-কোনটা ঢুকছে না বলো তো বৎস!
–কোনটার কথা বলব! ধরুন, প্রফেসর তানাচার তাসের থটরিডিং এবং ওই মন্ত্রটা!
কর্নেল হাসলেন। আরে, ওটা ওই তাসের খেলার একটা সূত্র। জয়গোপালবাবু দশজোড়া তাসের খেলার কথা বলার পর অনেক ভেবে রহস্যটা ধরেছি। মন্ত্রটা লক্ষ করো মোট দশজোড়া বর্ণ আছে। ক ব য (জ) র ই স ম ছ ড় প। প্রত্যেকটির বর্ণ দুটো করে। তাহলে কুড়িটে হল। ধরো তুমি ইস্কাপন আর রুহিতনের দুটো টেক্কার জোড়া মনে রাখলে। আমি ক-য়ে রাখলুম ইস্কাপনের টেক্কা। পরের ক পাচ্ছি তৃতীয় লাইন তৃতীয় অক্ষরে। ছাড় কুইচ্ছে লাইনে পাঁচটা অক্ষরের তৃতীয় হল ক। সেখানে রাখলুম তোমার মনে রাখা সজোড়ার দ্বিতীয়টা-রুহিতনের টেক্কা। তুমি যখনই বলবে তোমার তাস প্রথম ও তৃতীয় লাইনে আছে, তখনই আমি জানতে পারছি কোন-কোন তাস জোড়া বেঁধেছিল। … কর্নেল একটা কাগজে সাজানোর পদ্ধতি লিখে দেখালেন।
হতাশ হয়ে বললুম, –তাহলে নিছক ম্যাজিক! ধুস! আমি ভেবেছিলুম গুপ্তধনের সংকেত।…
.
দুপুরে খাওয়ার পর দেখি, ঘুঘুমশাই একটা জরাজীর্ণ বই পড়ছেন খুব মন দিয়ে। কুলকারিকা : লৌহগড় রাজবংশের ইতিহাস। শ্রীমন্মহারাজ অসিতেন্দ্র নারায়ণ দেবশর্মা প্রণীত।
কর্নেল সন্ধ্যা পর্যন্ত বইটা নিয়েই কাটালেন। বিকেলে আমি এবং ডাঃ ঢোল পশ্চিমের ঝিলে হাঁস দেখতে গিয়েছিলুম। রাজবাড়ির গেটে ঢুকে চোখে পড়ল, জয়গোপালবাবু রাঘবকে শাসাচ্ছেন, কুকুর দিয়ে খাওয়াব তোকে। জনাইকে দেখেও শিক্ষা হয়নি?
ঘরে ফেরার পর রাঘব যখন চা দিতে এল, তার মুখ ভার। কর্নেল তখনও বইটা পড়ছেন। হলঘরের ঘড়িতে সাতটা বাজলে বই বন্ধ করে বললেন, –আজ তেসরা নভেম্বর। আজ রাত দুটোয় প্রফেসর তানাচার আত্মার আবির্ভাব। মল্লযুদ্ধের সম্ভাবনা। নায়েব ব্রজনাথের হারানো কবচ উদ্ধার। কটা আইটেম হল, জয়ন্ত? –আরেকটা আছে। সেটা বলব না। তৈরি থাকো, ডার্লিং! অবশ্য তোমার তো নেমন্তন্নই আছে…।
.
০৬.
রাত দশটা বাজল খাওয়া-দাওয়া সেরে নিতে। জয়গোপালবাবু আজ অনেকক্ষণ আড্ডা দিলেন এ-ঘরে। তারপর হাই তুলে শুভরাত্রি জানিয়ে শুতে গেলেন। ডাঃ ঢোল রাজাবাহাদুরকে ঘুমের ইঞ্জেকশান দিয়ে থাকবেন সম্ভবত। আজ আর ওপরে কাল রাতের মতো রাজাবাহাদুরের চ্যাঁচামেচি শুনতে পেলুম না। রাত সাড়ে এগারোটায় আমাকে চমকে দিয়ে হলঘরের দরজায় টোকা বাজল ঠক-ঠক-ঠক। কর্নেল ফিসফিস করে বললেন, দরজা খোলো জয়ন্ত!
উনি শোননি। টেবিল ল্যাম্পের কাছে বসে চুরুট টানছিলেন। রিভলভার হাতে দরজা ভয়ে-ভয়ে খুলতেই ডাঃ ঢোল ঢুকে পড়লেন। মুখে উত্তেজনার ছাপ।
কর্নেল বললেন, -খবর?
খুব ভালো। তবে রাঘব হেল্প না করলে পারতুম না। –ডাঃ ঢোল চাপাস্বরে বললেন, আপনি বললে-ওর হেল্প চাইতে সাহসই পেতুম না। দেখলুম ওর মাসতুতো দাদার ওই দশার জন্য ম্যানেজারবাবুর ওপর ভীষণ রাগ। এতদিন প্রকাশ করার সুযোগ পায়নি লোকটা।
–হুঁ–কুকুরটা এখন কোথায় ঘুমুচ্ছে?
হলঘরের সিঁড়িতে।
–অন্যটা?
ওর মাথার কাছে বসে আছে। মাঝে-মাঝে স্যাঙাতের গা শুঁকছে। ডাঃ ঢোল চুপিচুপি হাসলেন, আমার কিন্তু বড় আনন্দ হচ্ছে, কর্নেল! জীবনে এমন সাংঘাতিক কাজ কখনও করতে পারিনি। তবে এও সত্যি, আপনারই বুদ্ধি আর প্রেরণা ছাড়া কি পারতুম? কক্ষনও না। –রাজাবাহাদুরের খবর কী?
-জয়গোপালবাবুর তাগিদ। না অ্যাটেন্ড করে উপায় আছে? তবে আপনার কথামতো ঘুমের বদলে নার্ভ স্ট্রং করার জন্য একটা ইঞ্জেকশান দিয়েছি। আসলে ওঁর নার্ভের চাপে ওই অনিদ্রা আর অস্বস্তির ব্যাধি। এ থেকেই তো সিজোফ্রেনিয়া ডেভলাপ করে। এখন সবে ফাস্ট স্টেপ চলছে।
কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন, –জয়গোপালবাবু আপনাকে দিয়ে সাব্যস্ত করতে চেয়েছিলেন প্রফেসর তানাচা দৈবাৎ খুন হয়ে গেলে, হত্যাকারীর দায়িত্ব যাবে রাজাবাহাদুরের ঘাড়ে। কারণ রাতে ওঁর সেন্স থাকে না। কী করেন টের পান না। কাজেই…
-রাইট, সেন্ট পার্সেন্ট রাইট। আপনি ইশারা না দিলে তো আমি বেঁকের মাথায় রাজাবাহাদুরকেই প্রায় দায়ী করে বসেছিলুম!
কর্নেল চোখ বুজে একটা একটু দুলতে-দুলতে বললেন, রাজাবাহাদুরের বয়স প্রায় সত্তরের ওপরে। নিঃসন্তান বিপত্নীক মানুষ। এত বড়ো বাড়িতে আগের মতো লোকজন নেই। প্রায় খাঁ-খা অবস্থা। এই পরিবেশে অলক্ষ্মীর ভূতুড়ে ক্রিয়াকলাপ শুরু হলে নার্ভের অসুখ হতে বাধ্য। কিন্তু তিনি বুদ্ধিমান মানুষও। তাই মূল ব্যাপারটা ধরতে পেরেছিলেন। ভয় পাননি। তাই মরিয়া হয়ে জয়গোপালবাবু আপনার সাহায্য নিয়ে ওঁকে রাতে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে চাইছেন–যাতে ব্রজনাথের কবচ খুঁজে বের করা যায়।
চুপ করে থাকা গেল না। বললুম, –কিন্তু কবচ তো প্রফেসর তানাচার কাছে ছিল। ওঁর ঘর থেকে চুরি গিয়েছিল সেটা।
কর্নেল বললেন, -মনে করে দ্যাখো জয়ন্ত। কলকাতায় আমার ঘরে আমি চুরির প্রশ্ন তুলতেই প্রফেসর তানাচা উদভ্রান্তের মতো সর্বনাশ! ঠাকুরদার কবচটা বলে বেরিয়ে যান। চুরি যে হয়েছে, সেটা কিন্তু বলেননি। ঠাকুরদার কবচটা চুরি গেছে কি না, সেটা দেখতেই ছুটে গিয়েছিলেন।
ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে বললুম, -কী আছে কবচে যে তাই নিয়ে এত কাণ্ড?
কর্নেল চাপাগলায় বলতে শুরু করলেন, -সতেরো শতকে দুর্ধর্ষ রাজা শিবেন্দ্রনারায়ণ শুধু অলক্ষ্মীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেননি, তার জন্য গয়নাও বানিয়েছিলেন। লক্ষ টাকা দামের হিরের গয়না। তার মৃত্যুর পর সেই গয়না তার ছেলে নরেন্দ্রনারায়ণ খুলে এনে রাজবাড়িতে রাখেন। কিন্তু অলক্ষ্মীর গয়না খুলে আনার পর নাকি দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে। মানুষের কুসংস্কারের এই রীতি। শেষে গয়নাটা কোথাও পুঁতে রাখা হয়। এর সন্ধান জানতে পেরেছিলেন ব্রজনাথ চাটুজ্জে-রাজবাড়ির নায়েব। কিন্তু তার সাহস হয়নি ওটা উদ্ধার করতে। তাই এক টুকরো কাগজে সেটা লিখে কবচের মধ্যে রেখেছিলেন। মৃত্যুর সময় বলে যান, আমার বংশধরদের কারুর সাহস থাকলে এই কবচ যেন খুলে দেখে। কুসংস্কার বড়ো জটিল ব্যাধি, জয়ন্ত! তার নাতি প্রফেসর তানাচা এর গুরুত্ব বুঝতেন। কিন্তু খুলে দেখার সাহস ছিল না। যাই হোক, কুলকারিকা বইতে এ-বিষয়ে কিছু আভাস আছে। রাজাবাহাদুর আমাকে সব খুলে বলেছেন। জয়গোপালবাবু সেই কবচের সন্ধানে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। মির্জাপুরের মেসবাড়ির প্রফেসর তানাচার ঘরে সেটা খুঁজে না পেয়ে উনি ফাঁদ পাতেন। অলক্ষ্মীর কাছে দোসরা অক্টোবর রাত দশটায় প্রফেসর তানাচাকে হাজির থাকতে বলেন। লোভ দেখান, কথামতো কাজ করলে উনি টাকা পাবেন।
