তিনজনে একসঙ্গে কফিতে চুমুক দিলুম। ঘরের আবহাওয়া কেন যেন থমথমে মনে হচ্ছিল আমার। একটু পরে কর্নেল কফির পেয়ালায় শেষ চুমুক দিয়ে চুরুট ধরিয়েছেন, প্রফেসর তানাচা হঠাৎ নড়ে উঠলেন। তারপর দুধে-সাদা কফিটুকু কোঁত করে গিলে কফির পেয়ালা ঠকাস করে রেখে উঠে দাঁড়ালেন।
তারপর–সর্বনাশ! ঠাকুরদার কবচটা…বলেই সটান পরদা তুলে অদৃশ্য হলেন। পরদাটা যেন ঝড়ের ধাক্কায় বেজায় দুলতে থাকল।
কর্নেল চুরুটের নীল রঙের প্যাচালো ধোঁয়া উড়িয়ে মিটিমিটি হেসে বললেন, –কী বুঝলে জয়ন্ত?
–অনেক কিছু। আপনি দেখছি ম্যাজিশিয়ানদের রাজা। এতসব জানলেন কীভাবে? ভদ্রলোককে নিশ্চয়ই চেনেন।
–ওঁকে এই প্রথম দেখলুম, ডার্লিং!
কর্নেল সোফা থেকে উঠে জানালার ধারে গেলেন। তবে সেখানে তাড়ানোর মতো কোনও কাক নেই। উঁকি মেরে নিচের রাস্তা দেখতে-দেখতে বললেন, প্রফেসর তানাচা বাস পেয়ে গেলেন। যাই হোক, তুমি একটু অবাক হয়েছ টের পাচ্ছি। দ্যাখো জয়ন্ত, আসল কথাটা হচ্ছে অবজার্ভেশন-পর্যবেক্ষণ। তাছাড়া, তুমি তো জানো, ম্যানওয়াচিং আমার একটা হবি। এ কিছু কঠিন নয়-চেষ্টা করলে তুমিও এগুলো পারও। যেমন ধরো-উনি যে আফিংখোর, সেটা ওঁর চোখ দেখলেই ধরা যায়। তাছাড়া কফির সঙ্গে বেশি দুধ চাইলেন। আফিংখোররা দুধের প্রতি বেশিমাত্রায় আসক্ত। ট্যাক্সির ভূতুড়ে যাত্রীর খবর তুমিই লিখেছ। যাত্রীটি রাত দুটোয় ট্যাক্সিওয়ালা নির্দিষ্ট জায়গায় যাতে আবার আসে, তাই ইচ্ছে করে অনেক টাকা ভাড়া দিত। প্রফেসর তানাচা এটা উল্লেখ করামাত্র বুঝলুম তেমন কিছু ঘটে থাকবে।
–আজ খাম পাননি, কীভাবে জানলেন?
কর্নেল হাসলেন। –আজ টাকা পেলে আসতেন না। এভাবে টাকা পাওয়ার কথা কে আর পাঁচকান করতে চায় বল? সে অবশ্যই ভাবত, টাকাটা যদি অদৃশ্য দাতামহাশয় রেগেমেগে বন্ধ করে দেন? বন্ধ হয়েছে বলেই আমার কাছে আসা।
-কিন্তু চুরি?
–ওঁর মত আফিংখোরকে টাকা দেওয়ার এই একটিই উদ্দেশ্য থাকতে পারে। অভাবী মানুষ। হাতে টাকা পেলে আফিংয়ের মাত্রা চড়িয়ে ফেলবেন এবং মড়ার মতো পড়ে থাকবেন। সেই সুযোগে চোর ইচ্ছেমতো চুরির বস্তুটি হাতড়ানোর অঢেল সময় পাবে। তবে গরমের জন্য দরজা খুলে রাখার কথাটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হল না। সম্ভবত নেশার মাত্রা বেশি হওয়ায় দরজা লাগানো হতো না। আফিংখোরদের এই সমস্যা ডার্লিং। মৌতাত কিছুতেই নষ্ট হতে দেবে না-সে যদি ঘরে আগুন লাগে, তবুও।
কর্নেল হঠাৎ ভুরু কুঁচকে সটান এগিয়ে এলেন। আরে! ভদ্রলোক ব্যাগটা ফেলে চলে গেলেন যে!
টেবিলে ব্যাগটা এতক্ষণে আমার নজরে পড়ল। বললুম, –আফিংখোরদের ব্যাগের ভেতর কী থাকতে পারে?
কর্নেল ব্যাগের মুখটা ফাঁক করে দেখে বললেন, –টাকা না পেয়ে ক্ষুণ্ণমনে প্রফেসর তানাচা গঙ্গাস্নানে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে আমার এখানে এসেছিলেন। লুঙ্গি আর গামছা ভেজা রয়েছে। আর… আর… এটা…। একটা নোটবই দেখছি। পরের জিনিসে হাত দিতে নেই। কিন্তু এটা একটা স্পেশাল কেস। ভদ্রলোককে আরও একটু চেনা দরকার।
চটিমতো কালো মলাটের জীর্ণ নোটবই। ওঁর কার্ডটার মতোই অবস্থা। প্রথম পাতায় চোখ বুলিয়ে দেখি, শীতারানাথ চাটুজ্জে–বড়ো হরফে লেখা রয়েছে। বললুম, –তানাচার রহস্য ফাঁস হল, কর্নেল! পাতা ওলটান।
পরের পাতায় লাল কালিতে সম্ভবত তন্ত্রমন্ত্র লেখা। ওঁ হ্রীং ক্রীং ফট ফট… মাড়য় মাড়য় তাড়য়। তাড়য়… এইসব বিদঘুটে লাইন। বশীকরণ মন্ত্র। মারণমন্ত্র। তাড়নমন্ত্র। কোন গাছের শেকড়ের কী অলৌকিক ক্ষমতা আছে, তার বৃত্তান্ত। তারপর একটা পাতা খুলে কর্নেল বললেন, -এও কি মন্ত্র! নাকি ছড়া?
কবে যাবি রে সেই সমাজে
ছাড় কুইচ্ছে পোড়া পাম রে…
এই আজব ছড়া কিংবা মন্ত্র আমি আওড়াতে শুরু করলুম। কয়েকবার আওড়ে দিব্যি মুখস্থ হয়ে গেল। কর্নেল নোটবইটা ভেতরে ঢুকিয়ে রেখে বললেন, -বেশ ছন্দ আছে লাইনদুটোতে। সহজে মুখস্থ হয়ে যায়। জয়ন্ত, যে প্রফেসর তানাচার ঠাকুরদার কবচ ওভাবে চুরি যায়, তার নোটবইয়ে এই উদ্ভুটে ছড়া বা মন্ত্রের নিশ্চিয়ই কোনও তাৎপর্য আছে। বরং দুপুরবেলা এ নিয়ে বসব। এখন আমার ছাদে যাওয়ার সময় হল। মেক্সিকান ক্যাকটাসটার গায়ে ভোরবেলা ইলেকট্রোনোমিটার লাগিয়ে রেখে এসেছি। দুষ্টু গাছটা গ্রাফিক চার্টে সাড়া দিয়েছে নাকি দেখা দরকার।
কর্নেল উঠলেন। বুঝলুম, এখন আর আড্ডার আশা নেই। বুড়ো এবার উদ্ভিদ আর পোকামাকড়ের রাজ্যে ঢুকে পড়বেন। তখন আফিংখখার প্রফেসর তানাচার মতোই ওঁর দশা হবে। প্রকৃতিবিদ্যার মৌতাত মাথা ভাঙলেও ঘুচবে না। অতএব আমিও উঠে পড়লুম। বললুম, –চলি কর্নেল! প্রফেসর তানাচা-রহস্যের কী কতটা দাঁড়াল ফোনে জানিয়ে দেবেন। দৈনিক সত্যসেবকের জন্য দারুণ একটা স্টোরি হবে।
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, প্রফেসর তানাচা হয়তো পিশাচসিদ্ধ হতে চেয়েছিলেন একসময়। ওটা পিশাচ-জাগানো মন্ত্র হলেও হতে পারে। জপ করে দ্যাখো, ডার্লিং। …
.
এর পর কয়েকটা দিন আবার আমাকে অফিসের কাজে বাইরে ছোটাছুটি করে বেড়াতে হল। তার মধ্যে যখনই সময় পেয়েছি, কর্নেলকে ফোন করেছি। প্রফেসর তানাচার আর পাত্তা নেই। ব্যাগটাও ফেরত নিতে আসেননি। সপ্তাহটাক পরে কর্নেল ফোন করলেন আমাকে মির্জাপুরের সেই মেসে প্রফেসর তানাচার খোঁজে গিয়েছিলেন। দরজায় তালা আটকানো রয়েছে। মেসের ম্যানেজার বলেছেন, পাগলা লোক। কখন থাকেন, কখন না–কিছু ঠিক নেই।
