–বলেন কী! পলটারজিস্ট তো খুব রহস্যময় ব্যাপার। বিজ্ঞানীরাও এ-রহস্য ফাঁস করতে পারেননি।
কর্নেল আমার পাশ ঘেঁষে বসেছিলেন। কেন যেন আঙুলে খুঁচিয়ে দিলেন আমাকে। রাজাবাহাদুর খিকখিক করে হাসছিলেন। বললেন, -কী? ভূতের কীর্তি স্বচক্ষে দেখার ইচ্ছে হচ্ছে তো?
হঠাৎ আমার মাথায় এল, একজন অপ্রকৃতিস্থ মানুষের সামনে বসে আছি। রাজাবাহাদুরের এসব কথাবার্তা, ভঙ্গি, হাসি-কোনওটাই যেন সুস্থ মানুষের নয়। আমার হাবভাব লক্ষ করেই বুঝি কর্নেল একটু কেশে বললেন, -রাজাবাহাদুর! আপনার মাথার যন্ত্রণাটা কমেছে তো? ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছে না তো?
রাজাবাহাদুরের মুখের হাসি নিভে গেল। বাঁকা মুখে বললেন, -ভবেশ ডাক্তারের ওষুধে অসুখ সারবে না কর্নেল। গত বছর শীতের সময় আপনি এলেন, তখন থেকে এইরকম হচ্ছে আর ভবেশের ওষুধ গিলে যাচ্ছি। শেষে জয়গোপালকে বললুম, কলকাতা নিয়ে চলো। ও বলল, কষ্ট করে অত দূর যাবেন কেন? আমি ভালো ডাক্তার আনিয়ে দিচ্ছি। তো তাও এক সপ্তাহ হয়ে গেল। জয়গোপাল বলছে, এসে যাবেনখন। বুঝুন অবস্থা!
জয়গোপালবাবু দরজার পরদা তুলে ঘরে ঢুকে বললেন, –আজই এসে পড়বেন রাজাবাহাদুর! তিনটেয় স্টেশনে গাড়ি পাঠাব। উনি ট্রাংককল করে জানিয়েছেন কলকাতা থেকে।
কর্নেল বললেন, -কোন ডাক্তার বলুন তো!
জয়গোপালবাবু কর্নেলকে চোখ টিপে কিছু ইশারা করে বললেন, -নাম শুনেছেন কি না জানি না। ডাক্তার ডি. জি. ঢোল। খুব বড়ো ডাক্তার ব্রেন স্পেশালিস্ট।
কর্নেল কেন যেন গম্ভীর হয়ে গেলেন। রাজাবাহাদুর আনমনে জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, –ব্রেনের ভেতর যেন একটা ছেদা হয়েছে। আর সেখানে ঢুকে গেছে একটা চড়ুইপাখি। সারাক্ষণ খালি কিচিরমিচির শব্দ। নাঃ, আমি আর বাঁচব না।
কর্নেল হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। –আপনি বিশ্রাম করুন রাজাবাহাদুর। এবার আমরা যাই।
রাজাবাহাদুর সঙ্গে সঙ্গে ফিক করে মিষ্টি হাসলেন। চোখ নাচিয়ে বললেন, -কিন্তু যে জন্য আপনাকে হন্তদন্ত হয়ে আনালুম, তার কত দুর কী হল? হতচ্ছাড়া ভূতটার একটা ব্যবস্থা করে ফেলুন শিগগির! বড্ড বাড় বেড়েছে যে!
দেখুন না, কী করি। -বলে কর্নেল নমস্কার করে বেরুলেন। আমিও ওঁকে অনুসরণ করলুম। রাজাবাহাদুর আমাকে দৈনিক সত্যসেবকে লেখার কথাটা স্মরণ করিয়ে দিলেন।
নিচের ঘরে ফিরে কর্নেল বললেন, -কী মনে হল রাজাবাহাদুরকে দেখে?
–মাথায় গণ্ডগোল আছে। কিন্তু আপনি তো আমাকে এ-কথা বলেননি!
–বলিনি। তুমি ওঁর মুখোমুখি হয়ে কী ধারণা করবে, সেটা জানার দরকার ছিল।
–ডাক্তার ঢোল কে? নাম তো শুনিনি!
–আমিও শুনিনি। তবে জয়গোপালবাবু কাল আমাকে গোপনে বলেছেন, ডাক্তার ডি. জি. ঢোল নামে একজন সাইকিয়াট্রিস্টকে আনানো হচ্ছে কলকাতা থেকে। দেখা যাক কী হয় শেষপর্যন্ত। …
দুপুরে খাওয়ার পর ভাতঘুমের অভ্যাস আছে আমার। তাছাড়া রাতে ভালো ঘুম হয়নি। উঠে দেখি সূর্য ডুবতে চলেছে। কর্নেল কোথায় প্রজাপতির পেছনে দৌড়তে গিয়েছিলেন। ফিরলেন সন্ধ্যা গড়িয়ে। কয়েক জাতের প্রজাপতির স্বভাবচরিত্র বর্ণনা করলেন। রাঘব আরেক দফা চা আনল। এর কাছে শুনলুম, কলকাতার ডাক্তার এসে গেছেন। হলঘরের উলটোদিকের একটা ঘরে উনি উঠেছেন। তবে রাজাবাহাদুর নাকি ডাক্তারকে দেখেই চটে গেছেন। পাত্তা দিচ্ছেন না। কিছুক্ষণ পরে অবশ্য ডাঃ ঢোল নিজেই আলাপ করতে এলেন। ভারি অমায়িক মানুষ।
বললেন, –এ কোথায় এলুম বলুন তো মশাই? এ যে একেবারে সৃষ্টিছাড়া জায়গা।
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, -কেন বলুন তো!
ডাঃ ঢোল বেঁটে গোলগাল চেহারার মানুষ। পাকা ফলের মতো টুকটুকে গায়ের রং। মাথায় কদমকেশর ছাঁটের চুল। একটুকরো ছাগলদাড়ি রেখেছেন। চিবুক থেকে দাড়িটা বর্শার ফলার মতো উঁচিয়ে রয়েছে। সেই দাড়ির ফলা হাতের মুঠোয় ধরে গলা চেপে বললেন, আমার মনে হচ্ছে। এই রাজবাড়িতে যাদের দেখছি, তারা কেউ মানুষ নয়। চেহারাগুলো দেখেছেন? যেন একেকটা মড়া। চাউনি দেখলে গা ছমছম করে। তার ওপর রাজবাড়ির অবস্থাটা লক্ষ করুন। টাউন থেকে মাইল দেড়-দুই দূরে নির্জন নিঃঝুম জায়গায় এ যেন এক প্রেতপুরী।
কর্নেল সায় দিয়ে বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন ডাক্তার ঢোল।
একথায় উৎসাহ পেয়ে ডাঃ ঢোল বললেন, –ওই বুড়ো রাজাবাহাদুরকে মানুষ বলে মনে হয় আপনার? যেন কবর থেকে খোলা মমি। অথচ মেজাজ আছে বুড়োর। আমি তো মশাই এসেই দেখছি গোখুরি করে বসেছি! রকম-সকম ভালো ঠেকছে না।
আমি বললুম, -রাজাবাহাদুরের অসুখটা কী?
ডাঃ ঢোল বিরক্তমুখে বললেন, -কাছে এগোতে দিলে তো বুঝব? পৃথিবীতে অনেকরকম পাগল আছে। এ জীবনে বিস্তর বাঘা-বাঘা পাগলের চিকিৎসাও করেছি। কিন্তু রাজাবাহাদুর এক সেয়ানা পাগল।
বলে ডাঃ ঢোল কর্নেলের দিকে ঘুরে ফিসফিস করে বললেন, –শুনলুম, রাজবাড়িতে কীসব ভূতুড়ে ঘটনাও নাকি ঘটে। সেজন্যে কলকাতা থেকে প্রাইভেট গোয়েন্দা এসেছেন। মশাই কি তিনিই?
কর্নেল হো-হো করে হেসে বললেন, কার কাছে শুনলেন ডাক্তার ঢোল?
রাঘব নামে লোকটা বলছিল। –ডাঃ ঢোল একটু হাসলেন, আমি তাহলে একটুখানি নিশ্চিন্ত হতে পারি, কী বলেন মিস্টার…ইয়ে… সরি। আপনার নামটা বারবার ভুলে যাচ্ছি।
–আমাকে কর্নেল বলেই ডাকবেন ডাক্তার ঢোল।
