তিনি বুকপকেট থেকে ভাঁজ করা একটা পোস্টকার্ড বের করলেন, এটা আপনার ছোটোভাই সুরঞ্জনবাবুর লেখা।
রায়মশাই রুমালে চোখ মুছে বললেন, আপনাকে খুলে বলা উচিত। সুরঞ্জন আমার সভাই।
-জানি। সেবার এসে পিনাকীবাবুর কাছে আপনাদের পরিবারের অনেক কথা শুনেছিলুম। তাই গোড়া থেকেই আমার একটা চোখ ছিল সুরঞ্জনবাবুর দিকে। এবার দেখুন, এই পোস্টকার্ডের লেখা আর লাল ডটপেনে ছড়ার লেখার মধ্যে শুধু অক্ষরের ছোটো-বড়োর তফাত। কালই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলুম–তো সে-কথা থাক। এবার শুনুন! ছড়ার অর্থ আমি উদ্ধার করতে পেরেছি।
বলে কর্নেল মাথার ওপর কড়িকাঠ দেখালেন, –হিকরি ডিকরি ডক বললেই ঘড়ি বোঝায়। এবার নকড়ি ছকড়ি ক্লক। এই ঘরে গুনে দেখেছি নটা কড়িকাঠ আছে। সেটা হল নকড়ি। এবার ছকড়ি। গতরাত্রে আমি এটা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে বের করেছি। নটা কড়িকাঠ পর্যন্ত গিয়ে আবার ঘুরে ছটা কড়িকাঠ পর্যন্ত এলুম। কেমন তো? এবার ওই দেখুন একটা বেঁটে প্রকাণ্ড চৌকো ঘড়ি। ওদিক থেকে গুনলে ছটা কড়ির নিচে আর উলটোদিক থেকে গুনলে তিনটে কড়ির নিচে। নকড়ি ছকড়ি!
রায়মশাই বললেন, –কিন্তু ওটা তো অচল ঘড়ি। ওটার ভেতরে কিছু নেই।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, -এবার ছড়ায় আছে ধরোটি বারোটি পাক। লক্ষ করুন ঘড়ির মাথায় ইংরেজিতে পেতলের টি অক্ষর সাঁটা আছে। এই টেবিলটাই যথেষ্ট। হালদারমশাই! প্লিজ এটা ধরুন।
দুজনে ছোটো টেবিলটা ঘড়ির তলায় নিয়ে গেলেন। কর্নেল তাতে সাবধানে উঠে বললেন, –ধরোটি মানে টি অক্ষরটা ধরো। এই দেখুন, ধরলুম। মানে একটু চাপ দিলুম। দেখছেন? টি অক্ষরটা খাঁজ থেকে বেরিয়ে এল। এবার ছড়া বলছে, ধরোটি বারোটি পাক। তার মানে, টি ধরে বারোবার পাক দাও। দিচ্ছি। এক… দুই… তিন… চার…
কর্নেল বারো গোনার পরই কর শব্দ হল। তারপরই বেশ জোরে ঘণ্টা বাজতে থাকল। বারোবার ঘণ্টা বাজার সঙ্গে-সঙ্গে কর্নেল ঘড়িটা দেয়াল থেকে খুলে নামালেন। হালদারমশাই ধরলেন ঘড়িটা। অবাক হয়ে দেখলুম দেয়ালে একটা চৌকো ছোটো কপাটের মতো ইঞ্চি ছয়েক অংশ খুলে গেছে। কর্নেল বললেন, -বাইরে থেকে রংটা দেয়ালের রঙে মেশানো। কিন্তু এটা পাতলা একটা তামার পাত। ঘড়িটা বারোবার বাজলে সেই শব্দের ধাক্কায় পাতটা খুলে যায়। অর্থাৎ বাজিলে চিচিং ফাঁক। দেখা যাক, ভেতরে কী আছে। খোদলটাতে ঠাসা একটা জিনিস দেখতে পাচ্ছি।
কর্নেল ভেতর থেকে একটা কালো ছইঞ্চি লম্বা তিন ইঞ্চি চওড়া বাকসো বের করে টেবিল থেকে নামলেন। ঘড়িটা টেবিলে রেখে হালদারমশাই উত্তেজিতভাবে সোফায় কর্নেলের পাশে বসে পড়লেন। রায়মশাই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন।
বাকসোটার মাথা গালা দিয়ে সিল করা আছে। কর্নেল তার কিটব্যাগ থেকে একটা স্ক্রডাইভার বের করে সিলটা ছাড়ালেন। তারপর মাথাটা ধ্ৰু-ডাইভার ঢুকিয়ে ফাঁক করলেন। লাল, মখমলে মোড়া যে জিনিসটা এবার বেরুল, সেটা একটা চার ইঞ্চিটাক উঁচু ঝকঝকে সোনার মূর্তি। চোখ দুটো ঝলমল করে উঠল আলোয়। কর্নেল বললেন, এটার চোখ দুটো হিরের। ঠোঁটদুটো পদ্মরাগ মণির। জুতোর সোনায় পান্না খচিত। আর মাথার মুকুটে এই উজ্জ্বল ধাতুটি সম্ভবত মরকতমণি। ডানাদুটোও সোনার। রায়মশাই! এই মূর্তি এদেশি নয়। এটি গ্রিক দেবতা কিউপিডের মূর্তি।
রায়মশাই বললেন, -হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমার ঠাকুরদার ঠাকুরদা নাকি ইউরোপে প্রায়ই বেড়াতে যেতেন। তার নানা দেশে বন্ধু ছিলেন। ঘরে ওই যে সব বিদেশি ভাস্কর্য দেখছেন, ওগুলো তারই সংগৃহীত। কিন্তু কী আশ্চর্য! ঠাকুরদা কেন আমাদের কথাটা খুলে বলেননি? বাবাকেও বলেননি।
কর্নেল বললেন, –সম্ভবত আপনার ঠাকুরদাকেও তার ঠাকুরদা শুধু ছড়াটাই শিখিয়েছিলেন। তাই আপনার ঠাকুরদা খুলে বলতে পারেননি। ভেবেছিলেন, বংশের কেউ-না-কেউ একদিন ছড়াটার অর্থ খুঁজে বের করবে।
হালদারমশাই বললেন, আমাদের এই কর্নেলস্যারের ব্রেন-বুঝলেন রায়মশায়? এক্কেরে ভগবানের নিজের হাতে তৈরি। ওহ! আমাগো মাথা ব্যাবাক গুলাইয়া যায়। কী য্যান ছড়াটা?
কর্নেল আওড়ালেন :
হিকরি ডিকরি ডক
নকড়ি ছকড়ি ক্লক
ধরোটি বারোটি পাক
বাজিলে চিচিং ফাঁক
তারপর বললেন, –রায়মশাই! এবার মূর্তিটা আগের মতো গর্তে ঢুকিয়ে রেখে ঘড়িটা তার ওপর টাঙিয়ে রাখা যাক। কী বলেন?
–নিশ্চয়ই। এ গোপন রহস্য আমি জেনে রাখলুম। এই যথেষ্ট।
ঘড়িটা আগের মতো অচল হয়ে টাঙানো রইল। কর্নেল ও হালদারমশাই টেবিলটা সরিয়ে আনলেন। তারপর রায়মশাই বললেন, -পিনাকীদাকে ডেকে কফি বলে আসি।
তিনি বেরিয়ে যাওয়ার পরই কালকের মতো সারা ঘর জুড়ে সেতারের মতো ঝংকার শোনা গেল এবং তারপর দশবার নানা সুরে মিঠে-কোমল ঘণ্টা বাজতে থাকল। হালদারমশাইয়ের চোখ গুলিগুলি এবং গোঁফ উত্তেজনায় তিরতির করে কাঁপতে থাকল। কিছুক্ষণ যেন এক জাদুকরের তৈরি মায়াজগতের মধ্যে আচ্ছন্ন হয়ে বসে রইলুম। কালকের মতো খুদে পাখির ঠোঁটের ঠোকর বা খুদে সায়েবের সিঁড়ি বেয়ে নেমে হাতুড়ি দিয়ে ঘন্টি বাজানো লক্ষ করতে ভুলেই গেলুম।
২.১৭ অলক্ষ্মীর গয়না
০১.
সম্প্রতি কোনও রহস্যময় কারণে কর্নেল নীলাদ্রি সরকার ভারত মহাসাগরের টোরা আইল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সেখানে নাকি রাত-বিরেতে এক আজব প্রাণী চরে বেড়ায়। তার মুখটা ঘোড়ার, ধড়টা মানুষের–এক কথায় ঘোড়ামানুষ বলা যায়। সেই দারুণ রোমাঞ্চকর গল্প খুব মন দিয়ে শুনছিলুম আর ভাবছিলুম, আমাদের পৌরাণিক বৃত্তান্তে যে হয়গ্রীব অবতারের বৃত্তান্ত আছে, টোরা দ্বীপের ঘোড়ামানুষরা তারই বংশধর নয় তো! এমন সময় ষষ্ঠীচরণ এসে কর্নেলের হাতে একটা কার্ড দিয়ে বলল, -একজন ভদ্রলোক এয়েছেন বাবামশাই!
