ঠিক এই সময় নদীর ওদিকে একদল শেয়াল হঠাৎ হুক্কাহুয়া করে জোরে চেঁচাতে শুরু করল। অমনি ডাঃ ঢোল আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। ভয় পাওয়া গলায় বললেন, –কী? কী?
-শেয়াল ডাকছে।
–সত্যিকার শেয়াল তো? কে জানে মশাই, শেয়ালের ডাক কখনও শুনিনি।
নিজেকে ছাড়িয়ে নিলুম ওঁর কবল থেকে। তারপর বললুম, –আপনার শাস্ত্রের কথামতো হ্যাঁলুসিনেশন হতেও পারে। চলুন, এবার ফেরা যাক।
ডাঃ ঢোল হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। তবে যাই বলুন, ভয় পাওয়ারও একটা মজা আছে। তাছাড়া আপনার সঙ্গে যখন রিভলভার আছে, তখন নিশ্চিন্তে ভয় পাওয়া যায়। আমার তো মশাই, দারুণ আনন্দ হল।
রাজবাড়ির দিক থেকে কুকুরের গজরানি শোনা যাচ্ছিল। তা শুনে ডাঃ ঢোল বললেন, –আর-এক বিপদ ওই কুকুরদুটো। সাংঘাতিক কুকুর মশাই! দেখলেই হাঁ করে চিবুতে আসে। ম্যানেজার জয়গোপালবাবুর ওই এক বিদঘুটে স্বভাব। কুকুর যারা পোষে, তারা আমার চক্ষুশূল। উনি কি ভাবছেন, সাংঘাতিক ভূতুড়ে কিছু ঘটলে কুকুর দিয়ে ঠেকাবেন? কুকুর কি ভূতপ্রেতকে ভয় পায় না? নিশ্চয়ই পায়। কী বলেন?
আনমনে বললুম, -পাওয়া তো উচিত।
হঠাৎ মনে পড়ে গিয়েছিল, আজ দোসরা নভেম্বর। এখন মোটে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বাজে। আর আড়াই ঘন্টা পরে পুবের ফটকের ওদিকে নদীর ধারে অলক্ষ্মীরর মন্দিরে একটা কিছু ঘটবে। ইস্কাপনের টেক্কা আমাকে সেখানে রাত দশটায় উপস্থিত থাকতে বলেছে।
বুকের ভেতর রক্ত নেচে উঠল উত্তেজনায়। এবং ভয়েও বটে। এতক্ষণে কেমন আড়ষ্টতা জেগে উঠল শরীরে।
কর্নেলকে দক্ষিণের বারান্দায় দেখতে পাচ্ছিলুম। কাছে গেলে বললেন, আশা করি, ডাক্তার ঢোলের নৈশভ্রমণ রোমাঞ্চকর হয়েছে?
ডাঃ ঢোল বললেন, –দারুণ রোমাঞ্চকর। সেই তো বলছিলুম জয়ন্তবাবুকে। সঙ্গে রিভলভার থাকলে রাতবিরেতে ঘোরার মজা আছে। বিশেষ করে পাচা এবং শেয়ালের ব্যাপারটা রিয়্যালি ওয়ান্ডারফুল!
ঘুঘুমশাই ইতিমধ্যে রাঘবকে বলে একপট কফি আনিয়ে রেখেছেন। শিশির আর নভেম্বরের রাত্রির হিমে একটু আড়ষ্ট বোধ করছিলুম। কফিটা আরাম করে খাওয়া হল। তারপর ডাঃ ঢোল উঠলেন। –অসংখ্য ধন্যবাদ কর্নেল! সময় বড়ো সুন্দর কাটল। আশা করি এভাবেই কাটবে! এবার চলি। একটু পরে আবার রাজাবাহাদুরকে অ্যাটেন্ড করতে হবে।
ডাঃ ঢোল চলে গেলে হলঘরের দিকের দরজা বন্ধ করে দিলুম। তারপর চাপাগলায় বললুম, –আপনি কি এই সুযোগে কিছু তদন্ত সেরে নিতে পেরেছেন?
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, দ্যাটস রাইট, বৎস! ঠিকই ধরেছ।
ডাক্তার ঢোল সম্পর্কে নিশ্চয়ই?
–হুঁ।
–কী বুঝলেন?
–ওঁর নাম ডাক্তার দোলগোবিন্দ ঢোল। কোনও গণ্ডগোল নেই। কলকাতার সুকিয়া স্ট্রিটে বাসা। চেম্বার শ্যামবাজারে। তবে তত নামী সাইকিয়াট্রিস্ট নন।
–আর কিছু?
কর্নেল হাসলেন। –নাঃ ডার্লিং! লোকটির মধ্যে কোনও ভণ্ডামি নেই। একটু ভিতু প্রকৃতির, এই যা। জয়গোপালবাবু ওঁকে মোটা ফি-র লোভ দেখিয়েই এনেছেন। নইলে এমন ভূতুড়ে জায়গায় আসতেন বলে মনে হল না। ওঁর ব্যাগে জয়গোপালবাবুর কয়েকটা চিঠি দেখলুম। তা থেকেই বোঝা গেল ব্যাপারটা।
ঘড়ি দেখে বললুম, –সাতটা পঁয়তাল্লিশ বাজে। আমরা কখন বেরুব?
-নটা পঁয়তাল্লিশ নাগাদ। রাঘবকে বলেছি, আজ নটার মধ্যে রাতের খাওয়া সেরে নিতে চাই। সারাদিন ঘুরে বড্ড ক্লান্ত।
কর্নেল কোনার দিকে ইজিচেয়ারে পা ছড়িয়ে বসলেন। তারপর চোখ বুজে ধ্যানস্থ হলেন। আমি একটা বিলিতি ভ্রমণবৃত্তান্তের বই খুলে বসলুম। কিন্তু কিছুতেই মন বসল না বইয়ে। পাশের হলঘরে ঠাকুরদাঘড়ির বিচ্ছিরি টঙাস-টঙাস শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ভারি বিরক্তিকর।
কিছুক্ষণ পরে হলঘরের দিকের দরজায় টোকার শব্দ হল। তারপর জয়গোপালবাবুর গলা শুনতে পেলুম। দরজা খুলে দিলে জয়গোপালবাবু ভেতরে এলেন। অসময়ে একটু বিরক্ত করতে এলুম, কর্নেল!
কর্নেল বললেন, -না, না। আসুন, আসুন!
জয়গোপালবাবু ঘরের ভেতর চোখ বুলিয়ে বললেন, -কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো আপনাদের?
-মোটেই না। খাসা আছি।
গত বছর যখন আপনি এলেন, তখন কিন্তু রাজবাড়িতে বেশ শান্তি ছিল। জয়গোপালবাবু একটু হেসে বললেন, গত মাস দু-তিন যাবৎ হঠাৎ নানারকম অশান্তি। তবে একটা ব্যাপার স্বীকার করতেই হবে, এত সব কাণ্ড হচ্ছে–কিন্তু দেখুন, কারুর একতিল ক্ষতি হয়নি এ পর্যন্ত। ভগবানের ইচ্ছেয় ক্ষতিটতি না হলেই বাঁচি।
-কেন? কী ক্ষতির আশংকা করছেন বলুন তো?
জয়গোপালবাবু উদ্বিগ্নমুখে বললেন, –নির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন কর্নেল! কিন্তু রাতের বেলায় যে সব অদ্ভুত শব্দ শোনা যাচ্ছে–কিংবা ধরুন, দরজায় টোকা দিচ্ছে, অথচ দরজা খুলে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। এইতে আমার বড্ড ভয় হচ্ছে। কোনও সাংঘাতিক ঘটনারই যেন আগাম সংকেত। বাই দা বাই, কর্নেল কি অশরীরী আত্মায় বিশ্বাস করেন?
কর্নেল একটু হাসলেন। বিশ্বাস করার সুযোগ পাইনি জয়গোপালবাবু।
–আমিও পাইনি। কিন্তু এ রাজবাড়ির ইতিহাস তো খুব নির্মল নয়। বহু খুনোখুনি, অত্যাচার–এসব ঘটেছে অতীতকালে। বর্তমান রাজাবাহাদুরের এক পূর্বপুরুষ ছিলেন প্রচণ্ড প্রতিহিংসাপরায়ণ মানুষ। এখনও লোকের বিশ্বাস, তার অশরীরী আত্মা রাজবাড়িতে ঘুরে বেড়ায় তিনি সতেরো শতকে রাজত্ব করতেন। তাঁর নাম ছিল শিবেন্দ্রনারায়ণ। অলক্ষ্মীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা তারই আরেক অপকীর্তি। লোকে বলে, অলক্ষ্মীর পায়ে নরবলি দেওয়ার সাধ ছিল তার। কিন্তু যে-কোনও কারণে হোক, সে সাধ মেটেনি। তাই তার আত্মা এখনও নরবলি দেওয়ার জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছে।
