তাসটা পকেটে ভরে চত্বর থেকে নামলুম। তারপর কর্নেলের কাছে গিয়ে দেখি, ওঁর হাতে একটা ছোটো নেলপালিশের শিশি। অবাক হয়ে বললুম, –অলক্ষ্মীদেবী কি নেলপালিশ লাগান নখে?
কর্নেল হো-হো হাসতে লাগলেন। –কী বোকা! কী বোকা! ছ্যা-ছ্যা-ছ্যা! লোকটার বাহাত্ত্বরে ধরেছে!
-কে বোকা? কার বাহাত্তুরে ধরেছে?
কর্নেল হাসির মধ্যেই বললেন, –আবার কার? কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের। …
-কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের বয়স বাহাত্তর হওয়ার আগেই বাহাত্তুরে ধরেছে, একথা আর যেই বিশ্বাস করুক, আমি করব না। ব্যাপারটা কী বলুন তো শুনি?
কর্নেল হঠাৎ আমাকে টেনে ঝোপের মধ্যে বসে পড়লেন। আচমকা ওঁর ওই বিদঘুটে আচরণে বেজায় ভড়কে গিয়েছিলুম। চোখে চোখ পড়লে ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ করতে বললেন। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে এগোলেন এবং আমাকেও ওইভাবে অনুসরণ করতে বললেন। শক্ত পাথুরে মাটি এবং ঝোপগুলোয় প্রচুর কাঁটা–শরীরের কত জায়গা যে ছড়ে গেল কহতব্য নয়।
তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, –অল ক্লিয়ার! উঠে পড়ো ডার্লিং!
উঠে দাঁড়ালুম। চারদিক দেখতে দেখতে বললুম, -ব্যাপারটা কী?
প্রফেসর তানাচার খুনি সম্ভবত কিছু খুঁজতে আসছিল। কিন্তু আমরা যত সাবধানই হই, সে ঠিক বসে পড়ার মুহূর্তে আমাদের দেখতে পেয়েই পিঠটান দিল। কিন্তু আশ্চর্য জয়ন্ত! আমি কেন এমন বোকা হয়ে গেলুম লোহাগড়ায় এসে? কেনই বা আগাম বাহাত্ত্বরে ধরল?
বলে গোয়েন্দাপ্রবর পোশাক ঝাড়তে থাকলেন। টুপি খুলেও ঝাড়লেন। সাদা দাড়ি থেকে কয়েকটা শুকনো পাতা আর একটা খুদে রঙিন পোকাও বেছে ফেললেন। …
.
০৫.
কর্নেল কেন নিজেকে বোকা এবং বাহাত্তুরে ধরেছে বললেন, বিস্তর প্রশ্ন ছুঁড়েও আদায় করা গেল না। ট্র্যাকিং ডগ যেমন করে গন্ধ শুঁকে খুনির আনাগোনার রাস্তায় ছোটে, তেমনি করে কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক ঘুরলেন–নিচের দিকে দৃষ্টি। বারকতক অলক্ষ্মীর চত্বরে চক্কর দিলেন। তারপর সিধে হয়ে দাঁড়িয়ে চুরুট ধরালেন।
হাল ছেড়ে দিয়ে একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রইলুম। সামনের ঝোপে থরেবিথরে বুনো ফুল ফুটে কেমন একটা গন্ধ ছড়াচ্ছে। তার নিচে ভরা নদী কলকলিয়ে বয়ে যাচ্ছে। নদীর প্রসার মিটার তিরিশের বেশি নয়। ওপারে কাশবন ফুলে-ফুলে সাদা হয়ে আছে। তারপর ঢেউ-খেলানো ধানের মাঠ এবং এখানে-ওখানে একটা করে টিলা-পাহাড়। প্রকৃতির মধ্যে এলে যখন কর্নেলের কথামতো মগজ পরিষ্কার হওয়ার সম্ভাবনা, তখন আশা করি আমিও রহস্যটা বুঝে উঠতে পারব।
হুঁ–নেলপালিশটা একটা রহস্য বটে। নদীর ধারে এ জিনিস ঝোপের মধ্যে পড়ে থাকাটা কাজের কথা নয়।
নয় কি? ওই তো কিছুটা দূরে বাঁকের মাথায় আদিবাসীদের একটা বস্তি দেখা যাচ্ছে। কোনও আদিবাসী বালিকা এ পথে লোহাগড়ার বাজারে গিয়েছিল এবং শখ করে একটা নেলপালিশ কিনেছিল। ফেরার পথে সেটা কীভাবে এখানে পড়ে গেছে।
মনে-মনে খুশি হয়ে বললুম, ইউরেকা! তারপর ঘুরে দেখি, বাহাত্তরে-ধরা ভদ্রলোকটি অদৃশ্য। এদিক-ওদিক তাকিয়ে ওঁকে খুঁজে পেলুম না। তখন অলক্ষ্মীর উঁচু চত্বরে উঠলুম। এবার ওঁর টুপিটি দৃষ্টিগোচর হল। কালো বাইনোকুলার চোখে রেখে হাঁটু দুমড়ে বসে নিশ্চয়ই কোনও দুর্লভ পক্ষিবরকে দর্শন করছেন। বোঝা গেল, এবেলার মতো ওঁকে আর পাওয়া যাবে না।
চত্বর থেকে নেমে বোট-হাউসের দিকে সাবধানে এগিয়ে গেলুম। প্রফেসর তানাচার মড়াটা জনাই-পাগলা যদি সত্যি লুকিয়ে রেখে থাকে, এতক্ষণে খানিকটা অংশ ব্রেকফাস্ট খাওয়া হয়ে গেছে তাহলে। ত্রিসীমানায় পুলিশ নেই। অতএব জনাই নিশ্চিন্তে আস্তানায় ফিরে রাতের ঘুমটা পুষিয়ে নিতেও পারে।
যা ভেবেছিলুম, ঠিক তাই। বোট-হাউসের ভেতর জনাই-পাগলার ঠ্যাংদুটো দেখতে পেলুম। তারপর পুরো শরীরটা। ভাঙা পানসির আড়ালে ছায়ায় ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে তাকে দেখছিলুম। জনাই ঠ্যাং নাচাচ্ছে। চোখদুটো বুজে রয়েছে। উঁহু, ঘুমোচ্ছেন। কোথায় যেন পড়েছিলুম, ঘুমোলে। পাগলামি সেরে যায়। তাই পাগলরা ঘুমোয় না।
সাহস করে একটু কাশতেই জনাই তড়াক করে উঠে বসল। বোট-হাউসের মেঝে থেকে এক টুকরো ইটও হাতে নিল। তখন পকেট থেকে রিভলভার বের করে বললুম, –সাবধান জনাই! গুলি ছুড়ব বলে দিচ্ছি।
জনাই ইট ফেলে হাঁউমাউ করে উঠল। –ওরে বাবা! মরে যাব! মাইরি বলছি, মরে যাব! এই! এই!
বোট-হাউসে ঢুকে বললুম, ম্যাজিকবাবুর মড়া কোথায়?
জনাই রিভলভারটার দিকে ভয়ে-ভয়ে তাকিয়ে বলল, –পাইলে গেছে। তোমার দিব্যি।
–পালিয়ে গেছে? মড়া কখনও পালায়? নিশ্চয়ই তুমি খাওয়ার জন্য লুকিয়ে রেখেছ।
–যাঃ! কী যে বলে। ম্যাজিকবাবু আফিং খায়। ওর মড়া তেতো।
–জয়গোপালবাবুর কুকুরটার মড়া বুঝি মিষ্টি ছিল?
জনাই-পাগলা হাত বাড়িয়ে বলল, –একটা সিগ্রেট দেবে? দাও না।
রিভলভারটা পকেটে ঢুকিয়ে ওকে একটা সিগারেট দিলুম। দেশলাই জ্বেলে সেটা ধরিয়ে দিলে জনাই চো-চো করে কয়েকটা টান দিল। তারপর কাশতে লাগল। বললুম, –জনাই! ম্যাজিকবাবুর মড়াটা কোথায় গেল?
সিগারেটটা নিভিয়ে সে জটাচুলের ভেতর খুঁজে বলল, -মা অলক্ষ্মীর দিব্যি, পাইলে গেল। ধরতে গেছি, আর অমনি পাইলেছে!
পাগলামি করো না জনাই! তাহলে সত্যি গুলি ছুড়ব। –বলে ওকে ভয় দেখাবার জন্য যেই পকেটে হাত ভরেছি, অমনি জনাই আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে গুলতির মতো বেরিয়ে গেল। ধুলোময়লা ঝাড়তে-ঝাড়তে বোট-হাউস থেকে বেরিয়ে আর তাকে দেখতে পেলুম না।
