পূর্ণিমার চাঁদটা ড্যাবডেবে চোখে তাকিয়ে আছে নদীর ওপরে। জলের কলকলানি শোনা যাচ্ছে। জ্যোৎস্না ঝকঝক করছে জলে। ওপারে একদঙ্গল শেয়াল ডাকতে থাকল। রাজবাড়ির ফটকে গিয়ে কর্নেল বললেন, -কুকুরদুটোকে ভয় করার কারণ ছিল না, জয়ন্ত! সাপের ভয়ে হোক, কিংবা যে কারণেই হোক, রাতবিরেতে রাজবাড়ির ভেতর থেকে সম্ভবত ওদের বাইরে যেতে দেন না জয়গোপালবাবু। আসার সময় যে গজরানি শুনেছিলে, তার কারণ ওরা ট্রাকিং ডগ। ঘ্রাণশক্তি প্রবল। আমাদের চলাফেরা আঁচ করেছিল। ওই শোনো, আবার ওরা গজরাচ্ছে।
রাজবাড়ির কাছে গিয়ে কানে এল, ওপরতলায় চ্যাঁচামেচি হচ্ছে। কর্নেল বললেন, –রাজাবাহাদুর কাকে যেন শাসাচ্ছেন মনে হচ্ছে?
ভেজানো দরজা ঠেলে আমাদের ঘরটাতে ঢুকলুম। কর্নেল হলঘরের দিকের দরজা খুলে রাঘবকে ডাকলেন। সাড়া এল না। রাজাবাহাদুরের চিৎকার শুনলুম।
গেট আউট! ডাক্তার না ফাক্তার যেই হও, আমার সামনে আসবে না বলে দিচ্ছি। খুন করে ফেলব। আমার কেবলই খুন করতে ইচ্ছে হচ্ছে। আবার কাছে আসছ? গেট আউট।
বুঝলুম, রাজাবাহাদুর ডাঃ ঢোলকে শাসাচ্ছেন। একটু পরে শাসানি থেমে গেল। কর্নেল বললেন, -আশ্চর্য! রাঘব তো হলঘরে শোয়। বিছানাটা খালি দেখছি।
কর্নেল ওপরে উঠতে যাচ্ছেন, বড়ো কুকুরটা সিঁড়ির মাথায় এসে রুখে দাঁড়াল। যেন ঝাঁপ দেবে। কর্নেল পিছিয়ে এলেন। লেজকাটা ঘিয়েভাজা নির্লোম লালচে রঙের ওই কুকুরটা দেখে আমার গা হিম হয়ে গেল। একটু পরে তার সঙ্গী কানোলা কুকুরটাও এসে সিঁড়ির মাথায় হাই তুলে দু-ঠ্যাং সোজা করে বসে পড়ল।
কিন্তু পুলিশকে তো খবর দেওয়া দরকার! কর্নেল বিরক্ত হয়ে ঘরে ফিরে এলেন। আমি পরদা, তুলে উঁকি মেরে ব্যাপারটা দেখছিলুম। তক্ষুনি দরজা আটকে দিলুম। কর্নেলকে বললুম, –ডক্টর ঢোলকে কি কুকুরদুটো কিছু বলে না?
-খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন, জয়ন্ত! ওঁকে তো যখন-তখন রাজাবাহাদুরকে অ্যাটেন্ড করতে হবে। তাই হয়তো জয়গোপালবাবু কুকুরদুটোকে ট্রেনিং দিয়ে রেখেছেন–যাতে ডাক্তার ঢোলকে যেন তারা বাধা না দেয়।
মিনিট পাঁচেক পরে কর্নেল যখন খুব অস্থির হয়ে উঠে পায়চারি করছেন, হলঘরে ডাঃ ঢোলের সাড়া পাওয়া গেল। রাঘবকে ডাকছেন। কর্নেল ঝটপট গিয়ে দরজা খুলে ওঁকে ডেকে আনলেন। ডাঃ ঢোল ঘরে ঢুকে রাগী মুখ করে বললেন, -অদ্ভুত ব্যাপার মশাই! রাজাবাহাদুর আসলে সিজোফ্রেনিয়ায় ভুগছেন। দিনে একরকম, রাতে তার উলটো। ডাক্তার জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড।
-কিন্তু আপনি যে ওপরে গেলেন এবং এলেন, কুকুরদুটো আপনাকে তাড়া করল না?
কর্নেলের এই বেমক্কা প্রশ্নে ডাঃ ঢোল প্রথমে একটু চমক খেলেন। তারপর ফিক করে হাসলেন, –করবে না বুঝি? দেখলেই তো হাঁ করে ব্যাটাছেলেরা কামড়াতে আসে। আমাকে ঠাকুরমশাই পেছনের দিকের সিঁড়ি দিয়ে রাজাবাহাদুরের ঘরে নিয়ে গেল। নেমে এলুম সেদিক দিয়েই। কুকুরদুটো ঠাকুরমশাইকেও তো খাতির করে না। টের পাচ্ছেন না, রাত্তিরে রাজবাড়ির জনপ্রাণীটি ঘরের বাইরে বেরোয় না। একে ভৌতিক উপদ্রব, তার ওপর ওই সাংঘাতিক কুকুর।
-কিন্তু আমার যে একবার ওপরে যাওয়া দরকার। রাজাবাহাদুরের ঘরে ফোন আছে দেখেছি। পুলিশকে ফোন করা দরকার।
ডাঃ ঢেল অবাক হলেন। পুলিশকে? কেন বলুন তো?
–নদীর ধারে অলক্ষ্মীর চত্বরে একটা ডেডবডি পড়ে আছে।
–সর্বনাশ! তাহলে সত্যি-সত্যি সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটে গেল? কে-কে খুন হল কর্নেল? কার ডেডবডি দেখে এলেন?
কর্নেল সে কথার জবাব না দিয়ে বললেন, –জয়গোপালবাবুর ঘরেও ফোন আছে সম্ভবত। আপনারা একটু বসুন। যেন চলে যাবেন না ডাঃ ঢোল! আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
কর্নেল বেরিয়ে গেলে ডাঃ ঢোল বললেন, -কী ব্যাপার বলুন তো জয়ন্তবাবু?
বললুম, –ঘুম আসছিল না। তাই বেড়াতে বেরিয়েছিলুম আমরা। অলক্ষ্মীর মন্দিরে গিয়ে দেখি একটা ডেডবডি পড়ে আছে। নাকে রক্ত।
-বলেন কী! আমার তো মশাই বুক কাঁপছে। আগে এসব জানলে কক্ষনও আসতুম না। উঃ! কী সর্বনেশে ঘটনা মশাই। আগে যদি জানতুম…ওঃ!
-কীসব জানলে?
আমার প্রশ্নে ডাঃ ঢেল অবাক হলেন যেন। বুঝলেন না? দরজায় রাতবিরেতে টোকা, ক্যানাস্তারার শব্দ, ধুপধুপ করে চলাফেরা। তার ওপর ওই বজ্জাত কুকুরদুটো–এবং সিজোফ্রেনিক রুগি।
-রাজাবাহাদুরের ব্যাপারটা কী?
–ওই তো বললুম, ডাক্তার জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইডের কেস। দেবতা এবং শয়তান একই লোকের মধ্যে। স্পিলট পার্সোনালিটির ব্যাপার। এসব পেশেন্ট রাত্তিরে নিজেও টের পায় না কী করছে। সেই যে এক ভদ্রলোক রাত্তিরে নিজের গায়ের কোটটি বাগানে পুঁতে রেখে আসতেন। সকালে চাকরকে বকাবকি করতেন।
ডাঃ ঢোলের কথা শুনে মনে হচ্ছিল, তাহলে কি রাজাবাহাদুরই প্রফেসর তানাচাকে খুন করে পালিয়ে এসেছেন এবং তাঁর হাবভাব দেখে রাজবাড়ির ঠাকুরমশাই ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন? ডাঃ ঢোলের দিকে আনমনে তাকিয়ে রইলাম।
নাকি ডাঃ ঢোলও এই চক্রান্তের সঙ্গে জড়িত? কিছু বোঝা যাচ্ছে না। আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে। গেল, -আচ্ছা ডাক্তার ঢোল, আপনি কি মনে করেন রাজবাড়ির বাইরে গিয়ে রাজাবাহাদুরের পক্ষে কাউকে খুন করা সম্ভব?
ডাঃ ঢোল সোজা হয়ে বসে বললেন, আপনার প্রশ্নে যুক্তি আছে। এসব রুগি দিনে হাঁটাচলা করতে পারে না। কিন্তু রাত এলেই এদের শরীরে কী এক শক্তি ভর করে।
