আমার বরাত ভালোই বলতে হয়। …অফিসের লাইব্রেরিতে গিয়ে স্থান-নামের গাইডবুক হাতড়ে লোহাগড়া পেয়ে গেলুম। বিহার সীমান্তে পূর্বরেলের একটা ছোটো স্টেশন। তবে ঐতিহাসিক জায়গা। বিশেষ করে লোহা নদীর ধারে অলক্ষ্মীর মন্দির নাকি দেখার মতো জিনিস। সতেরো শতকে বর্তমান রাজবংশের এক পূর্বপুরুষ শিবেন্দ্রনারায়ণ ছিলেন দুর্ধর্ষ মানুষ। প্রজাদের ওপর ভীষণ অত্যাচার করতেন। প্রতিদিন মানুষের রক্ত না দেখে জলগ্রহণ করতেন না। তিনিই অলক্ষ্মীকে হটিয়ে লক্ষ্মীমূর্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অদ্ভুত-অদ্ভুত কী-সব ঘটনা ঘটতে থাকে। শেষপর্যন্ত মন্দিরটা ভেঙে দিলেও অলক্ষ্মীকে কেউ উচ্ছেদ করতে পারেননি। মন্দিরের উঁচু চৌকোণা মেঝের ওপর এখনও সিংহাসনে বসে অলক্ষ্মীর কালো পাথরে গড়া মূর্তি ক্রুর চোখে তাকিয়ে রয়েছে। অলক্ষ্মীর পুজো করবে এমন বেআক্কেলে ভক্ত কেই-বা আছে?…
.
০২.
কী কষ্টে যে লোহাগড়া পৌঁছলুম, বলার নয়। ট্রেন নয়, যেন ছ্যাকড়া গাড়ি। পৌঁছুল রাত এগারোটা বাজিয়ে। খাঁ-খাঁ, নিঝুম প্ল্যাটফর্ম। স্টেশনমাস্টার একচোখো ভূতুড়ে লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে কথা বলছিলেন। তাঁর আশ্রয়প্রার্থী হওয়া ছাড়া উপায় কি? আর একজনও যাত্রী নামেনি ট্রেন থেকে। জ্যোৎস্নার ফিং ফুটছে চারদিকে। গাছপালায় কুয়াশা জমে রয়েছে। এদিকে-ওদিকে টিলাগুলো জ্যোৎস্নায় বিশাল হাতির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে।
-হ্যালো জয়ন্ত!
চমকে উঠেই মানুষটিকে দেখে সব ক্ষোভ, হতাশা, ক্লান্তি তক্ষুনি চলে গেল! মনটাও বিগলিত হল বইকী! এত রাতে আমার বৃদ্ধ বন্ধু নিশ্চয়ই দুর্লভ প্রজাতির রাতপাখি দেখতে স্টেশনে আসেননি।
বিকেলের ট্রেনটাও দেখে গেছি!
গোয়েন্দাপ্রবর আমার কাঁধে হাত রাখলেন। –এ বুড়োর ওপর রাগ করো না ডার্লিং! রাজাবাহাদুরের তলব পেয়েই ছুটে আসতে হল। তুমি কাগজের লোক। কতরকম তোমার। অ্যাসাইনমেন্ট থাকে। হুট করে গিয়ে চলো বললেই তো আর বেরিয়ে পড়তে পারও না আমার মতো।
–কৈফিয়ত কে চেয়েছে? এ-মুহূর্তে চাইবার মতো একটি জিনিসই আছে। তা হল কড়া গরমাগরম চা কিংবা কফি।
পাবে। –আশ্বস্ত করলেন ঘুঘুমশাই। স্টেশনের বাইরে পৌঁছুলে কে গম্ভীর স্বরে বলে উঠল, –আপনার সাংবাদিক বন্ধু কি এসেছেন কর্নেল?
ছায়ার আড়াল থেকে এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। কর্নেল বললেন, –জয়ন্ত এসেছে। জয়গোপালবাবু। আপনাকে বলছিলুম না? পৃথিবীর যেখানে-যেখানে অদ্ভুত-অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, জয়ন্ত সেখানে গিয়ে ঢুঁ মারে। আমি জানতুম, ও না এসে পারবে না।
কর্নেল হো-হো করে হেসে উঠলেন। কিন্তু জয়গোপালবাবু হাসলেন না। বুঝলুম, গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। হাত বাড়িয়ে আমার হাত নিয়ে হ্যান্ডশেক করলেন। -লোহাগড়া রাজবাড়িতে আপনাকে সাদর অভিনন্দন, জয়ন্তবাবু!
কর্নেল বললেন, -জয়ন্ত, ইনি রাজ এস্টেটের ম্যানেজার। অসমসাহসী মানুষ। অথচ ইনিও… হঠাৎ কর্নেল চুপ করে গেলেন।
জয়গোপালবাবু বললেন, –আসুন কর্নেল! জয়ন্তবাবু নিশ্চয়ই ক্লান্ত।
আমার মনে হল, ভদ্রলোক যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও কর্নেলের সঙ্গে স্টেশনে এসেছেন। যে-কোনও কারণে হোক, রাজবাড়িতে দ্রুত ফিরতে চাইছেন।
ছোটো স্টেশনবাজার নিঝুম হয়ে গেছে। একটা চায়ের দোকানে আলো জ্বলছে। কয়েকজন। লোক ঝিমধরা হয়ে বসে রয়েছে। হাতে চায়ের গেলাস। চায়ের জন্য মন চনমন করে উঠল। কিন্তু জয়গোপালবাবুর তাড়ায় গাড়িতে ঢুকতে হল। এই গাড়িটাই তাহলে কলকাতা পাঠানো হয়েছিল কর্নেলকে আনতে। ষষ্ঠীচরণ গাড়িটা দেখে যে হেসেছিল, তাতে কিছু অন্যায় হয়নি তার। একেবারে ঝরঝরে ভিন্টেজ কার। আর রাস্তার অবস্থাও তেমনি এবড়ো-খেবড়ো। বসতি এলাকা। ছাড়িয়ে একটা টিলার পাশ দিয়ে ছোটো একটা রাস্তায় গাড়ি মোড় নিল। তারপর জ্যোৎস্নায় ধু-ধু সাদা ন্যাড়া একটা তেপান্তর পেরোতে থাকল। রাজবাড়ি বেশ দূরে বলে মনে হল।
মাইলটাক রাস্তা ফের একটা ধকল গেল। একটা ঝিলের ধার দিয়ে প্রবল আওয়াজে ঝিলচর বুনো হাঁসগুলোকে চমক খাইয়ে রাজবাড়ি পৌঁছলুম। দেউড়ি দিয়ে গাড়ি ঢুকলে এক ছায়ামূর্তি নিঃশব্দে গেট বন্ধ করে দিল। জয়গোপালবাবু তার উদ্দেশে বললেন, -রাঘব! শিগগির ঠাকুরকে বলে আগে একপট কফি নিয়ে আয়।
হলঘরের পাশের একটা ঘরে কর্নেল উঠেছেন। জয়গোপালবাবু সকালে দেখা হবে বলে চলে গেলেন। একটু পরে সেই রাঘব কফি রেখে গেল। কড়া কফি খেতে-খেতে ইস্কাপনের টেক্কার চিঠিটা বের করে দেখালুম। কর্নেল কিছুক্ষণ গুম হয়ে রইলেন। তারপর বললেন, –এদিকে আরেক রহস্য জমে উঠেছে, যেজন্য ছুটে এসেছি। রাজাবাহাদুর অজিতেন্দ্রের ধারণা, শিগগির রাজবাড়িতে একটা সাংঘাতিক কিছু ঘটতে চলেছে। রাতবিরেতে অদ্ভুত সব ধুপধুপ, ঝনঝন শব্দ শোনা যাচ্ছে। কারা যেন চলাফেরা করে বেড়াচ্ছে। কোথায় কী ভাঙচুর করছে। রাজাবাহাদুর নাকি স্বচক্ষে দেখেছেন, অলক্ষ্মীর মূর্তি বাগানে হেঁটে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তার চেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, দরজায় টোকার শব্দ। দরজ খুলে কিন্তু কাউকে দেখা যাচ্ছে না। এবং এ সবই ঘটছে রাত্রিবেলা। দিনে সব কিছু স্বাভাবিক। রাত এলেই বিভীষিকা।
কর্নেল চুপ করার সঙ্গে-সঙ্গে কোথাও ঝনঝন প্রচণ্ড শব্দ শোনা গেল। কে যেন কোনও ধাতব জিনিস ছুঁড়ে ফেলল। কর্নেল বললেন, –ওই শোনো! কাল শেষ রাতে পৌঁছেও এই শব্দটা শুনেছি…।
