জয়গোপালবাবু এগিয়ে আসছিলেন আমাদের দিকে। দিনের আলোয় ভালো করে দেখার সুযোগ হল ওঁকে। ভদ্রলোকের পেল্লায় চেহারা। পরনে আঁটো প্যান্ট, স্পোর্টিং গেঞ্জি। চোখে নিকেলের ফ্রেমের চশমা। কাছাকাছি এলে কোত্থেকে আর-একটা উঁচু লম্বাটে ছিপছিপে গড়নের কুকুর গরগর করে তেড়ে এল আমাদের দিকে। উনি শিস দিলে সে পেছনের দু-পা মুড়ে বসে প্রকাণ্ড জিভ বার করে আমাদের দেখতে থাকল। এ কুকুরটা যেন ঘিয়ে-ভাজা। একটুও লোম নেই। লেজটা কাটা। আগের কুকুরটাও যেন ভয়ে তার কাছে ঘেঁষছিল না। কর্নেল জ্ঞান দিলেন আমাকে। –এ হল গিয়ে ডোবারম্যান পিঞ্চার। জায়মান ডগ। খুব হামলাবাজ। এর সম্পর্কে তুমি একটু সাবধান থেকো জয়ন্ত!
জয়গোপালবাবু বললেন, -গুড মর্নিং কর্নেল। মর্নিং জয়ন্তবাবু।
কর্নেল বললেন, -মর্নিং! আপনার কুকুরদুটো দেখে খুব আনন্দ হল জয়গোপালবাবু!
আমার আনন্দ হয় না কর্নেল। কারণ এ ব্যাটারা নিষ্কর্মার ধাড়ি। জয়গোপালবাবু বললেন, রাতে এরা ছাড়া থাকে। তবু ওইসব কাণ্ড হয় স্বকর্ণেই তো শুনেছেন। বরং অ্যালসেশিয়ানটাই কাজের ছিল। অন্তত ছোটাছুটি করে বেড়াত অশরীরীর পেছনে। বেচারার বরাত! সাপের কামড়ে মারা পড়ল।
সে কী! রাজবাড়ি এরিয়ার বিষাক্ত সাপ আছে নাকি? প্রশ্নটা আমিই করলুম।
জয়গোপালবাবু বললেন, –আছে। সাপ নেই কোথায় বলুন?
কর্নেল বললেন, –ওখানে এক সাধুবাবা থাকেন দেখলুম।
সাধু?–জয়গোপালবাবু ভুরু কুঁচকে বিরক্তভাবে বললেন, ও তো জনাই-পাগলা। একসময় রাজবাড়িতেই কাজকম্ম করত-টরত। রাঘবকে দেখেছেন তো? ওর মাসতুতো দাদা। বললে বিশ্বাস করবেন না, জনাই কঁচা মাংস খায় রাক্ষসের মতো। অ্যালসেশিয়ানটাকে ওখানে পুঁতে দিয়েছিলুম। ওই যে ফলকটা দেখছেন, ওখানে। কবর থেকে তাকে তুলে রাত্রিবেলা করেছে কী, জনাই কামড়ে-কামড়ে খাচ্ছে। টর্চের আলো পড়তেই ব্যাটা দৌড়ে পালিয়ে গেল।
কথা বলতে-বলতে আমরা রাজবাড়ির দিকে এগিয়ে গেলুম। দক্ষিণের বারান্দায় পৌঁছে কর্নেল হঠাৎ বললেন, –আচ্ছা জয়গোপালবাবু, তারানাথ চাটুজ্জে নামে কাউকে চেনেন?
জয়গোপালবাবুর মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। –হুঁ–লোহাগড়া এস্টেটের নায়েব ছিলেন ব্রজনাথবাবু। আমি তাকে দেখিনি। তারই নাতি। রাজবাড়ি এরিয়ার ভেতর একসময় ওঁদের ফ্যামিলি থাকত। তারাদার বাবা হরনাথ রাজবাড়ির সরকারমশাই ছিলেন। তারাদা চিরকাল বাউণ্ডলে মানুষ। ম্যাজিশিয়ান হওয়ার বাতিক চড়েছিল মাথায়। তা আপনি ওঁকে চেনেন নাকি?
-কলকাতায় একবার আলাপ হয়েছিল। ম্যাজিকের শোয়ে।
ম্যাজিক কি সত্যি দেখাতে পারত তারাদা? আমার বিশ্বাস হয় না। জয়গোপালবাবু একটু হাসলেন, তবে হ্যাঁ–তাসের দু-একটা ম্যাজিক জানত বটে। দশজোড়া তাস নিয়ে থটরিডিংয়ের একটা খেলা দেখেছিলুম। সেটা অবশ্য বেশ অবাক হওয়ার মতো খেলা। ধরুন, প্যাকেট থেকে দশজোড়া বেছে নিতে বলল। তারাদা কিন্তু সেগুলো দেখছে না। বলল, একজোড়া করে তাস মনে রাখ। ধরুন, আমি মনে রাখলুম ইস্কাপনের সাহেব আর হরতনের তিরি। আপনি মনে রাখলেন চিড়িতনের বিবি আর রুইতনের গোলাম। জয়ন্তবাবু যে-জোড়াটা মনে রাখলেন, সেটা হল হরতনের গোলাম আর ইস্কাপনের তিরি। কেমন তো? এবার তাসগুলো চারটে সারিতে সাজিয়ে রাখা হল চিত করে। তারা বলল, তোমাদের প্রত্যেকের মনে রাখা তাস-জোড়া এক সারিতে থাকতে পারে, আবার দুই সারিতেও থাকতে পারে। শুধু আমায় বলল, কোন সারিতে আছে। আশ্চর্য, প্রত্যেক সারিতে পাঁচটা করে তাস। অথচ তারাদা ঠিক জোড়াটা বের করে দিত।
কর্নেল বললেন, -বাঃ! তো তারানাথবাবু এখন কোথায় থাকেন?
-কলকাতায় থাকে শুনেছি। কখনও-সখনও আসে এখানে। এলে কখনও আমার কোয়ার্টারে, কখনও রাঘবের ঘরে থাকে। কিছু ঠিক নেই। রাজাবাহাদুর তো তারাদাকে দেখলেই তাড়া করবেন। একবার রাজবাড়ি থেকে চুরিচামারি করে পালিয়েছিল। সেই থেকে এ বাড়ি ঢোকা বারণ। কিন্তু কী করি বলুন? এসে পড়লে দেখে মায়া হয়। আশ্রয় দিই। কিন্তু বুঝতেই পারছেন, রাজাবাহাদুর জানতে পারলে কেলেংকারি হবে।
নদীর ধারে ওঁকে এক পলক দেখছিলুম যেন। চোখের ভুল হতেও পারে। –যে আনমনে কর্নেল কথাটা বললেন।
কিন্তু কর্নেলের কথা শুনে জয়গোপালবাবু একটু অবাক হলেন। সে কী! এলে তো জানতে পারতুম। যাকগে, আপনাদের ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করি। তাছাড়া সাড়ে-নটায় রাজাবাহাদুর আপনার সঙ্গে দেখা করবেন বলেছেন। নটা বাজে প্রায়।
জয়গোপালবাবু বেরিয়ে গেলেন। জানালা দিয়ে দেখলুম, কুকুরদুটো ওঁর দুপাশে হেঁটে যাচ্ছে বডিগার্ডের মতো। …
.
০৩.
ব্রেকফাস্টের পর আমরা ওপরতলায় রাজাবাহাদুর অজিতেন্দ্রনারায়ণের সঙ্গে দেখা করতে গেলুম। বেঁটে গোলগাল ওজনদার মানুষ। মুখে অমায়িক হাসি। আমার পরিচয় পেয়ে চোখ নাচিয়ে বললেন, -দৈনিক সত্যসেবক নিয়মিত পড়ি মশাই। আপনার লেখা রাতের ট্যাক্সিতে ভূতুড়ে যাত্রী পড়ে দারুণ লেগেছিল। এবার এ-বাড়ির ভূত-রহস্য নিয়ে কিছু লিখুন।
বললুম, -লেখার মতো ব্যাপার বটে!
-বটে কী বলছেন? উত্তর-পূর্ব কোনার ঘরটাতে সন্ধ্যার পর গিয়ে ঢুকুন না। আপনার চোখের সামনে চেয়ারগুলো টেবিলের একদিক থেকে অন্যদিকে গিয়ে বসবে। বিলেতে এই ভূতুড়ে কাণ্ডকেই বলে পলটারজিস্ট।
