ফোনে কর্নেলকে বললুম, -ঠাকুরদার কবচ উদ্ধার করতে প্রফেসর তানাচা সম্ভবত আপনার সেই হয়গ্রীব অবতারের মুলুকে পাড়ি দিয়েছেন। ওঁর খোঁজে বেরিয়ে পড়ছেন না কেন?
কর্নেল বললেন, -সময় নেই ডার্লিং। অক্টোবর শেষ হয়ে এল। মেক্সিকান ক্যাকটাসটার ওপর শিশির ও কুয়াশার কী প্রতিক্রিয়া ঘটে, দেখার জন্য ব্যস্ত রয়েছি। তাছাড়া ভৈশারার জঙ্গল থেকে সে প্রজাপতিটা ধরে এনেছিলুম, তার ডানার রং হঠাৎ বদলাতে শুরু করেছে। প্রকৃতিরহস্যের গোলকধাঁধায় আটকে গেছি। …কর্নেল ঝাড়া পাঁচ মিনিট এইসব বুকনি ঝেড়ে ফোন ছাড়লেন।
সেদিনই বিকেলের ডাকে ভারি অদ্ভুত একটা চিঠি পেলুম।
ওহে সাংবাদিক,
তুমি তো সব সময় রোমাঞ্চকর খবর খুঁজে বেড়াও। দোসরা নভেম্বর রাত দশটায় লোহাগড়া রাজবাড়ির পেছনে নদীর ধারে অলক্ষ্মীর থানে চলে এসো। রোমাঞ্চকর খবর পেয়ে যাবে হাতে নাতে।
ইতি,
ইস্কাপনের টেক্কা।
চিঠিটা পড়ে প্রথমে একচোট হাসলুম। খবরের কাগজের লোকদের ঠাট্টা-তামাশা করে অনেকে চিঠি লেখে। কেউ কেউ প্রাণের ভয় দেখিয়ে শাসায়। এ আমার গা-সওয়া। বহুবার দারুণ রকমের খবরের টিপস পেয়ে হন্তদন্ত গিয়ে দেখেছি, পুরোটাই হৌক্স-স্রেফ গুল।
কিন্তু এই ছোটো চিঠিটার বৈশিষ্ট্য হল, খবরের কাগজ কেটে-কেটে এক বা একগুচ্ছ শব্দ আঠা দিয়ে কাগজে সেঁটে চিঠিটা তৈরি করা হয়েছে। ইস্কাপনের টেক্কা কোত্থেকে কেটে বসানো হয়েছে বুঝতে দেরি হল না। দৈনিক সত্যসেবকেরই দুইয়ের পাতায় নিচে একটা কমিক সিরিজ ছাপা হয়। ওটা সেখান থেকেই নেওয়া। লোহাগড়া রাজবাড়ির এবং অলক্ষ্মীর থানে কোত্থেকে কেটেছে, কাগজের ফাইল হাতড়ে উদ্ধার করতে পারলুম না।
একত্রিশে অক্টোবর রাত সাড়ে নটায় যখন অফিস থেকে বেরুলুম, তখনও ব্যাপারটা হৌক্স বলেই ভেবেছি। কিন্তু বাড়ি ফেরার পর ক্রমশ একটা চাপা অস্বস্তি জেগে উঠতে থাকল মনের ভেতর। আবার চিঠিটা নিয়ে বসলুম। খামের ওপর আমার নাম-ঠিকানাও ছাপা অক্ষরে সাঁটা। সেটা খুব সহজ কাজ। দৈনিক সত্যসেবকে প্রকাশিত আমার লেখা ফিচার থেকে নামটা কেটে নেওয়া যায়। আর সত্যসেবকের ঠিকানাও শেষ পাতার তলায় মুদ্রিত থাকে। ডাকটিকিটের ওপর ডাকঘরের নাম কিছুতেই পড়া গেল না।
ব্যাপারটা কর্নেলকে জানাবার ভরসা পাচ্ছিলুম না। বুড়োর মতিগতি যা টের পেয়েছি, তাতে ওঁর এখন প্রকৃতিরহস্যের মৌতাত জমে উঠেছে। এখন আর কানের কাছে ক্র্যাকার ফাটালেও প্রজাপতির ডানা কিংবা ক্যাকটাসের গায়ে আটকানো যন্ত্রটি থেকে ওঁর দৃষ্টি একচুল সরানো যাবে না।
কিন্তু অনিদ্রা এবং দুঃস্বপ্নে লম্বা-চওড়া একটা রাত কাটিয়ে পয়লা নভেম্বর সকালে মরিয়া হয়েই বুড়োকে ফোন করলুম। কিন্তু সাড়া দিল ওঁর ভৃত্য শ্রীযুক্ত ষষ্ঠীচরণ। বলল, -কাগুঁজে দাদাবাবু নাকি? বাবামশাই তো নেই। কাল বিকেলে কোথায় যেন গেলেন-হ্যাঁ, গড়গড়া বললেন, নাকি সোনাগড়া… দুচ্ছাই! পেটে আসছে মুখে আসছে না।
লোহাগড়া নয় তো?
আজ্ঞে! আজ্ঞে! তাই বটে কাগুজে দাদাবাবু। ষষ্ঠীচরণ খিকখিক করে হাসতে লাগল।
-কিছু বলে যাননি?
–কবেই বা বলেকয়ে যান? উঠল বাইতো মক্কা যাই–বরাবর তো তাই। তবে কথা কী কাগুজে দাদাবাবু…।
-আহা, ঝটপট বলো!
লোহাগড়ার রাজবাড়ি থেকে গাড়ি পাঠেছিল, বুঝলেন?–ষষ্ঠীচরণ আবার হাসতে লাগল।
–হাসির কী হল?
–গাড়িখানা দেখলে আপনিও হাসতেন কাগুঁজে দাদাবাবু!
–বুঝেছি, ভিনটেজ কার। রাজা-জমিদারদের অবস্থা এখন শোচনীয়। আচ্ছা, ছাড়ি ষষ্ঠীচরণ? শুনুন, শুনুন!–ষষ্ঠীচরণ ব্যস্তভাবে বলল, এইমাত্র মনে পড়ল। বাবামশাই আপনার কথা কী যেন বলে গেলেন–দুচ্ছাই! পেটে আসছে, মুখে আসছে না। …হ্যাঁ, আপনাকে যেতে বলেছেন। আপনি যেন অবশ্য করে যাবেন।
এতক্ষণ বলতে কী হয়েছিল? রাগ করে ফোন রেখে দিলুম। আরও কয়েকটা মিনিট রাগটা থাকল। মনিব ও চাকর দুজনেই সমান পাগল। কর্নেল কি আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারতেন না? কিংবা যাওয়ার সময় একবার রিং করলেও কি মহাভারত অশুদ্ধ হতো!
কিন্তু রহস্যটা তাহলে যে সত্যি-সত্যি ঘনীভূত হয়ে উঠল। ইস্কাপনের টেক্কা আমাকে দোসরা নভেম্বর রাত দশটায় লোহাগড়া রাজবাড়ির পেছনে নদীর ধারে অলক্ষ্মীর মন্দিরে হাজির হতে বলেছে। আর এদিকে গোয়েন্দাপ্রবর কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে সেই লোহাগড়া রাজবাড়িরই লোক গাড়ি চাপিয়ে নিয়ে গেল! ব্যাপারটা মোটেও আকস্মিক যোগাযোগ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হৌক্স বলেও মনে হয় না।
যতবার কথাটা ভাবলুম, ততবার রহস্যের একটা কালো পরদা ভেসে উঠল মনে। সেই কালো পরদার ফাঁকে সাদা রঙের একটা তাস ইস্কাপনের টেক্কা ঝিলিক দিতে থাকল। আর মুহুর্মুহু গা ছমছম করতে থাকল।
তবে ইস্কাপনের টেক্কা যেই হোক, আপাতত লোহাগড়া জায়গাটা কোথায় সেটা খুঁজে বের করা দরকার। কর্নেল-বুড়োর মুন্ডুপাত করলুম অসংখ্যবার। ঠিকানা তো ঠিকমতো বাতলে যাবেন ষষ্ঠীচরণের কাছে? এখন লোহাগড়ার খোঁজে বেরুনো মানে খড়ের গাদায় সূচ খুঁজতে যাওয়া!
হঠাৎ খেয়াল হল, রাজবাড়ি যখন আছে, তখন জায়গাটা নেহাত অখাদ্য নয়। তাছাড়া অলক্ষ্মীর মন্দির যেখানে আছে, সেখানকার খ্যাতি বা অখ্যাতি নিশ্চয়ই অসামান্য। অতএব চেষ্টা করে দেখা যাক।
