আর দেরি না করে ইস্কাপনের টেক্কার চিঠিটা দেখালুম কর্নেলকে। তারপর দরজায় টোকা, হস্তী-পদদর্শন ইত্যাদি ঘটনাও খুঁটিয়ে শোনালুম। কর্নেল, চোখ বুজে দুলতে-দুলতে বললেন, , শুয়ে পড়ো ডার্লিং। বেশি ভাবলে মাথা গুলিয়ে যাবে।
এ রাতে আর কিছু ঘটল না। আমার ভালো ঘুম হয়নি। যখনই কান পাতি, কর্নেলের নাকডাকা শুনি। তারপর একটু ঘুম এসে থাকবে। ভাঙল যখন, তখন আমার বৃদ্ধ বন্ধুর প্রাতঃভ্রমণ সারা হয়েছে। টেবিলে চা নিয়ে বসে আছে। আমাকে চোখ খুলতে দেখে অভ্যাসমতো সম্ভাষণ করলেন, গুড মর্নিং জয়ন্ত! আশা করি, সুনিদ্রা হয়েছে।
কিছুক্ষণ পরে রাঘব ব্রেকফাস্টের ট্রে নিয়ে এল। কর্নেল বললেন, -কাল রাতে তুমি কোথায় ছিলে রাঘব?
রাঘব থতমত খেয়ে বলল, -কলকাতায় যাত্রা শুনতে গিয়েছিলুম স্যার!
–ভালো। ম্যানেজারবাবু কী করছেন?
–মাঠে কুকুরদুটোকে শিক্ষে দিচ্ছেন স্যার। ওনার ওই বাতিক।
–আচ্ছা রাঘব, জনাই তোমার মাসতুতো দাদাতাই না?
রাঘবের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। –হ্যাঁ স্যার। মাসতুতো দাদা। সে-ই আমাকে এ রাজবাড়িতে এনেছিল। জনাইদা রাজাবাহাদুরের বাবার আমলের লোক। কপালের দোষে এই অবস্থা। দেখলে মনে বড়ো কষ্ট হয়।
জনাই পাগল হয়ে গেল কেন রাঘব?
রাঘব মুখ নিচু করে বলল, -ম্যাঞ্জারবাবুর কানে গেলে আমাকেও মারবে স্যার!
তুমি নির্ভয়ে আমাকে বলতে পারো। –কর্নেল ওকে আশ্বস্ত করে বললেন, তোমার ম্যানেজারবাবুর কানে কেউ তুলবে না।
রাঘব চাপাগলায় বলল, -সবই পরে শুনেছি। স্বচক্ষে দেখিনি স্যার! জনাইদা নাকি ম্যাঞ্জারবাবুর ঘরে রেতের বেলা ঢুকেছিল–কেন ঢুকেছিল বলতে পারব না স্যার! ম্যাঞ্জারবাবুর একটা কুকুর ছিল–এদুটো নয়, অন্য একটা কুকুর। সেই কুকুরটা ওকে যত কামড়েছিল, ম্যাঞ্জারবাবুও তত মেরেছিলেন। মার খেয়ে জনাইদা রাজবাড়ি ছেড়ে চলে যায়। তারপরে কিছুদিন নিপাত্তা হয়ে রইল। কিছুদিন আগে হঠাৎ দেখি নদীর ধারে বোট হাউসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সাধুর মতো চুল-দাড়ি গজিয়েছে। চিনতেই পারল না আমাকে। আসলে সেই মার খেয়েই জনাইদা পাগল হয়ে গেছে।
-কতদিন আগে জনাই মার খেয়েছিল?
–মাস দু-তিন হতে চলল প্রায়।
–তুমি নিশ্চয়ই তারানাথ চাটুজ্জেকে দেখেছ এ-বাড়িতে-নায়েববাবুর নাতি?
রাঘব হাসল। –ও! ম্যাঞ্জারবাবুর বাড়িও উঠতেন। রাজাবাহাদুরের হুকুমে ওনার এ-বাড়ি আসা বন্ধ হয়েছিল। ম্যাঞ্জারবাবুর হুকুমে আমরা ওনাকে থাকতে জায়গা দিতুম। আহা, বড়ো ভালো লোক ছিলেন। বুদ্ধির দোষে বেঘোরে মারা পড়লেন!
তুমি ওঁকে শেষবার দেখেছ কখন?–কর্নেলের প্রশ্নে রাঘব কেমন একটু হকচকিয়ে গেল। ঢোক গিলে বলল, -গতকাল বিকেলে দূর থেকে যেন নদীর ধারে একপলক দেখেছিলুম। চোখের ভুল হতেও পারে। তবে ওনার ওই অভ্যাসও ছিল স্যার!
-কী অভ্যাস?
–জঙ্গলে আফিংগাছ খুঁজে বেড়ানো।
–আফিংগাছ শুধু? নাকি অন্য কিছু?
রাঘব সাদা মুখে তাকাল। তারপর হঠাৎ চঞ্চুল হয়ে বলল, -ম্যাঞ্জারবাবু বকবেন স্যার! দেরি হয়ে গেল। আমি যাই।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, -হুঁ! ম্যানেজারবাবুকে তোমার বড় ভয়, জানি। কিন্তু আমি তোমায় সাহস দিচ্ছি রাঘব। ভয় করো না। বলো, আর কী খুঁজে বেড়ান ম্যাজিকবাবু?
রাঘব করুণমুখে বলল, -সত্যি বলছি, জানি না স্যার! ম্যাজিকবাবু পাগলা লোক। ওনার কতরকম বাতিক।
-কে ওঁকে খুন করতে পারে বলে মনে হয় তোমার?
রাঘব মুখে আতঙ্ক ফুটিয়ে বলল, –অলক্ষ্মী খুব সাংঘাতিক জাগ্যত ঠাকুর স্যার! রাতবিরেতে কেন, দিনেও কেউ ওখানে যায় না।
–হুঁ–জাগ্রত ঠাকুর বলছ তো?
–আজ্ঞে স্যার।
—তোমার জনাইদা কি সত্যি মড়া খায় রাঘব?
রাঘব আরও গম্ভীর হয়ে বলল, -পাগল তো! ম্যাঞ্জারবাবুর সেই কুকুরটা সাপের কামড়ে মারা গিয়েছিল। জনাইদা নাকি তার মড়া পর্যন্ত খেয়েছিল। এই যে শুনছি ম্যাজিকবাবু মড়াটা পাওয়া যাচ্ছে না। জনাইদাই লুকিয়ে রেখেছে দেখবেন।
-আচ্ছা, তুমি এসো রাঘব।
ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়ে কর্নেল বললেন, –চলো ডার্লিং! আজ একটু প্রকৃতির মধ্যে ঘুরে আসি। প্রকৃতির মধ্যে ঘোরাঘুরি করলে মাথা পরিষ্কার হয়।
কালকের মতো জয়গোপালবাবুকে কুকুরদুটোকে ট্রেনিং দিতে দেখলুম দুর থেকে। আজ ওরা আমাদের দিকে দৌড়ে এল না। পুবের ফটক পেরিয়ে প্রথমে গেলুম বোট-হাউসে। জনাইপাগলের পাত্তা নেই। ঘুরে নদীর ধারে-ধারে হেঁটে অলক্ষ্মীর মূর্তির কাছে পৌঁছলুম। দিনের আলোয় মূর্তিটাকে দেখে রাতের মতো তত ভয়ংকর মনে হচ্ছিল না। বরং যে প্রাচীন ভাস্কর এটা গড়েছে, তার প্রশংসা করতে ইচ্ছে করছিল। কালো পাথরের সিংহাসনে কালো পাথরের নারীমূর্তি। একটু এবড়ো-খেবড়ো গড়ন। চত্বরে গিয়ে কাছ থেকে ভালো করে মূর্তিটা দেখছিলুম। এই সময় চোখে পড়ল, পিঠের কাছে সিংহাসনের ফাটলে কী একটা ঢুকে রয়েছে। সেটার সঙ্গে কালো সুতো বাঁধা। সুতো ধরে টানতেই বেরিয়ে এল একটা তাস–ইস্কাপনের টেক্কা! উত্তেজিতভাবে বললুম, -কর্নেল! কর্নেল! এই দেখুন!
কর্নেল একটু তফাতে ঝোপে ঢুকে কী যেন করছিলেন। ঘুরে আমার হাতে তাসটা দেখে বললেন, -বুঝতে পারছ ডার্লিং? হত্যাকাণ্ডটা জমকালো করার জন্য এটা প্রফেসর তানাচার ডেডবডির গলায় বাঁধতে চেয়েছিল আমাদের এই রহস্যময় নায়ক। কিন্তু সময় পায়নি। তবে তার চেয়ে আরও মজার জিনিস এখানে আবিষ্কার করেছি।
