আমাকে প্রচণ্ড অবাক করে প্রফেসর তানাচা ঝটপট উঠে সামনের উঁচু ঝোপটার ভেতর ঢুকে পড়লেন। এক পলকের জন্য তার হাতে যেন একটা ছুরি দেখলুম। রোদে সেটা চকচক না করলে চোখে পড়ত না। আমি হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে জোরে ডাকতে লাগলুম, -প্রফেসর তানাচা! প্রফেসর তানাচা! শুনুন, শুনুন!
কোনও সাড়া এল না। ভদ্রলোক বেমালুম গা-ঢাকা দিয়েছেন। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, বাঁ-দিকে নদীর ঢাল থেকে একটা ধূসর রঙের টুপি ঠেলে উঠল। তারপর বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ আবির্ভূত হলেন। এই যে জয়ন্ত! খুব সকাল-সকাল ঘুম ভেঙেছে দেখছি। ভেবেছিলুম, তুমি নটার আগে আজ উঠবে না।
উত্তেজিতভাবে বললুম, -কর্নেল, এইমাত্র প্রফেসর তানাচাকে দেখলুম!
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, –হুঁ–পাপাভেরাসিয়া ফ্যামিলি। পপি জেনাসের অন্তর্ভুক্ত।
-কী সব বলছেন! স্পষ্ট দেখলুম প্রফেসর তানাচা একটা ছুরি নিয়ে ওখানে…
বুঝেছি। হোয়াইট পপি। কর্নেল সাদা দাড়ি থেকে একটা পোকা ঝেড়ে ফেললেন। ডার্লিং, তুমি ঘটি না বাঙাল?
রাগ করে বললুম, খাঁটি ঘটি। কিন্তু কী প্রলাপ বকছেন বলুন তো?
তুমি ঘটি। অতএব পোস্ত খেতে ভালোবাস। কিন্তু তুমি কি জানো, পোস্ত হোয়াইট পপিরই ফল?–বলে কর্নেল আমার হাত ধরে পাঁচিলের ধারে নিয়ে গেলেন। ওই দ্যাখো, প্রফেসর তানাচার ছুরি কার গলা ফাঁক করছিল।
ঠাহর করে দেখি, ছ-সাত ইঞ্চি খুদে একরকম উদ্ভিদের ঝুঁকে জায়গাটা ভর্তি। গাছগুলোর ডগার দিকে চেরা দাগ। বললুম, –ব্যাপারটা মাথায় ঢুকছে না। এ কি প্রফেসর তানাচার ম্যাজিকের কাজে লাগবে নাকি?
কর্নেল হো-হো করে হাসলেন। –এগুলো আফিংগাছ, জয়ন্ত! ওই চেরা জায়গায় যে আঠা জমে উঠবে, তাই নির্ভেজাল আফিং। বেচারা প্রফেসর তানাচার আফিং কেনার পয়সা দিচ্ছিল কোনও উদারচেতা ভূত। বন্ধ করে দেওয়ায় উনি প্রকৃতির দরজায় এসে হাত পেতেছেন। তবে তোমার সঙ্গে তফাতটা হল, তুমি যে গাছের ফল খাও, উনি সেই গাছেরই আঠা খান।
কলকাতা আর লোহাগড়ার দূরত্ব তিনশো কিলোমিটারেরও বেশি। উনি কীভাবে জানলেন এখানকার জঙ্গলে আফিংগাছ আছে?
যেভাবেই হোক, জেনেছেন। আমি কেমন করে জানতে পারি, কোথায় কোন জঙ্গলে দুর্লভ প্রজাতির পাখি আছে?
–যাই বলুন, ওঁর আচরণ খুবই রহস্যময়। ঠাকুরদার কবচ চুরি গেছে বলে ব্যাগ ফেলে উধাও হলেন। তারপর এতদিন বাদে এখানে ওঁকে আফিংয়ের ধান্দায় দেখতে পেলুম। তার চেয়ে অবাক কাণ্ড, আমাকে দেখেই পালিয়ে গেলেন কেন?
–হয়তো ভদ্রলোক বড়ো লজ্জা পেয়েছেন। পাওয়ারই কথা। তাই দূর থেকে দেখেও আমি ওঁর ধারে কাছে যাইনি।
কর্নেল আমার হাত ধরে টেনে পা বাড়ালেন। বললুম, –অলক্ষ্মীর মন্দিরটা কোথায় বলুন তো?
–পেছনে জঙ্গলের ভেতর। অলক্ষ্মীকে দেখলে কিন্তু তোমার শরীর হিম হয়ে যাবে। মূর্তিমতী বিভীষিকা।
-ভয় দেখাবেন না। আমি কচি খোকা নই। আমি দেখতে চাই মূর্তিটা।
–উঁহু। ইস্কাপনের টেক্কার নির্দেশ পালন করো জয়ন্ত। আজ ঠিক রাত দশটায় সে তোমাকে ওখানে যেতে বলেছে। তার আগে নয়। এটা একরকম ভদ্রলোকের চুক্তি, ডার্লিং। মেনে চলা উচিত।
নদী ডাইনে রেখে আমরা পাড় ধরে উত্তরে এগিয়ে চললুম। আমাদের বাঁ-দিকে রাজবাড়ি এরিয়ার টানা উঁচু পাঁচিল। সেই ভাঙা ফটকের পর একটা ভাঙাচোরা ঘর দেখা গেল। কর্নেল বললেন, –এটা একসময়ে রাজাবাহাদুরের বোট-হাউস ছিল। ওই দ্যাখো নৌকো রয়েছে। নৌকোটা নিশ্চয়ই জলে ভাসবার মতো হয়ে নেই। …তারপর থমকে দাঁড়ালেন। একদিকে কাত-হয়ে-পড়া কাঠের ঘরটা থেকে কে একজন বেরুচ্ছিল। সাধুবাবা নাকি? কিন্তু কী বিকট রাক্ষুসে চেহারা সাধুবাবার!
সাধুবাবা না কোনও পাগল? আমাদের দেখেই তেড়ে এল। –কে রে? পালা! শিগগির পালা বলছি। অলক্ষ্মী জেগে উঠেছে। কড়মড় করে মুন্ডু চিবিয়ে খাবে। পালিয়ে যা, পালিয়ে যা!
সে একটুকরো পাথর কুড়িয়ে নিতেই কর্নেল বললেন, -গতিক সুবিধের নয়, জয়ন্ত। কেটে পড়াই ভালো মনে হচ্ছে উনি এক অঘঘারপন্থী সাধু। এঁদের খাদ্য হল মানুষের মড়া।
পাথরটা আমাদের কাছাকাছি এসে পড়ল। আমরা ঘুরে পিঠটান দেওয়ার মতো হাঁটতে থাকলুম। সেই ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকে কর্নেল খিকখিক করে বাচ্চাদের মতো হাসলেন, –দেখলে তো ডার্লিং, কী সাংঘাতিক জায়গা এই লোহাগড়া? খুব সাবধান! আমার বুড়ো, দরকচা, শক্ত মাংসের চেয়ে তোমার মাংস আশা করি ঢের নরম এবং সুস্বাদু। অঘঘারপন্থীদের নোলা দিয়ে জল ঝরবে তোমায় দেখে। অবশ্য তুমি প্রফেসর তানাচার পিশাচ-জাগানো মন্ত্র জানো। আওড়ে দেখতে পারও।
কর্নেল সুর ধরে আওড়ালেন :
কবে যাবি রে সেই সমাজে
ছাড় কুইচ্ছে পোড়া পাম রে। ..
একটু দূরে জয়গোপালবাবুকে দেখা যাচ্ছিল। একটা কুকুর ওঁর সামনে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছিল। কুকুরটা আমাদের দিকে দৌড়ে এল। প্রথমে কর্নেলের, তারপর আমার প্যান্ট খুঁকে মনিবের কাছে ফিরে গেল। কর্নেল বললেন, –জয়গোপালবাবু দেখছি ট্র্যাকিং ডগ পোষেন। এটা কী জাতের কুকুর জানো? লাব্রাডর রিট্রিভার। এদের দেখতে কিন্তু দিশি কুকুরের মতো। কানদুটোই যা ঝোলা। এদের অরিজিন নিউফাউন্ডল্যান্ডে। তবে নাগাল্যান্ডেও এ-জাতের কুকুর আছে। শিকারি পাখিকে গুলি করলে বারুদের গন্ধ শুঁকতে-শুঁকতে ঠিক জায়গায় গিয়ে পাখি কুড়িয়ে আনে। কিন্তু তোমার অমন আঁতকে ওঠার কারণ ছিল না। এরা বড় মানুষঘেঁষা কুকুর। লালবাজারে গোয়েন্দা দফতরের ডগস্কোয়াডে লাব্রাডর রিট্রিভার দেখেছি। খুনিকে ধরতে সাহায্য করে।
