খুদে কার্ডটার অবস্থা জরাজীর্ণ। কর্নেল উলটে-পালটে দেখে বললেন, -ঢ্যাঙা, রোগা চেহারা, মাথার মধ্যিখানে টেরি?
আমাকে অবাক করে ষষ্ঠীচরণ বলল, আজ্ঞে।
–কালো কোট, ঢোলা পাতলুন, কাঁধে ঝোলা?
আজ্ঞে বাবামশাই!-ষষ্ঠীচরণের সরু দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়ল।
নিয়ে এসো। -বলে কর্নেল তেল-চিটচিটে ছেঁড়াফাটা কার্ডটা আমাকে এগিয়ে দিলেন, লাস্ট কার্ড, ডার্লিং। সাবধানে হ্যাঁন্ডেল করো। নইলে তোমায় নিজের পয়সায় বেচারার নেমকার্ড ছেপে দিতে হবে।
কার্ডে আগন্তুকের নাম ছাপানো রয়েছে। প্রফেসর তানাচা, দা গ্রেট ম্যাজিশিয়ান। ঠিকানার ওপর ময়লা জমেছে। তাই অস্পষ্ট। বললুম, –চিনা কিংবা জাপানি নাকি?
উঁহু। খাঁটি বাঙালি।
–অদ্ভুত নাম। কিন্তু আজকাল কি দেয়ালের ওপারেও আপনার দৃষ্টি চলে!
-একটু আগে জানালার কাকটাকে তাড়াতে গিয়ে দেখেছি, প্রফেসর তানাচা ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আমার এই ফ্ল্যাটের দিকে করুণ মুখে তাকিয়ে আছেন। নিশ্চয়ই দ্বিধায় ভুগছিলেন- একটা তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে আমার কাছে আসাটা ঠিক হবে কি না। …এই যে। আসুন, আসুন প্রফেসর তানাচা। বসুন।
যিনি ঢুকলেন, তিনি ধুতি-পাঞ্জাবি পরে থাকলে হলফ করে বলতে পারতুম, ইনি অষ্টপ্রহর সংকীর্তনের খোলবাজিয়ে। মধ্যিখানে সিঁথি-করা চুল, ঢুলুঢুলু চাউনি, ভাবুক ভাব এবং ঠোঁটে মাখনের মতো কোমল হাসি। তবে কোট-প্যান্টের অবস্থা ওঁর কার্ডের মতোই করুণ। নোংরা ঝোলাটা কফি-টেবিলে রেখে কাচুমাচু হেসে বললেন, -ভয়ে বলি, কি নির্ভয়ে বলি?
কর্নেল বললেন, –নির্ভয়ে বলুন প্রফেসর তানাচা। আর ইয়ে-কফি চলবে কি?
খুব চলবে। তবে দু-ভাগ দুধ, এক ভাগ কফি। -প্রফেসর তানাচা গলার ভেতর বেহালা বাজানোর মতো টেনে-টেনে হেঁ-হেঁ করে কেমন একটা হাসতে লাগলেন।
ওঁর কফি না খেয়ে তাহলে তো বরং দুধ খাওয়াই উচিত। কফি খাওয়ার অভ্যাস নেই তো না খেলেই হয়। আমি প্রফেসর তানাচার দিকে তাকিয়ে রইলুম। ভদ্রলোককে দেখে কেন কে জানে রহস্যের গন্ধ পাওয়া যায়। ম্যাজিকের খেলা দেখান বা নাই দেখান, লোকটির টুলটুলু চাউনিতে কিন্তু ম্যাজিক আছে।
ষষ্ঠীচরণকে ডেকে কফির কথা বলে কর্নেল বললেন, –আলাপ করিয়ে দিই। আমার তরুণ বন্ধু জয়ন্ত চৌধুরি। দৈনিক সত্যসেবকের স্পেশাল রিপোর্টার।
প্রফেসর তানাচা খুশি হয়ে বললেন, –কী সৌভাগ্য। সত্যি বলতে কী, সত্যসেবকে আপনার লেখা রাতের ট্যাক্সিতে ভূতুড়ে যাত্রী পড়েই ওঁর কাছে আসা। অনেক কষ্টে ঠিকানা জোগাড় করেছি আপনাদের অফিস থেকে। প্রথমে আপনার খোঁজই করেছিলুম। শুনলুম, আপনি সাঁওতালডি গেছেন। ফিরতে দেরি হবে। তা নোডশেডিংয়ের কিছু সুরাহা হবে বুঝলেন?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, -সুরাহা হলেও কি আপনার বাড়িতে ভূতের দৌরাত্ম থামবে ভাবছেন প্রফেসর তানাচা? সবই ভূতের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।
প্রফেসর তানাচার মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। –আপনার অলৌকিক ক্ষমতার কথা কাগজে পড়েই তো আসা। স্বীকার করছি কর্নেলসায়েব, একসময় দেশেবিদেশে আমি নিজেও অনেক ভূতুড়ে ম্যাজিক দেখিয়েছি কিন্তু আপনার কোনও তুলনা হয় না। বহুদিন ম্যাজিক ছেড়ে দিয়েছি। ম্যাজিকের ওপর ঘেন্না ধরে গিয়েছিল বলতে পারেন। তাছাড়া, অনিদ্রার ব্যাধি, নানারকম মানসিক অশান্তি, অর্থাভাব। তো…
ওঁর কথা কেড়ে কর্নেল বললেন, -ট্যাক্সির ভূতটার মতো আপনার ভূতটাও আশা করি টাকাকড়ির ব্যাপারে খুব উদার?
প্রফেসার তানাচার চোখের চুলটুলু ভাবটা চলে গেল। বললেন, –কী আশ্চর্য, কী আশ্চর্য। আপনি দেখছি থটরিডিং জানেন!
-কত টাকা পেয়েছেন?
প্রফেসর তানাচা চাপাগলায় বললেন, –পাঁচদিনে মোট পঞ্চাশ টাকা। ডেলি একটা করে দশ টাকার নোট খামের ভেতর। ওপরে লেখা, উইশ ইউ গুড লাক। এ কী কাণ্ড বলুন তো স্যার? লোকে টাকার জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলছে। খুনখারাপি পর্যন্ত করছে। আর এমনি-এমনি রোজ সক্কালবেলা মেঝের ওপর দশ টাকার নোটভরা খাম!
-আজ বুঝি আর কোনও খাম পাননি?
প্রফেসর তানাচা মুখটা করুণ করে মাথা দোলালেন। আমি দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি হাবাকান্তের মতো। তারপর দেখি, কর্নেল হেলান দিয়ে বসে চোখদুটো বন্ধ করে টাকে হাত বুলোচ্ছেন। কয়েক সেকেন্ড পরে হঠাৎ চোখ খুলে বললেন, আপনার ঘর থেকে কিছু চুরি যায়নি তো?
চুরি?–প্রফেসর তানাচা একটু হাসলেন, আছেটা কী যে নেবে? মির্জাপুরের একটা মেসবাড়ির ছাদে ছোটো চিলেকোঠার মতো ঘরে থাকি। একটা ভাঙাচোরা তক্তপোশ–তার ওপর যেমন-তেমন একটা বিছানা পাতা। তলায় একটা সুটকেস। তার মধ্যে ছোটোখাটো ম্যাজিকের কিছু আসবাব আছে। আর আছে একটা কুঁজো আর জল খাওয়ার জন্য কাচের গেলাস। ব্যস, এই মোটে সম্বল। চোর নেবেটা কী?
–আপনি তো আফিংয়ের নেশা করেন?
প্রফেসর তানাচা হকচকিয়ে গেলেন প্রথমটা। পরে অপ্রস্তুত হেসে লাজুক ভঙ্গিতে বললেন, –অনিদ্রার রুগি। কী করি বলুন।
-দরজা খোলা রেখে ঘুমোন তো?
অনেকদিন বৃষ্টি নেই। যা গরম পড়েছে।
কিছু চুরি যায়নি বলছেন?
নাঃ। –প্রফেসর তানাচা জোরে মাথা নাড়লেন।
কর্নেল ওঁর মুখের দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, -ধরুন, কোনও তুচ্ছ জিনিস, অথবা আপনি এখনও খেয়াল করে দেখেননি এমন কিছু?
ষষ্ঠীচরণ এতক্ষণে কফি আনল। কর্নেল ফের বললেন, -কফি খেতে-খেতে ভাবুন। ভেবে বলুন প্রফেসর তানাচা!
