-আপনি কি আপনার পেশেন্টকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে এলেন?
–তা আর বলতে? জোর করে একটা ঘুমের ইঞ্জেকশান দিতে হল।
ডাঃ ঢোলের দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে আরও কিছু প্রশ্ন করতে যাচ্ছি, উনি উঠে দাঁড়ালেন। –আমি মশাই এ ভূতের বাড়িতে আর থাকব না। পেশেন্ট গোল্লায় যাক। টাকার আমার দরকার। নেই। কাল সকালেই কেটে পড়ব।
ডাঃ ঢোল আমাকে আরও সন্দিগ্ধ করে বেরিয়ে গেলেন। একটু পরে ওঁর ঘরের দরজা বন্ধ হতে শুনলুম। আমিও দরজাটা বন্ধ করে দিলুম। কর্নেলের এত দেরি হচ্ছে কেন কে জানে। চেয়ারে বসে আকাশ-পাতাল হাতড়াতে থাকলুম। এই রাজবাড়ির নায়েব হরনাথ চাটুজ্জে প্রফেসর তানাচার ঠাকুরদা ছিলেন। সেই ঠাকুরদার কবচ ওইভাবে কলকাতার সেনবাড়ি থেকে চুরি গেল। তারপর প্রফেসর তানাচা কর্নেলের ঘরে ব্যাগ ফেলে নিপাত্তা হলেন। ইস্কাপনের টেক্কার উড়ো চিঠি পেয়ে লোহাগড়ায় এ এক গোলকধাঁধা।
ঠুক-টুক-টুক।
চমকে উঠলুম। হলঘরের দিকের দরজায় কেউ টোকা দিচ্ছে। আবার ঠুকঠুকঠুক।
হঠাৎ নিজের ওপর খাপ্পা হয়ে উঠলুম। ধুরন্ধর কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের সহচর হয়ে কত সব সাংঘাতিক ঘটনার মধ্যে পড়েছি। কতবার মরতে-মরতে বেঁচে গেছি। আর এই লোহাগড়া রাজবাড়িতে এসে ভূতের ডাকে ভয় পাব! রিভলভার আর টর্চ নিয়ে এক ঝটকায় দরজা খুললুম।
আশ্চর্য! কেউ নেই। হলঘরের ম্লান আলোটা জ্বলছে। তবু টর্চ জ্বাললুম। তারপর ওপরে। কোথাও শব্দ হল ধুপ-ধুপ-ধুপ! আলো ফেললেই এক পলকের জন্য চোখে পড়ল, অবিকল হাতির পেছনকার দুটো পা ওপরের বারান্দা কাঁপিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সেই আজগুবি হাতি। শব্দ উঠছে ধুপ ধুপ ধুপ ধুপ! কালো গাব্দা দুটো পা ওপরের বারান্দায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
রিভলভার বাগিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়েছি, হঠাৎ কোত্থেকে সেই ঘিয়ে ভাজা লোমহীন উঁচু ছিপছিপে চেহারার সাংঘাতিক মারমুখী কুকুরটা–ডোবারম্যান পিঞ্চার, দাঁত বের করে সিঁড়ির মাথায় তখনকার মতোই রুখে দাঁড়াল। পরক্ষণে কোথাও ঝনঝনঝনাত শব্দে কেউ কিছু ছুঁড়ে ফেলল।
তক্ষুনি ছিটকে পিছিয়ে এসে ঘরে ঢুকে দড়াম করে দরজা এঁটে দিলুম। ঠকঠক করে কাঁপুনি শুরু হল। সব সাহস উবে গেল। ফেঁসে-যাওয়া বেলুনের মতো নেতিয়ে পড়লুম বিছানায়। কিন্তু কর্নেল কী করছেন এখনও? কোনও বিপদে পড়েননি তো? একটা সিগারেট ধরিয়ে উদ্বেগ প্রশমন করতে থাকলুম। নার্ভ অনেকটা শান্ত হল। তারপর দেখি, আমার বিছানায় ভাঁজ করা একটা কাগজ পড়ে রয়েছে। সেটা খুলেই ভড়কে গেলুম।
ময়লা কাগজে ডটপেনে দ্রুত লেখা একটা চিঠি। আমরা যখন বেরিয়েছিলুম অলক্ষ্মীর মন্দিরে, তখনই কেউ জানালা গলিয়ে বা ভেজানো দক্ষিণের দরজা খুলে ফেলে গিয়ে গেছে।
কী সাংবাদিকপ্রবর? কথা রাখলুম কি না বলো! তুমি সাংবাদিক যখন, তখন নিশ্চয় জানো যে, সব টাটকা খবরের ফলো-আপ বা পরবর্তী খবরও থাকে। আগামীকাল, তেসরা নভেম্বর, রাত দুটো নাগাদ রাজবাড়ির দোতলায় উত্তর-পূর্বদিকের শেষ ঘরটার দরজার সামনে দাঁড়ালে সেটা পাবে।
ইতি,
ইস্কাপনের টেক্কা
এবার আমার বাকি সাহসটুকুও উবে গেল। কে এই ইস্কাপনের টেক্কা? সে দেখছি আমাকে বুড়ি করে আসলে ধুরন্ধর গোয়েন্দাপ্রবর কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের সঙ্গেই সাংঘাতিক এক খেলায় মেতে উঠেছে। প্রথম চিঠির কথা হাতে নাতে ফলে গেছে। এবার দ্বিতীয় চিঠি না জানি আর কোনও ভয়ঙ্কর ঘটনার সংকেত! এবার তার লক্ষ্যবস্তু আমি নই তো? সে ভালোই জানে, কর্নেলের প্রিয় সঙ্গী আমি। কর্নেল আমাকে পুত্রের চেয়ে বেশি স্নেহ করেন। আমার ওপর আঘাত হেনে কি সে কর্নেলের ওপর কোনও প্রতিশোধ নিতে চায়?
খুবই সম্ভব। অতীতে কর্নেল অনেক হিংস্র খুনি ও অপরাধীকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন। সম্ভবত এই ইস্কাপনের টেক্কা তাদেরই কেউ হবে। তাছাড়া লোহাগড়া রাজবাড়ির সঙ্গে তার সম্পর্কও যেন আছে। তাই সে প্রতিহিংসার জাল পেতেছে এই লোহাগড়া রাজবাড়িতে। ..
চিঠিটা হাতে নিয়ে বসে রইলুম। কর্নেল কেন আসছেন না? জানালার বাইরে তাকাতেও সাহস হচ্ছে না। যদি অলক্ষ্মীর মূর্তিটা জ্যোৎস্নায় রাজবাড়ির বাগানে হাওয়া খেতে আসে? দূরে আবার শেয়াল ডাকল। সেই প্যাচাটা যেন আজ রাতে অস্থির হয়ে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে আর অমঙ্গলের বার্তা ঘোষণা করছে–ক্রাও-ক্রাও-ক্রাও! হলঘরের ঘড়িটা বিদঘুটে টঙাস-টঙাস শব্দ করছিল সারাক্ষণ। এবার খ্যানখ্যানে গলায় বারোবার ডাক ছাড়ল। সারা বাড়ি কাঁপতে লাগল সেই আওয়াজে।
কতক্ষণ পরে কর্নেলের সাড়া পেলুম দক্ষিণের দরজায়। জয়ন্ত, ঘুমিয়ে পড়োনি তো?
সঙ্গে-সঙ্গে সব ভয় কেটে গেল। ব্যস্তভাবে দরজা খুলে বললুম, –এত দেরি!
–জয়গোপালবাবু ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। উনি থাকেন রাজবাড়ির বাইরে উত্তরদিকে একটা আলাদা একতলা বাড়িতে। ওঁকে বিস্তর ডাকাডাকি করে ওঠালুম। পুলিশকে ফোন করলেন। আধঘণ্টা পরে পুলিশ এল। তখন পুবের ফটক দিয়ে বেরিয়ে অলক্ষ্মীর মন্দিরে গেলুম। তারপর…
কর্নেল চুপ করলে বললুম, –তারপর?
–আশ্চর্য! ডেডবডিটার পাত্তা নেই। দারোগাবাবু খাপ্পা হয়ে চলে গেলেন।
–ডেডবডি নেই দেখলেন?
কর্নেল একটু হাসলেন। জয়গোপালবাবু বললেন, এ কাজ তাহলে জনাই-পাগলার। সে মড়া খায়, উনি নাকি স্বচক্ষে দেখেছেন। সময়মতো খাবে বলে লুকিয়ে রেখেছে কোথাও। যাই হোক, বোট-হাউসে গিয়ে জনাই-পাগলাকে খুঁজলুম আমরা। তারও পাত্তা নেই।
