শব্দটা শুনে আমি চমকে উঠেছিলুম, তা ঠিক। কিন্তু এই ধুরন্ধর বৃদ্ধ যেন আরও বেশি চমকে উঠেছেন। তা দেখে হাসিও পাচ্ছিল। বললুম, –তাহলে দুদিন ধরে বেশ একটা রহস্যপুরীতে কাটাচ্ছেন দেখছি। কিন্তু হে প্রাজ্ঞ ঘুঘুমশাই, আপনি কি তাহলে অবশেষে ভূত সত্যি বলে মানলেন?
কর্নেল আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি এখনও ব্যাপারটা তামাশা বলে ভাবছ, ডার্লিং! তোমার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে তুমি একটুও ভয় পাওনি। আমার কিন্তু সত্যি কেমন ভয় করছে।
অবাক হলুম। চিরদিনের দুঃসাহসী আর শক্তিমান কর্নেলের মতো মানুষের কীসের ভয় করছে? ভূতের ভয় নিশ্চয়ই নয়। বললুম, –আপনার কিমনে হয় এসব ভূতুড়ে ব্যাপারের পেছনে কোনও লোক আছে, যার ছদ্মনাম ইস্কাপনের টেক্কা?
কিছু বলা যায় না। শুধু আঁচ করছি, কেউ একটা সাংঘাতিক কোনও কাজ করতে চায়। এসব তারই প্রস্তুতি। –বলে কর্নেল চুরুট জ্বাললেন। তারপর জানালার কাছে গেলেন।
ওপরে এবার কোথায় যেন ধুপ ধুপ ধুপ ধুপ… ভারী পায়ে হাতির মতো কোনও ওজনদার জন্তুর যেন হেঁটে বেড়ানোর শব্দ শোনা গেল। উত্তেজিতভাবে বললুম, -ও কীসের শব্দ?
কর্নেল কোনও জবাব দিলেন না। শব্দটা আমাদের এই ঘরের ছাদে এলে আমার এতক্ষণে সত্যি-সত্যি ভূতের ভয় পেয়ে বসল। ধুপ ধুপ ধুপ ধুপ… পায়ের শব্দে ছাদটা কেঁপে উঠছে। এ কখনও মানুষের পায়ের শব্দ হতে পারে না।
একটু পরে শব্দটা সরে গেল। দূরে মিলিয়ে গেলে কর্নেল বললেন, -কাল রাতে ওই শব্দ শুনে ছুটে গিয়েছিলুম। হলঘরের সিঁড়ির নিচে গেছি, হঠাৎ ওপরে চোখ গেলে হাতির পেছনকার দুটো পা একপলকের জন্য দেখতে পেলুম। যাই হোক, রাতবিরেতে রাজবাড়ির দোতালায় হাতি ঘুরে বেড়ানোটা কাজের কথা নয়।
বলে কর্নেল দুটো জানালাই বন্ধ করে দিলেন। তারপর বললেন, –শুয়ে পড়ো জয়ন্ত। হুঁ, তার আগে অবশ্য কিছু খেয়ে নাও। ওই দ্যাখো, তোমার খাবার ঢাকা দেওয়া আছে টেবিলে।
.
বিভীষিকা বলতে ঠিক কী বোঝায়, লোহাগড়া-রাজবাড়িতে একটা রাত কাটিয়েই হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছিলুম। হলঘরে ঠাকুরদাঘড়ির টঙাস-টঙাস বিদঘুটে শব্দটা ক্রমশ যেন বাড়ছিল। তারপর কড়াত করে শ্বাস টেনে ঠং-ঠং করে বেজে ওঠাটাও পিলে-চমকানো বললে ভুল হয় না। এক সময় যেন হলঘরের দিকের দরজায় কেউ ঠুকঠুক করে বার তিনেক টোকা দিয়েছিল। কর্নেলের বারণ থাকলেও দরজা খুলতুম না।
লম্বা-চওড়া ঢাউস দুটো জানলা বন্ধ ছিল। তাই ঘুম আসছিল না। দমবন্ধ হয়ে আসছিল যেন। শেষে সাহস করে মশারি থেকে বেরিয়ে খুলে দিয়েছিলুম। কিন্তু সাহস করে বাইরে তাকাতে পারিনি। হঠাৎ যদি চোখে পড়ে, অলক্ষ্মীর মূর্তি বাগানে হেঁটে বেড়াচ্ছে, নির্ঘাৎ ভিরমি খেয়ে পড়ব। ঘরের ভেতর চাঁদের আলো উপচে আসছিল। কিন্তু সেই দুধের মতো সাদা আলোর দিকে তাকাতেও ভয় করছিল। শেষরাতে শেয়ালের ডাক শুনেছিলুম। তার একটু পরে ওপরের কোনও ঘরে ফের ঝনঝন শব্দে কেউ কিছু ছুঁড়ে ফেলল। কে যেন প্রচণ্ড রাগে ভাঙচুর করে বেড়াচ্ছে। কে সে?
তারপর হলঘরের সিঁড়ি বেয়ে ধুপ-ধুপ শব্দ করে কে নেমে এল। সেই ভূতুড়ে হাতিটাই কি? ভয়ে রিভলভারটা বের করে ওত পেতে রইলুম বিছানায়। কিন্তু সেই অলৌকিক হাতি ঘরের দরজা ভাঙতে ফুঁ দিল না। কুকুরের গজরানি শুনলুম। ফের সব চুপ। বাইরে ঝিমধরা জ্যোৎস্নায় একটা প্যাঁচা ক্রা-ক্রাও করে ডাকতে-ডাকতে উড়ে গেল। তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি।
উঠে দেখি, সাড়ে সাতটা বাজে। কর্নেল নেই। সম্ভবত অভ্যাসমতো প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছেন। হলঘরের দিকের দরজা খোলা রয়েছে। পরদার পেছন থেকে কে বলল, চা এনেছি স্যার!
গাট্টাগোট্টা চেহারার সেই রাঘব নামে লোকটা ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকল। বিনীত ভঙ্গিতে বলল, যখন দরকার হবে, ডাকবেন স্যার। আমার নাম রাঘব। আমি পাশের ঘরেই থাকি।
জয়গোপালবাবুর কথা জিগ্যেস করলে রাঘব বলল, -ম্যাঞ্জারবাবু এখন কুকুরের ঘরে আছেন। ওনার ওই এক নেশা স্যার। সারাদিন কুকুর নিয়েই কাটান।
রাঘব চলে গেলে দক্ষিণের দরজা খুলে ওদিকের বারান্দায় গেলুম। এবার দিনের আলোয় পরিবেশটা স্পষ্ট হচ্ছিল। বসতি এলাকার বাইরে নিরিবিলি জায়গায় এই রাজবাড়িটা যেন নিঝুম এক প্রেতপুরী। বিশাল এলাকা জুড়ে উঁচু পাঁচিলে চারদিক ঘেরা। একসময় যা সাজানো-গোছানো বাগান ছিল, তা এখন প্রায় জঙ্গল হয়ে উঠেছে। তার ভেতর একটা কালো কামানও দেখতে পাচ্ছিলুম। চায়ের পেয়ালা রেখে সিঁড়ি বেয়ে লনে নামলুম। ঘাসে এখনও রাতের শিশির চকচক করছে। একফালি পায়েচলা পথ ধরে হাঁটতে শুরু করলুম। দক্ষিণের পাঁচিলের সমান্তরালে এই পথ। পুবে এগিয়েছে। পুবের ফটকের অবস্থা জরাজীর্ণ। লোহার কপাট মরচে ধরে ভেঙে পড়েছে। সেখান দিয়ে বেরুলে একটা নদী দেখতে পেলুম। এই তাহলে লোহা নদী। অর্ধবৃত্তাকারে বাঁক নিয়ে। পশ্চিমে ঘুরেছে। এই বাঁকের মুখে উঁচু জমিতে রাজবাড়ি এলাকা। অলক্ষ্মীর মন্দির খুঁজতে ঝোপঝাড় ভেঙে খানিকটা এগিয়ে গেলুম। তারপর দেখি, পাঁচিলের নিচে কে হুমড়ি খেয়ে বসে চুপিচুপি কী যেন করছে।
লোকটার সঙ্গে আমার দূরত্ব মিটার-চল্লিশের বেশি নয়। তার গায়ে কালো কোট দেখেই চমকে উঠলুম। পরমুহূর্তে সে মুখটা এদিকে ঘোরাল। অমনি দেখি, আরে! এ যে সেই প্রফেসর তানাচা। চেঁচিয়ে ডাকলুম, –প্রফেসর তানাচা! হ্যাল্লো প্রফেসর তানাচা!
