–তাহলে তোমাকে আর বাঁচানো গেল না, তারাদা। ডনের পেটেই তোমাকে পাঠিয়ে দিই। ডনকে দেখেছ তো? কতবড় হাঁ তার।
-আরে যাও-যাও। কবচটা যাও বা দিতুম, আর দেব না।
–পাঁচশো টাকা পাবে তারাদা।
–বিনিপয়সায় দিতুম। আমাকে তুমি অলক্ষ্মীর ওখানে যেতে বললে, গেলুম। অজ্ঞান করলে কেন? তাও না হয় করলে, মারা তো পড়িনি–কিন্তু অজ্ঞান অবস্থায় হাত-পা বেঁধে এ-ঘরে এনে রাখলে। ভালোমন্দ খেতে দিলে। তাই চুপ করে লুকিয়ে রইলাম। কিন্তু আমার আফিংয়ের গুলি? রাত দুটো অব্দি একগুলি আফিং পেলুম না। এখন এসে কবচ চাইছ। ইস! ওরে আমার চাঁদ রে!
–তারাদা, এবার কিন্তু আমি মরিয়া। হাতে কী দেখছ?
–সর্বনাশ! তুমি আমাকে ছু-ছু-ছুরি দেখাচ্ছ? আমি এবার চেঁচাব বলে দিচ্ছি।
–চেঁচাবার আগেই তোমার হার্টে ঢুকে যাবে ছুরি। কেমন ধারাল হয়ে আছে দেখছ তো?
–ওঃ কী বুদু আমি! টাকার লোভে তোমার ফাঁদে পা দিলুম গো! আমার মরণ হয় না কেন?
-ন্যাকামি রাখো! ওঠো তারাদা। রাজাবাহাদুরকে ইঞ্জেকশান দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। ওঁর ঘরে গিয়ে কোথায় কবচ আছে, বের করে দাও। চলো! দেরি হয়ে যাচ্ছে।
–তুমি খোঁজোগে। আমি কি জানি কোথায় রেখেছেন উনি? তাছাড়া ওঁর ঘরের দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধ।
–সামনেকার দরজা বন্ধ। ওপাশের দরজা ভেজানো আছে।
–হিঃ হিঃ হিঃ! তোমার বুদ্ধি আছে গোপাল। রাঘবব্যাটাকেও বশ করে ফেলেছ দেখছি।
–ওঠো! দেরি হয়ে যাছে।
–বেশ। যাচ্ছি। কিন্তু পাঁচশো টাকা দেবে বলেছ। হাতে-হাতে চাই বলে দিচ্ছি।
–এই দ্যাখো পাঁচখানা একশো টাকার নোট। দেখতে পাচ্ছ?
–জাল নোট নয় তো গোপাল? তোমাকে বিশ্বাস হয় না। তুমি আমায় যা ভোগাচ্ছ।
–আঃ। চলো। দেরি হয়ে যাচ্ছে।
পায়ের শব্দ শুনে সরে এলুম। থামের আড়ালে কর্নেল ইশারা করছিলেন। ওঁদের কাছে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসে পড়লুম। দরজা খুলে প্রথমে বেরুলেন জয়গোপালবাবু, তার পেছনে প্রফেসর তানাচা। স্পষ্ট দেখলুম, ওঁর নাকের তলায় সেই রক্তের ছোপ-উঁহু, নেলপালিশের রং লেগে রয়েছে। বারান্দা ঘুরে রাজাবাহাদুরের ঘরের দিকে ওঁরা চলে গেলে আমরা নিঃশব্দে উঠে পড়লুম। দুজনকে আর দেখা গেল না। পাশের কোনও ঘর দিয়ে রাজাবাহাদুরের ঘরে ঢুকতে যাচ্ছে বুঝি।
রাজাবাহাদুরের ঘরের সামনে যেই গেছি, দরজা খুলে রাজাবাহাদুর হাসিমুখে বেরুলেন। পরনে রাতের পোশাক। ফিসফিস করে বললেন, -রেডি থাকুন। ওরা ঘরে ঢুকে আমাকে দেখতে পাবে না। ভড়কে যাবে।
আমরা ওত পাতলুম ফের। ঘরে আলো জ্বলে উঠল। তারপর ঘরের ভেতর থেকে ওদের কথা শোনা গেল।
–আরে! রাজাবাহাদুর কোথায়?
বাথরুমে ঢুকেছেন।
–অসম্ভব। রাত দুটোয় আমার আসার কথা নিশ্চয়ই ফাস করে দিয়েছ। তাই রাজাবাহাদুর অন্য ঘরে শুয়েছেন। তা যা করেছ, করেছ। কবচটা বের করো।
-কবচটা বালিশের তলায় রেখেছিলেন সেদিন। ..উঁহু। নেই দেখছি।
রাজাবাহাদুর নিঃশব্দে হেসে পকেট থেকে কালো সুতোয় বাঁধা প্রকাণ্ড একটা কবচ বের করে আমাদের দেখালেন। ভেতরে ওদের কথা ফের শোনা গেল। –চালাকি? বের করো খুঁজে। নইলে…
-ওরে বাবা। মরে যাব! মরে যাব। এই! কী হচ্ছে! বাবা যে! রাজাবাহাদুর! বাঁচান! বাঁচান!
প্রথমে রাজাবাহাদুর হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে গেলেন। আমরাও ঢুলুম। উজ্জ্বল আলোয় দুই মূর্তি ব্ল্যাকবোর্ডে খড়ি দিয়ে আঁকা স্কেচের মতো ড্যাবডেবে চোখে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল। তারপর প্রফেসর তানাচা গুলতির বেগে ছিটকে আমাদের পেছনে চলে এলেন। রাজাবাহাদুর কবচটা জয়গোপালবাবুর মুখের সামনে নেড়ে মুখ ভেংচে বললেন, -কবচ নেবে? কবচ? তুমি বরখাস্ত। এতদিন ধরে ভোগাচ্ছ। কবে ঘাড় ধরে তাড়িয়ে দিতুম। সাহস পাইনি, তাই। যাও, কেটে পড়ো রাজবাড়ি থেকে।
জয়গোপালবাবু হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়লেন ছোরা তুলে ডাঃ ঢোলের ওপর–তবে রে নেমকহারাম বলে এক চিকুর ছেড়ে। ভয়ে চোখ বুজলুম। তারপর ধস্তাধস্তি শুনে চোখ খুলে দেখি, জয়গোপালবাবুকে ধরাশায়ী করে আমার বৃদ্ধ বন্ধু তার বুকে বসে ছোরা ধরা হাতটা মোচড়াচ্ছেন। ছোরাটা পড়ে যেতেই রাজাবাহাদুর কুড়িয়ে নিলেন। ধার পরীক্ষা করে বললেন, –শান দিয়েছে, বুঝলেন মশাই? হুঁ–তাই অস্ত্রাগারের একটা ছোরা বেমালুম উড়ে গিয়েছিল! রোসো, থানায় ফোন করে পুলিশ ডাকি।
রাজাবাহাদুর পালঙ্কের পাশে গিয়ে ফোন তুলে ডায়াল করতে থাকলেন। কর্নেল জয়গোপালবাবুর বুক থেকে উঠে দাঁড়ালেন। জয়গোপালবাবু ফেস-ফোঁস করে শ্বাসপ্রশ্বাস ফেলছেন। গোয়েন্দাপ্রবরের ওজন বুড়ো হাড়ের দরুন এক কুইন্টাল মতো হবে! ডাঃ ঢোল কাঁপতে-কাঁপতে বললেন, –সর্বনাশ! এ যে সাংঘাতিক খুনে লোক! কর্নেল খপ করে না ধরলে ছোরাটা..বাপস! ভাবা যায় না! সত্যি ভাবা যায় না! ও কর্নেল! এই ভদ্রলোকেরই দেখছি সিজোফ্রেনিয়া হয়েছে। ইনিই ডাক্তার জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড!
রাজাবাহাদুর ফোন করে এসে বললেন, –থামুন মশাই! আপনি তো আমাকেই জেকিলহাইডের রোগ ধরিয়ে দিচ্ছিলেন।
কর্নেল শক্তগলায় বললেন, –জয়গোপালবাবু! পালানোর মতলব করবেন না কিন্তু। তারপর পকেট থেকে নিজের খুদে অথচ সাংঘাতিক পিস্তলটি বের করে ওঁর নাকের ডগায় ধরলেন। –ভালোছেলের মতো চুপচাপ বসে থাকুন। রাজাবাহাদুর! পুলিশ কী বলল!
