ফটকের কাছে গোয়েন্দাপ্রবরের সঙ্গে দেখা হল। বললুম, –আপনার পাখিটিও বুঝি প্রফেসর তানাচার মড়ার মতো পাইলে গেল?
কর্নেল একটু হাসলেন। জনাই-পাগলাকে যেভাবে পালাতে দেখলুম, ঠিক সেভাবেই। তবে আমি তাকে ভয় দেখাইনি।
–আপনি কী করে দেখলেন, আমি ওকে ভয় দেখাচ্ছিলুম?
কর্নেল বাইনোকুলারটি দেখিয়ে বললেন, -এই দূরবীক্ষণ যন্ত্রে বহু দূরের ঘটনা দৃষ্ট হয়, ডার্লিং! যাই হোক, জনাই দেখলুম তোমাকে খুব খাতির করছিল!
প্রফেসর তানাচার মড়া পালানোর গল্প শুনে কর্নেল খুব হাসলেন। তারপর বললেন, চলো! রোদ্দুর বড় চড়া। ফেরা যাক।
রাজবাড়ি পৌঁছে কর্নেল রাঘবকে ডাকলেন। রাঘবের ডিউটি আমাদের ফাইফরমাশ খাটা। তাই সে হলঘরে মোতায়েন ছিল। কর্নেল বললেন, -রাঘব! রাজবাড়িতে কেউ তাস খেলেন না?
রাঘব বলল, -রাজাবাহাদুর খেলেন দেখেছি। তবে একা-একা খেলেন।
পেশেন্স খেলা!–কর্নেল দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, হুঁ, আর কেউ খেলেন না? ম্যানেজারবাবু?
–আজ্ঞে না স্যার। ওনার খালি ওই কুকুর।
–এক প্যাকেট তাস জোগাড় করতে পারো?
রাঘব মাথা চুলকে বলল, -তাহলে সেই বাজার থেকে কিনে আনতে হয়। ম্যাঞ্জারবাবুকে বলি।
-না। রাজাবাহাদুরের তাসের প্যাকেট বুঝি পাওয়া যাবে না?
–আপনার নাম করে বললে সে কি আর দেবেন না স্যার? এক্ষুনি এনে দিচ্ছি।
রাঘব চলে গেলে সন্দিগ্ধভাবে বললুম, –তাস কী হবে? আপনাকে তো কখনও তাস খেলতে দেখিনি।
কর্নেল হাসলেন। ম্যাজিক দেখাব জয়ন্ত! থটরিডিংয়ের খেলা দেখিয়ে তোমাকে তাক লাগিয়ে দেব।
একটু পরে রাঘব এক প্যাকেট তাস নিয়ে হাসিমুখে ঘরে ঢুকল। রাজাবাহাদুর ঠাকুরঘরে ঢুকেছেন। সেই ফাঁকে নিয়ে এলুম স্যার! জানতে পারলে কিন্তু আমার রক্ষে থাকবে না।
কর্নেল তাকে আশ্বস্ত করলেন।
রাঘব চলে গেলে কর্নেল নিজের বিছানায় বসে তাসগুলো নিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কীসব খেলতে শুরু করলেন, যেন কচি খোকা। ছড়াচ্ছেন, আবার তুলে শাফল করছেন। আবার ছড়াচ্ছেন। সাজাচ্ছেন। দেখতে-দেখতে বিরক্তি ধরে গেল। চোখ বুজে সিগারেট টানতে থাকলুম। একসময় ভেতরে আসতে পারি বলে ডাঃ ঢোল ঘরে ঢুকলেন। কর্নেলকে তাস নিয়ে খেলতে দেখে বললেন, –পেশেন্স খেলছেন নাকি কর্নেলসায়েব?
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, –আসুন ডাক্তার ঢোল! আপনাদের আমি ম্যাজিক দেখাব।
-খুব ভালো, খুব ভালো। দেখান! ভেবেছিলুম আজই কেটে পড়ব। হল না। ম্যাজিক দেখেই সময় কাটাই।
–এখানে আসুন। জয়ন্ত, তুমিও এসো।
এ বুড়োখোকার এ-ধরনের পাগলামি বিস্তর দেখেছি। কাছে গেলে বললেন, –ডাক্তার ঢোল! আমি হাত দেব না। ঘুরে বসছি। দেখবও না কিছু। দশজোড়া তাস আপনারা বাছুন। বাকি তাস সরিয়ে রাখুন। এই দশজোড়ার মধ্যে আপনি একজোড়া আর জয়ন্ত একজোড়া মনে-মনে বেছে। নিন। স্মরণে রাখুন। তারপর কুড়িটে তাস একত্র করে রেখে দিন।
সে তো প্রফেসর তানাচার ম্যাজিক! জয়গোপালবাবু বলছিলেন!–না বলে পারলুম না কথাটা।
ডাঃ ঢোল কুড়িটা তাস নিয়ে দশটা জোড়া করে ফেললেন। বললেন, আমি একজোড়া বাছলুম। জয়ন্তবাবু, আপনি বাছুন।
আমি ইস্কাপনের বিবি আর একটা রুহিতনের তিরি বাছলুম। ডাঃ ঢোল দশজোড়া তাস একত্র করে কর্নেলকে দিলেন। কর্নেল ঘুরে বসেছিলেন এতক্ষণ। বললেন, -হয়েছে? ফু-মন্তর লেগে যা!
বলে তাসগুলোর ওপর হাত বুলিয়ে উনি সুর ধরে আওড়ালেন, -কবে যাবি রে সেই সমাজে, ছাড় কুইচ্ছে পোড়া পাম রে।
আমি তো অবাক।
পাঁচটা করে তাস এক সারিতে রেখে চারটে সারিতে সাজালেন কর্নেল। তারপর বললেন, –ডাক্তার ঢোল, আপনার তাসজোড়া এক সারিতে আছে, নাকি দুই সারিতে একটা করে আছে?
–প্রথম সারিতে একটা, তৃতীয় সারিতে একটা।
কর্নেল প্রথম সারি থেকে হরতনের গোলাম আর তৃতীয় সারি থেকে চিড়িতনের দশ তুলে বললেন, -রাইট?
ডাঃ ঢোল অবাক হয়ে বললেন, -বাঃ! এ তো ভারি অদ্ভুত!
আমি বললুম, –আমার জোড়াটা শেষ সারিতে আছে।
কর্নেল শেষ সারি থেকে ইস্কাপনের বিবি আর রুহিতনের তিরি তুলে বললেন, -রাইট?
–হুঁ। কিন্তু…
কোনও কিন্তুর ব্যাপার নেই ডার্লিং! এ হল মন্তর-তন্তরের ব্যাপার। কর্নেল তাসগুলো গুটিয়ে রেখে চুরুট ধরালেন।
ডাঃ ঢোল বললেন, আপনি দেখছি মশাই প্রচণ্ড গুণী লোক। জয়গোপালবাবুর কাছে আপনার অনেক গল্প শুনছিলুম। তবে ম্যাজিকের কথাটা তো উনি বলেননি।
-তবে আরও একটা ম্যাজিক দেখাই?
নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই!–ডাঃ ঢোল খুব উৎসাহ দেখালেন।
কর্নেল বললেন, -পুরো এক প্যাকেট তাস এখানে আছে। আপনারা জানেন, প্যাকেটে মোট তাস থাকে বাহান্নখানা। জোকার দুটো বাদ দিন। কেমন তো!
-খুব জানি।
কর্নেল তাসগুলো ডাঃ ঢোলকে দিয়ে বললেন, -একটা তাস এ থেকে আমি অদৃশ্য করে দিয়েছি। দেখুন তো কোনটা!
ডাঃ ঢোল তাসগুলো খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলেন। আমি কর্নেলের দিকে তাকিয়ে ছিলুম। কর্নেলের মুখে রহস্যময় হাসি। তাসগুলো দেখে ডাঃ ঢোল বললেন, -ইস্কাপনের টেক্কাটা তো দেখছি না? লুকিয়ে রেখেছেন বুঝি?
কর্নেল হাত বাড়িয়ে বললেন, –জয়ন্ত, তোমার পকেটে মন্ত্রবলে চালান করে দিয়েছি? দাও।
চমকে উঠেছিলুম। কিন্তু কিছু বললুম না। ইস্কাপনের টেক্কাটা বের করে দিলুম। আশ্চর্য! একই কোম্পানির তৈরি তাস। তাহলে রাজাবাহাদুরই কি ডাঃ জেকিল এবং মিঃ হাইডের কাহিনির মতো রাতের বেলা অন্যরকম হয়ে ওঠেন? তিনিই কি তাহলে প্রফেসর তানাচার খুনি?
