কর্নেল বললেন, -কে জানে! মানুষের জ্ঞান বড়ো সীমাবদ্ধ জয়গোপালবাবু। বিজ্ঞানের সামনে এখনও কত বিরাট অনাবিষ্কৃত জগৎ পড়ে রয়েছে।
জয়গোপালবাবু হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন, আর বিরক্ত করব না। সাবধানে থাকবেন। যা সব চলছে। –বলে উনি বেরিয়ে গেলেন। …
আজ দোসরা নভেম্বর। আকাশে ভারিক্কি চেহারার চাঁদ ড্যাবডেবে চোখে তাকিয়ে আছে। জ্যোৎস্নার ওপর নীলচে কুয়াশা জমে বাইরের সবকিছু কেমন থমথমে করে তুলেছে। প্রতি সেকেন্ডে আমার উত্তেজনা বেড়ে যাচ্ছিল। কী রোমাঞ্চকর খবর শোনাবে ইস্কাপনের টেক্কা? কে সে? কেন এমন করে সে আমাকে ওই বিদঘুটে জায়গায় ডাকল? তার কোনও কুমতলব নেই তো? ভয় হচ্ছিল এবার। কর্নেল কিন্তু নির্বিকার। রাঘব নটার মধ্যে খাইয়ে দিল। একটু পায়চারি করার ছলে আমরা দুজনে বেরিয়ে পড়লাম। দুরে কোথাও জয়গোপালবাবুর কুকুরের গজরানি শুনলুম। কিন্তু পুবের ফটক পেরিয়ে গেলেও কুকুরদুটো আমাদের এদিকে এল না। নদীর জলে জ্যোৎস্না ঝকমক করছে। ওপারে কী পাখি দুবার ডেকে চুপ করে গেল। তারপর সামনে কোথাও একপাল শেয়াল ডাকতে লাগল। ঝোপঝাড় আর ঘাসে ইতিমধ্যে প্রচুর শিশির জমেছে। আমার মনে ক্রমশ এবার একটা অস্বস্তি জাগতে শুরু করেছে। পকেটে গুলিভরা খুদে রিভলভারটা একবার ছুঁয়ে দেখলুম।
একটা ফাঁকা জায়গা দেখা যাচ্ছিল সামনে। কর্নেল থমকে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বললেন, –বসে পড়ো। এখনও দু-মিনিট বাকি আছে দশটা বাজতে। দুজনে ঝোপের আড়ালে বসে পড়লুম। একটা প্যাচা ক্রাও-ক্রাও করে ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল। ফাঁকা জমিটার ওপর প্রকাণ্ড একটা কালো চৌকামতো উঁচু চত্বর দেখতে পাচ্ছিলুম। তার ওপর ওটাই কি অলক্ষ্মীর মূর্তি?
দমবন্ধ করে বসে আছি। সময় কাটতে চাইছে না। কতক্ষণ পরে হঠাৎ দেখি, এদিক-ওদিক তাকাতে-তাকাতে কে পা টিপে-টিপে এগিয়ে চত্বরটায় উঠল। তারপরই চাপা একটা আর্তনাদ শুনতে পেলুম। সেইসঙ্গে ধস্তাধস্তির শব্দ হল। কর্নেল টর্চ জ্বেলে দৌড়ে গেলেন। আমি ওঁর পেছনে ছিলুম। টর্চের আলোয় প্রথমে চোখ পড়ল কালো রঙের মূর্তিটার দিকে। ও কি জীবন্ত হয়ে উঠেছে এ-মুহূর্তে? হিংস্র ভয়ঙ্কর তার চেহারা। আর তার কোলের ওপর কেউ পড়ে রয়েছে। কর্নেল এক লাফে চত্বরে উঠে তার কাছে গেলেন। তারপর চমক-খাওয়া গলায় বলে উঠলেন, -সর্বনাশ! এ যে দেখছি প্রফেসর তানাচা!
.
০৪.
বড়োজোর আধ-মিনিটের মধ্যে এই সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেল। অথচ আমরা হতভাগ্য প্রফেসর তানাচাকে বাঁচাতে পারলুম না ভেবে কষ্ট হচ্ছিল। কর্নেল শ্বাসপ্রশ্বাস জড়ানো গলায় বললেন, -এ আমি ভাবিনি। কল্পনাও করিনি এমন কিছু ঘটবে।
হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়েছিলুম। আমার হাতেও টর্চ আছে এবং পকেটে আছে গুলিভরা রিভলভার, বেমালুম ভুলে গিয়েছিলুম সে-কথা। এতক্ষণে টর্চ জ্বেলে প্রফেসর তানাচাকে ভালো করে দেখলুম। সিংহাসনে বসে-থাকা হিংস্র চেহারার এক নারীমূর্তির কোলে বুক চিতিয়ে পড়ে আছেন ভদ্রলোক। পরনে সেই কালো কোট, ছাইরঙা ঢোলা পাতলুন। শরীরের নিচেটা ঝুলে রয়েছে। মুখে আতঙ্কের ছাপ। চোখ বন্ধ। নাকের দুই ছিদ্র দিয়ে জ্বলজ্বলে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। তারপর অলক্ষ্মীর ওপর আলো ফেললুম। শিউরে উঠে দেখি, তার দুটো হাতে মানুষের গলা টিপে ধরার ভঙ্গি। তার দুটো পাথুরে চোখে ক্রুর হিংসা চকমক করছে। ঠোঁটে জিঘাংসার বাঁকা নিঃশব্দ হাসি। টর্চের বোতাম থেকে আমার অবশ আঙুল সরে গেল। আলো নিভে গেল।
কর্নেল নিজের টর্চ জ্বেলে চত্বরে সম্ভবত হত্যাকারীর চিহ্ন খুঁজছিলেন। জিগ্যেস করলুম, –কর্নেল, খুনি কি অশরীরী? আমরা তো এদিকেই লক্ষ রেখে বসে ছিলুম। অথচ শুধু প্রফেসর তানাচাকে দেখতে পেয়েছি–তাকে তো দেখতে পাইনি।
গোয়েন্দাপ্রবর কোনও জবাব দিলেন না। প্রফেসর তানাচার কাছে এসে হেঁট হয়ে ওঁর পোশাক হাতড়াতে শুরু করলেন। প্যান্টের পকেটে একটা নোংরা রুমাল, একটা দু-টাকার নোট আর কিছু খুচরো পয়সা পেলেন। সেগুলো ঢুকিয়ে রেখে এবার শার্টের পকেটে হাত ভরলেন। একটা ভাজ-করা খাম বেরিয়ে এল। খামটা নিজের পকেটে চালান করে দিলেন কর্নেল। তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে বললেন, -পুলিশে খবর দেওয়া দরকার এক্ষুনি জয়ন্ত, আমি এখানে থাকছি। তুমি রাজবাড়ি গিয়ে জয়গোপালবাবুকে সব জানাও।
আমি? ভীষণ ভড়কে গিয়ে বললুম, যা ঘটেছে, এরপর একা এই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে রাজবাড়ি যাওয়া তার ওপর ওই দুটো রাক্ষুসে কুকুর! আপনি যাই বলুন কর্নেল, এ আমার পক্ষে অসম্ভব।
কর্নেল বললেন, তাহলে তুমি এখানে থাকো। আমি খবর দিয়ে আসি।
আরও আঁতকে উঠে বললুম, –সেটা আরও অসম্ভব। এই ভয়ঙ্কর জায়গায় মড়া আগলানো! বাপস। তাছাড়া অলক্ষ্মীর মূর্তিটা দেখছেন না কেমন জ্যান্ত হয়ে উঠেছে? আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে, অলক্ষ্মীই এ হত্যাকাণ্ডের নায়িকা।
কর্নেল গুম হয়ে বললেন, –ঠিক আছে। চলো, দুজনেই যাই।
চত্বর থেকে নেমেছি, হঠাৎ কোথায় কেউ বিকট খ্যানখ্যানে গলায় হেসে উঠল। -ওরে, পালিয়ে যা! পালিয়ে যা! অলক্ষ্মী জেগে উঠেছে। মারা পড়বি। পালিয়ে যা! টর্চের আলোয় একটু তফাতে জনাই-পাগলাকে দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলুম। তারপর আশেপাশে মোটা-মোটা ঢিল পড়তে শুরু করল। আমরা পাগলাকে তাড়া করলুম। সে বিকট হাসতে-হাসতে পালিয়ে গেল।
