ডাঃ ঢোল সোজা হয়ে বসলেন। মুখে প্রশংসার ছাপ। কর্নেল! তার মানে আপনি মিলিটারির লোক?
ছিলুম। এখন অবসরপ্রাপ্ত।
তা হোক! আমার মনের জোর বেড়ে গেল শুনে। –ডাঃ ঢোল খুশি হয়ে বললেন, যদি কোনও গণ্ডগোল বাধে, আপনি যখন আছেন–তখন আমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
তারপর আমার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে বললেন, –আর এই ইয়ংম্যান তো একজন সাংবাদিক। খুব আনন্দের কথা। হাতে কাগজ থাকলে মশাই পৃথিবী জয় করা যায়। আমরা গণ্ডগোলে পড়লে আপনি ফলাও করে কাগজে ছেপে দেবেন। অমনি গভমেন্টের টনক নড়বে। পুলিশের রথী-মহারথীরা এসে হাজির হবেন লোহাগড়া রাজবাড়িতে।
কর্নেল টাকে হাত বুলিয়ে বললেন, -কী ঘটতে পারে বলে আপনার মনে হচ্ছে বলুন তো?
ডাঃ ঢোল চাপাগলায় বললেন, -এনিথিং! স্বকিছু ঘটতে পারে। আমার একটুও ভালো ঠেকছে না এবাড়ির হালচাল।
-যেমন?
কর্নেলের প্রশ্ন শুনে ডাঃ ঢোল গম্ভীরমুখে বললেন, ম্যানেজারবাবু বলছিলেন, রাজাবাহাদুর যে বংশের মানুষ, সেই বংশের প্রত্যেকে নাকি ডাকসাইটে খুনি। খুনের প্রবৃত্তি এঁদের রক্তে আছে। রাজাবাহাদুর নাকি হঠাৎ-হঠাৎ খেপে গিয়ে ছুরিছোরা নিয়ে যাকে সামনে পান, তাড়া করেন। কাজেই যে-কোনও সময়ে কেউ খুন হয়ে যেতে পারে। তারপর ধরুন…
–হুঁ বলুন ডাক্তার ঢোল।
–যে ঠাকুরমশাই রাজবাড়ির রান্নাবান্না করেন, তিনি বলছিলেন, রাত-বিরেতে রাজবাড়ির ভেতর নাকি আগের আমলের কোন রাজাবাহাদুর ঘুরে বেড়ান। ধুপ-ধুপ শব্দ নাকি ঠাকুরমশাই রোজ রাতে শুনতে পান।
আমরাও শুনেছি। আমার দিকে তাকিয়ে কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন।
ডাঃ ঢোল একটু ভয় পেলেন বুঝি। –সর্বনাশ! বলেন কী?
–আর কী শুনেছেন ডাক্তার ঢোল?
রাজবাড়ির কোনও পূর্বপুরুষ নাকি কোথায় গুপ্তধন পুঁতে রেখেছেন। রাতবিরেতে তা খুঁজে বেড়ায় কারা।
কার কাছে শুনলেন?
–রাঘব বলছিল।
ততক্ষণে বাইরে জ্যোৎস্না ফুটেছে। কর্নেল উঠে গিয়ে দক্ষিণের দরজায় দাঁড়ালেন। বললেন, –বাঃ! চমৎকার জ্যোৎস্না!
ডাঃ ঢোল তার কাছে গিয়ে জ্যোৎস্না দেখতে-দেখতে তারিফ করলেন। –অপূর্ব! কিন্তু কী ট্রাজেডি দেখুন তো কর্নেল! প্রকৃতির এমন সুন্দর জিনিসটা উপভোগ করার ইচ্ছে সত্ত্বেও আমরা বঞ্চিত হচ্ছি।
-কেন?
ভয়ে-ভয়ে একটু হেসে ডাঃ ঢোল বললেন, –এমন রাত্তিরে ঘুরে বেড়াতে বুঝি ইচ্ছে করে?
কর্নেল বললেন, –ইচ্ছে করে তো ঘুরুন। জয়ন্ত, তুমি ডাক্তার ঢোলকে নিয়ে কিছুক্ষণ জ্যোৎস্নায় ঘুরে এসো না! আপনি আমার এই তরুণ বন্ধুর সঙ্গে স্বচ্ছন্দে গিয়ে জ্যোৎস্না উপভোগ করতে পারেন ডাক্তার ঢোল। ভাববেন না, জয়ন্ত ডানপিটে যুবক। তাছাড়া ওর কাছে রিভলভারও আছে।
সত্যি নাকি? –ডাঃ ঢোল অবিশ্বাসের চোখে আমার দিকে তাকালেন।
অগত্যা ওঁকে রিভলভারটা দেখাতেই হল। আসলে ঘরে চুপচাপ বসে থেকে বাইরে অমন সুন্দর শরৎকালের জ্যোৎস্নায় আমারও ঘুরতে ইচ্ছে করছিল।
ডাঃ ঢোলকে নিয়ে বেরোলুম। এদিকটায় চওড়া ঘাসের লন এবং বাগান। মনে হল, কর্নেল আসলে ডাঃ ঢোলকে বাইরে পাঠিয়ে কোনও গোপন তদন্ত অথবা সেইরকম কিছু সেরে ফেলতে চান।
ঘাসে এখনই শিশির জমতে শুরু করেছে। টের পাচ্ছিলুম, মুখে ডাঃ ঢোল জ্যোৎস্না রাতের প্রশংসা করলেও মনে ভয় রয়েছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে সাবধানে পা ফেলছিলেন। কিছুটা এগিয়ে একবার ঘুরে রাজবাড়িটার দিকে তাকালুম। সত্যি-সত্যি প্রেতপুরী বলে মনে হল। সাদা জ্যোৎস্নায় ধূসর রঙের বাড়িটার গা থেকে যেন অলৌকিক জ্যোতি ঠিকরে বেরুচ্ছে।
আমাকে ঘুরতে দেখে ডাঃ ঢোল খপ করে আমার কাধ চেপে ধরে বললেন, -কী? কী?
-কিছু না। আসুন।
-বেশিক্ষণ কিন্তু ঘুরব না জয়ন্তবাবু। পেশেন্টকে আবার একবার অ্যাটেন্ড করতে হবে। নইলে ম্যানেজারবাবু চটে যাবেন।
এদিকে-ওদিকে একটা করে গাছ অথবা ঝোপঝাড় কালো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের গায়ে ধূসর কুয়াশার চাদর জড়ানো। আরও একটু এগিয়ে টানা পাঁচিলের কাছে পৌঁছলুম। ঠিক সেই সময় কাল রাতের সেই প্যাচাটা বিচ্ছিরি ক্রা-ক্রা চিৎকার করে মাথার ওপর আসতেই ডাঃ ঢোল আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। -কী? কী?
–ভয়ের কিছু নেই ডাক্তার ঢোল! নিছক প্যাঁচা।
কে জানে মশাই! প্যাঁচার ডাক কখনও শুনিনি।
এবার ডাঃ ঢোল আমার একটা হাত শক্ত করে ধরে রেখেছেন। পাঁচিলের সমান্তরালে একটুখানি এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল, পুবের ফটকের কাছে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। ডাঃ ঢোল ভয় পাবেন ভেবে ওঁকে কিছু বললাম না। ছায়ামূর্তিটা তেমনি কালো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জনাই-পাগলা না কি!
কিন্তু তারপর আশ্চর্য ব্যাপার ঘটল। ছায়ামূর্তিটা হঠাৎ বেমালুম অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি থমকে দাঁড়ালুম। ডাঃ ঢোল একই সুরে গলার ভেতর বলে উঠলেন–কী? কী?
কিছু না। পকেট থেকে টর্চ বের করে জ্বেলে সেই জায়গাটা তন্নতন্ন খুঁজলুম। তারপর মনে হল, জ্যোৎস্না রাতে এমন ভুল হওয়া স্বাভাবিক।
ডাঃ ঢোল বললেন, কিছু খুঁজছেন মনে হচ্ছে জয়ন্তবাবু? জিনিসটা কী?
হাসতে-হাসতে বললুম, -রাতবিরেতে চোখে মানুষ অনেক ভুল দেখে। তবে না, তেমন কিছু আমি দেখিনি।
ডাঃ ঢোল থেমে দাঁড়িয়ে বললেন, রাতবিরেতে কেন? মানসিক রুগিরা দিনদুপুরেও কতরকম ভুলভাল জিনিস দেখতে পায়। তাকে আমাদের শাস্ত্রে বলে হ্যাঁলুসিনেশন। ধরুন, রুগি হঠাৎ ঘর থেকে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, জানলার নিচে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে! এমনকী, তার পোশাকের বিবরণও দিল। কিন্তু সবটাই তার চোখের ভুল। আপনাকে একটা বই দেব। পড়ে দেখবেন। ডক্টর মার্লো পন্টির লেখা দি ফিলসফি অফ পার্সেপশান। তাতে…
