-কীভাবে জানলেন?
প্রফেসর তানাচার বুকপকেটে জয়গোপালবাবুর চিঠি ছিল।
–হ্যাঁ মনে পড়েছে। আপনি ওঁর পকেট থেকে একটা খাম বের করে নিয়েছিলেন।
–আমরা যে ওখানে ঠিক ওই সময় ওত পাতব, জয়গোপালবাবু জানতেন না। তাই তাড়াতাড়িতে বাকি কাজ করতে পারেননি। কিন্তু আমাদের ভুল হল। দুজনেই চলে এলুম। তবে নেলপালিশের শিশিটা পালাতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিল। আর খুঁজে পাননি। খুঁজতে গিয়েও আমাদের দেখে কেটে পড়েন।
মাথা গুলিয়ে যাচ্ছিল। বললুম, –সে রাতে অলক্ষ্মীর মন্দিরে আমরা তো শুধু প্রফেসর তানাচাকে দেখেছিলুম। জয়গোপালবাবু থাকলে টর্চের আলোয় তাকেও দেখতে পেতুম না কি?
জয়ন্ত, জ্যোৎস্নারাতে সিংহাসনে উপবিষ্ট অলক্ষ্মী দেবীর কোলে কেউ বসে থাকলে চোখে পড় কঠিন। প্রফেসর তানাচাও টের পাননি। কর্নেল সোজা হয়ে বসলেন। চুরুটটা নিভে গিয়েছিল ফের ধরিয়ে নিলেন। বাইরে কুয়াশামাখা জ্যোৎস্নায় সেই অলুক্ষুণে পাচাটা ক্রাও-ক্রাও করে ডাকতে-ডাকতে উড়ে গেল। তারপর দুরে নদীর ওদিকে শেয়াল ডাকতে লাগল। অজানা ভয় আমার গা ছমছম করে উঠল।
বললুম, –তাহলে ইস্কাপনের টেক্কা কে?
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, –সেটা আজ রাতেই জানতে পারবে, জয়ন্ত। অধীর হয়োত
তারপর উনি হঠাৎ হলঘরের দরজায় বেরুলেন। একটু পরে ফিরে এলেন প্রকাণ্ড একজো গামবুট নিয়ে। এমন পেল্লায় গড়নের কালো গামবুট কস্মিনকালে দেখিনি। এ কি মানুষের পো জন্য তৈরি, না দানবের?
অবাক হয়ে বললুম, ওরে বাবা! এ কি দত্যিদানোর পায়ের গামবুট?
ডাঃ ঢোল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিলেন। তিনিও শিউরে উঠে বললেন, –এই গামবুট পরেই রাজবাড়ির অশরীরী ঘুরে বেড়ায় সারা রাত। হুঁ, যাই বলুন কর্নেল, রাজবাড়ির ভূতপ্রেতগুলোও মানসিক রুগি। নইলে কে কবে শুনেছে, ভূত গামবুট পরে ঘুরে বেড়ায় ধুপ-ধুপ করে?
কর্নেল বললেন, -ভূত নয়, ডাক্তার ঢোল। মানুষই পরে বেড়ায়। বিশেষ অর্ডার দিয়ে তৈরি এই গামবুট লোকটাকে প্রাণের দায়ে পরতে হয় এবং মনিবের হুকুমমতো রাতবিরেতে ঘুরে বেড়াতে হয় হাতি-ভূত সেজে।
ডাঃ ঢোল এবং আমি একসঙ্গে বললুম, -কে সে?
আবার কে? রাঘব। কর্নেল একটু হেসে বললেন, আজ ইচ্ছে করেই বেচারি এদুটো সিঁড়ির তলায় রেখেছিল, যাতে আমাদের নজরে পড়ে। রাঘব আর মনিবের হুকুম মানতে চাইছে না। আমাদের দেখে ও সাহসী হয়ে উঠেছে।
.
দেড় ঘণ্টা সময় আর কাটতে চায় না। ডাঃ ঢোলকে দেখলুম চেয়ারে লম্বা হয়ে ঢুলছেন। কর্নেল চোখ বুজে ধ্যানস্থ। টেবিল ল্যাম্প নিবিয়ে দেওয়া হয়েছে। হলঘরের ঘড়িতে ঢঙাস-ঢঙাস বিদঘুটে শব্দে দুটো বাজলে কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, -জয়ন্ত! এসো। ডাক্তার ঢোল! চলে আসুন। এ রাতে রাস্তা ক্লিয়ার।
ডাঃ ঢোল চোখ মুছতে-মুছতে উঠলেন। আস্তে দরজা খুলে আমরা বেরুলুম। হলঘরে আলো। নেই। ওপরের বারান্দায় টিমটিমে বালব জ্বলছে সিঁড়িতে বিশাল কুকুরটা নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছ। তাকে ডিঙিয়ে আমরা ওপরে গেলুম। তারপর দেখি, জয়গোপালবাবুর অন্য কুকুরটা রাজার্বাহাদুরের ঘরের দরজায় সামনের একটা ঠ্যাং তুলে অন্য ঠ্যাং দিয়ে ঠুকঠুক করে ঘা দিচ্ছে। কর্নেল ফিসফিস করে বললেন, –কেমন ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে দেখছ তো? ডোবারম্যান পিঞ্চারটা ওকে পাহারা দিত। আনাচে-কানাচে কেউ এসে রহস্যটা ধরে ফেলবে, তার জো ছিল না। তেড়ে যেত আগে থাকতে। অ্যালসেশিয়ানটাকেও দরজায় টোকা দেওয়া শেখানো হয়েছিল। টোকা দিয়ে নিঃশব্দে গা-ঢাকা দিত। ওই দ্যাখো, লাব্রাডর রিট্রিভার জাতের কুকুরটাও কেমন লুকিয়ে পড়ল। চলে এসো–ও এখন কী করবে দেখা যাক।
বারান্দা পূর্বে ঘুরে গেছে। বড়ো-বড়ো থাম রয়েছে। দেখলুম, একটা ঘরের দরজা ঠেলে কুকুরটা ঢুকে পড়ল। তারপর সেই শব্দটা হল–ঝনঝনঝনাত। কর্নেল বললেন, –ওটা কিচেন। থালাটা ছুঁড়ে ফেলে তক্ষুনি কুড়িয়ে যথাস্থানে রাখবে। ওই দ্যাখো, কেমন গোবেচারার মতো বেরিয়ে আসছে এবার।
কুকুরটা আমাদের দেখে দৌড়ে এল। আমি আঁতকে উঠেছিলুম তাকে আসতে দেখে। ডাঃ ঢোল সটান আমার পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু কুকুরটা আমাদের প্রত্যেকের পা শুঁকে নিঃশব্দে চলে গেল অন্যদিকে। আমরা বারান্দা দিয়ে ঘুরে উত্তর-পূর্ব কোণে পৌঁছলুম। কর্নেল ডাঃ ঢোলকে টেনে নিয়ে থামের আড়ালে ওত পাতলেন। আমি শেষ ঘরটার সামনে গিয়ে দুরুদুরু বুকে দাঁড়ালুম। পকেটে হাত ভরে রিভলভারের বাঁটটা চেপে ধরলুম। তারপর পরদা তুলে দেখলুম, দরজা বন্ধ। ভেতরে কারা খুব চাপাগলায় কথা বলছে। একটু পরে বুঝলুম, তর্কাতর্কি চলেছে। কপাটের ফাঁকে কান পাতলুম। ভেতর থেকে ওইসব কথাবার্তা স্পষ্ট ভেসে আসছিল।
-তুমি আগাগোড়া সব ফাঁস করেছ রাজাবাহাদুরের কাছে। তোমাকে আমি অলক্ষ্মীর থানে আসতে বলেছি, তাও বলে দিয়েছ। নইলে রাজাবাহাদুর ওই ঘুঘুদুটোকে কেন ওসময় ওখানে পাঠাবেন। জানবেন কীভাবে বলো?
বেশ করেছি। কেন তুমি আমার কবচ চুরি করতে চেয়েছিল, তার জবাব আগে দাও।
–কবচ নিশ্চয়ই তুমি রাজাবাহাদুরের কাছে রেখেছ। যদি…
–বেশ করেছি।
চমকে উঠলুম। এ কী! এ যে প্রফেসর তানাচার গলা। মনে পড়ে গেল, জনাই-পাগলা বলেছিল-মড়া পাইলে গেছে! প্রফেসর তানাচার মড়া দেখছি সত্যি পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যদি মড়া হবে, তাহলে কথা বলছে কেমন করে? হতবুদ্ধি হয়ে শুনতে থাকলুম। …
