গা শিউরে উঠল। কর্নেল হাসতে-হাসতে বললেন, দেখলেন তো ডাক্তার ঢোল? জয়ন্ত কেমন বোকা বনে গেছে?
ডাঃ ঢোল তারিফ করে বললেন, –রিয়ালি! আপনি দারুণ গুণী লোক! তুলনা হয় না।
কর্নেল তাসের প্যাকেট একপাশে সরিয়ে রেখে বললেন, -তারানাথ চাটুজ্জে–মানে প্রফেসর তানাচা প্রথম খেলাটা আবিষ্কার করেছিলেন, জানেন ডাক্তার ঢোল? দ্বিতীয়টা অবশ্য আমার আবিষ্কার। দুঃখের বিষয় প্রফেসর তানাচাকে কে শুধু খুন করল তাই নয়, ওঁর ডেডবডিটাও লুকিয়ে ফেলল।
ডাঃ ঢোল ভুরু কুঁচকে বললেন, –কিছু ক্লু পেলেন?
–পেয়েছি। একটা নেলপালিশের শিশি। এই দেখুন।
খুনে শিশিটা নিয়ে ডাঃ ঢোল নাড়াচাড়া করার পর ছিপি খুলেই চমকে উঠলেন। সর্বনাশ! এ তো লিকুইড ক্লোরোফর্ম! নাকে লাগালেই মানুষ অজ্ঞান হয়ে যাবে। বলে উনি ঝটপট ছিপি এঁটে দিলেন। একটা ঝাঝালো মিঠে গন্ধ কয়েক সেকেন্ডের জন্য ছড়িয়ে পড়ল।
কর্নেল গম্ভীর হয়ে বললেন, -হা, ক্লোরোফর্ম। নেলপালিশের সঙ্গে মেশানো। নির্বোধ প্রফেসর তানাচা! ব্যাপারটা টের পাননি। আচ্ছা ডাক্তার ঢোল, জয়গোপালবাবুর সঙ্গে আপনার কতদিনের পরিচয়?
পরিচয় মোটেও ছিল না। উনিই আমার ক্লিনিকের বিজ্ঞাপন কাগজে দেখে ট্রাংককলে যোগাযোগ করেছিলেন। সময় পাচ্ছিলাম না। শেষে তাড়া দিলেন। অ্যাডভান্স টাকাও পাঠালেন। তখন চলে এলুম। –ডাঃ ঢোল মুখে বিস্ময় ফুটিয়ে বললেন, কিন্তু একথা জিগ্যেস করছেন কেন বলুন তো! আমার ওপর কি কোনও সন্দেহ আছে আপনার?
কর্নেল হাত তুলে বললেন, -না, না। জাস্ট জানতে চাইছি।
কী জানি মশাই, আপনার সম্পর্কে যা সব শুনছি, বড্ড ভয় করে। শুকনো হাসলেন ডাঃ ঢোল।
কর্নেল চাপাগলায় বললেন, আপনার একটু সাহায্য চাই ডাক্তার ডোল! পাব তো!
–অবশ্যই পাবেন। বলুন, কী করতে হবে।
-জয়গোপালবাবুর দুটো কুকুর আছে। একটা মোটামুটি শান্ত, মানুষ-ঘেঁষা স্বভাবের। ওটাকে নিয়ে সমস্যা নেই। অন্য কুকুরটা–যেটা লম্বাটে ছিপছিপে গড়নের, মানে ডোবারম্যন পিঞ্চার জাতের কুকুরটার কথা বলছি। …
-ওরে বাবা! সে যে ধড়িবাজ বদমাশ! দুর থেকে খালি আমাকে দাঁত দেখায়।
-ডাঃ ঢোল, মানুষের বুদ্ধিই মানুষকে সব প্রাণীর প্রভু করেছে। আপনি বিচক্ষণ মানুষ। দ্বিতীয় কুকুরটাকে যেভাবেই হোক ইঞ্জেকশান দিয়ে আজ রাতে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হবে।
ডাঃ ঢোল চমকে উঠে নাক চুলকে বললেন, -সর্বনাশ! সে তত বড্ড রিস্কি।
আমি আপনাকে অ্যাসিস্ট করব ডাক্তার ঢোল! কিন্তু সাবধান, জয়গোপালবাবু যেন না টের পান।
তা আর বলতে? –ডাঃ ঢোল চিন্তিতভাবে বললেন, কিন্তু কথাটা হল, যদি হঠাৎ কামড়ে দেয়! বলা যায় না, কুকুরের লালায় সাংঘাতিক সব ভাইরাস গিজগিজ করে।
কর্নেল বললেন, -মনে রাখবেন ডাক্তার ঢোল, ওই কুকুরটাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার ওপরই সব রহস্যের সমাধান নির্ভর করছে।
ডাঃ ঢোল অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজি হওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললেন, -আচ্ছা।
এই সময় রাঘব পরদা তুলে বলল, স্যার! রাজাবাহাদুর আপনাদের দুজনকে তলব করেছেন।
ডাঃ ঢোল নিজের ঘরে গেলেন। আমরা দুজনে রাজাবাহাদুরের কাছে গেলুম। পুজো সেরে রাজাবাহাদুর তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসেছিলেন। হেসে বললেন, –আসুন কর্নেল! আসুন সাংবাদিকবাবু!
কর্নেল তাসের প্যাকেট দিয়ে বললেন, আপনার তাস রাজাবাহাদুর! আশা করি, এ অনধিকার চর্চার জন্য ক্ষমা করবেন।
ক্ষমা করতে পারি এক শর্তে। যদি হারানো তাসটা উদ্ধার করতে পারেন।
করেছি।
–তাহলে ক্ষমা করে দিলুম।
–আমার আরেকটা ছোটো প্রশ্ন আছে, রাজাবাহাদুর।
জবাব দেওয়ার মতো হলে দেব। নইলে দেব না।
-জয়গোপালবাবু জনাইকে এমন মার মেরেছিলেন যে মাথায় সাংঘাতিক চোট লেগে পাগল হয়ে গেল। কেন মেরেছিলেন?
জনাই ওর অ্যালসেশিয়ানকে বিষাক্ত ইঞ্জেকশান দিয়ে মেরে ফেলেছিল।
কর্নেল একটু হাসলেন। আর প্রশ্ন করছি না। কিন্তু জনাইকে হুকুমটা গোপনে সম্ভবত আপনিই দিয়েছিলেন। রাজাবাহাদুর, জয়গোপালবাবুকে আপনি ভয় করেন, জানি, অথচ এত ভয়ের কারণ ছিল না। এখনও হয়তো নেই।
রাজাবাহাদুর চাপাগলায় উত্তেজিতভাবে বললেন, –আছে। ও ডাক্তার এনেছে। জোর করে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে চাইছে। কারণ সে দেখছে, আমি আপনাকে ডেকে এনেছি–তার সব কারচুপি ধরে ফেলেছি।
কর্নেল চোখ বুজে টাকে হাত বুলিয়ে বললেন, –হুঁ, দরজায়-দরজায় টোকা, উত্তর-পূর্ব ঘরটার ভেতর কাঁসার বাসন ছুঁড়ে ফেলার ঝনঝন শব্দ, ভারী পায়ে হেঁটে যাওয়া…
রাজাবাহাদুর সায় দিয়ে বললেন, -ধুপ-ধুপ-ধুপ-ধুপ… যেন দু পেয়ে হাতি হাঁটছে।
–আজ রাতে যদি আমার প্ল্যান সফল হয়, তাহলে দরজায় টোকা কেউ দেবে না এবং কাসার বাসনও কেউ ছুড়বে না।
আর ওই দু পেয়ে হাতিটাকে বুঝি বেঁধে রাখা যায় না?–রাজাবাহাদুর খিকখিক করে হাসলেন।
চেষ্টা করব। –বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন, তাহলে আসি রাজাবাহাদুর। একটু সাবধানে থাকবেন।
রাজাবাহাদুর আমার দিকে তাকিয়ে রগুড়ে ভঙ্গিতে বললেন, কী সাংবাদিকমশাই! কেমন সব গরমাগরম রহস্য! নোট নিচ্ছেন তো! সময়মতো দৈনিক সত্যসেবকে লিখবেন কিন্তু।
ওঁকে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে কর্নেলের সঙ্গে বেরিয়ে এলুম। আমাদের ঘরে পৌঁছে কর্নেলকে বললুম, বাপস! মাথা ভোঁ-ভোঁ করছে। কিছু ঢুকছে না।
