে উনি থেমে গেলেন।
কর্নেল হাসলেন। সবাই আমাকে ঘুঘুমশাই বলে প্রফেসর তানাচা! এতে লজ্জার কারণ নেই আপনার।
প্রফেসর তানাচা বললেন, আমাকে গোপলা অজ্ঞান করে ওঘরে এনে গুম করে রাখবে কি জানতুম?
রাজাবাহাদুর ভেংচি কেটে বললেন, -ন্যাকা! গোমুখ! অ্যাফিংগোর কোথাকার!
আহা! আমি তো চিঠি পেয়ে ফের এসে আপনাকে জানিয়ে দিলাম। আমার কী দোষ?–প্রফেসর তানাচা করুণমুখে বললেন।
রাজাবাহাদুর খাপ্পা হয়ে বললেন, –তোমায় বলেছিলুম, অলক্ষ্মীর থানে যাওয়ার সময় ইস্কাপনের টেক্কা কালো সুতো দিয়ে বেঁধে গলায় লটকে নিও। ফেলে দিয়েছিলে কেন? কর্নেল না খুঁজে পেলে টেক্কাটা গচ্চা যেত না?
অলক্ষ্মীর চত্বরে উঠে সবে গলায় লটকাতে যাচ্ছি, হঠাৎ আমার নাকে…প্রকাণ্ড আয়নার দিকে তাকিয়ে থেমে গেলেন প্রফেসর তানাচা, ইস। দেখছ নাকের তলায় কী লাগিয়ে দিয়েছে গোপলা? ছ্যা-ছ্যা-ছ্যা! রুমাল বের করে উনি রগড়াতে শুরু করলেন।
রাজাবাহাদুর দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বললেন, –সত্যি-সত্যি রক্ত বের করো না রগড়াতে গিয়ে। যা কাণ্ড চলছে, রক্তারক্তি হলেই বিপদ। একটা কিছু হলে সব দোষ আমার ঘাড়ে এসে পড়বে।
কর্নেল বললেন, –ঠিক তাই হতে যাচ্ছিল রাজাবাহাদুর। এ-ঘরে প্রফেসর তানাচাকে জয়গোপালবাবু খুন করে ফেলত। আপনাকে দায়ী করাও সহজ হতো। ডাঃ ঢোল অতশত না বুঝেই সিজোফ্রেনিক রোগী বলে সাক্ষ্য দিতেন আদালতে। এসব রোগী রাতের বেলায় যা কিছু করে, নিজে টের পায় না। অতএব আপনি নিজের অজ্ঞাতসারে খুন করেছেন বলে সাব্যস্ত হতো। তার ওপর ডাঃ ঢোলের ওপর খাপ্পা হয়ে আপনি বলেছিলেন, আমার খুন করতে ইচ্ছে হচ্ছে। ডাঃ ঢোল সে কথাও বলতেন আদালতে।
রাজাবাহাদুর ফিক করে হাসলেন। ডাঃ ঢোলকে বললেন, –বলতেন নাকি মশাই?
ডাঃ ঢোল অপ্রস্তুত হাসলেন শুধু। আমি ওঁদের কথাবার্তা শুনছিলুম চুপচাপ। এতক্ষণে আমার মগজের ধুলোবালি যেন সাফ হয়ে গেল। না বলে পারলুম না, -কর্নেল! ইস্কাপনের টেক্কা কে বুঝতে পেরেছি।
কর্নেল বললেন, -আগেই বোঝা উচিত ছিল দ্বিতীয় চিঠির ভাষা দেখে। রাজাবাহাদুরের কথা বলার ভঙ্গি ওটার ছত্রে-ছত্রে স্পষ্ট।
হতভম্ব হয়ে বললুম, –শুধু একটা ধাঁধা থেকে যাচ্ছে। রাত দুটোয় ওঘরে এমন নাটক হবে, গতকাল রাতেই কীভাবে জানলেন রাজাবাহাদুর?
আমার প্রশ্ন শুনে রাজাবাহাদুর চোখ নাচিয়ে বললেন, জয়গোপালের প্ল্যানের কথা রাঘব সবই জানত যে মশাই! রাঘবকে ও বলেছিল, ওই পুরোনো আসবাবপত্রে ঠাসা ভূতুড়ে ঘরে অজ্ঞান তারানাথকে অলক্ষ্মীর থান থেকে তুলে এনে রাখবে। রাঘবকে টাকার লোভ দেখিয়েছিল। কথা ছিল, রাঘব অলক্ষ্মীর গয়না বেচা টাকার অর্ধেক পাবে–যদি সে ওকে সাহায্য করে আজ রাত দেড়টা-দুটোয় তারানাথকে নিয়ে আমার ঘরে যখন হানা দেবে তখন যেন ও সঙ্গে থাকে। রাঘবের মাসতুতো দাদা জনাই বেচারাকে জয়গোপাল মারের চোটে পাগলা করে ছেড়েছে। রাঘব জানে, আমি বুড়োমানুষ। ওই শয়তানটার কাছে আমিও কত অসহায়। রাঘবের মনে রাগ হবে না? সে সব বলেছিল আমাকে। রাধবের বদলে আমিই এ ঘরের ওই দরজার ছিটকিনি খুলে রেখে বেচারাকে সন্দেহ থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলুম। খামোকা গরিব মানুষ। তাকে বিপদে ফেলি কেন? বরং বদমাশটাকে হাতেনাতে পাকড়াও করি। তাই কর্নেলকে আনতে গাড়ি পাঠিয়েছিলুম। আর… –আমার দিকে ঘুরে বললেন, এই সাংবাদিক ভদ্রলোককে মজাটা দেখাতে চেয়েছিলুম। কি মশাই? দারুণ রোমাঞ্চকর না? লিখবেন তো দৈনিক সত্যসেবকে?
এইসময় সবার অন্যমনস্কতার সুযোগ নিয়ে জয়গোপালবাবু আচমকা কর্নেলকে ধাক্কা মেরে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর দরজার দিকে লাফ দিলেন। রাজাবাহাদুর চিৎকার করে উঠলেন, পাকড়োয়
কর্নেল বললেন, –এ রাতে ওঁকে আর ধরা যাবে বলে মনে হচ্ছে না। রাজাবাহাদুর! তাছাড়া ওঁকে খুঁজে গ্রেফতার করার দায়িত্ব পুলিশের হাতেই ছেড়ে দেওয়া ভালো।
রাজাবাহাদুর শান্ত হয়ে হঠাৎ ফিক করে একটু হাসলেন। তাহলে একপ্রস্থ গরম কফি হয়ে যাক, কী বলেন? আহা, আমি কতদিন কফি খাইনি। আজ আপনাদের সঙ্গে এক কাপ খাব। কি ডাক্তার ঢোল? মাত্র এক কাপ খেলে ক্ষতি হবে কি?
