রায়মশাই উত্তেজিতভাবে বললেন, –কেন বলব না? তুমি যখন-তখন এসে পূর্বপুরুষের লুকোনো কী মাথামুন্ডু সম্পদ দাবি করবে, যা কোথায় আছে আমি আজও জানি না।
সুরঞ্জনবাবু বললেন, -বাইরের লোকের সঙ্গে এসব আলোচনা আমি পছন্দ করি না।
-এটা আর ঘরের ব্যাপার হয়ে নেই সুরঞ্জন! কে আমাকে এবং তোমাকেও হুমকি দিয়ে চিঠি লিখছে। একখানা চিঠি পেয়েই তুমি মাথাখারাপ করে দৌড়ে এসেছ। আর আমি পেয়েছি পাঁচখানা চিঠি।
কর্নেল বললেন, –আচ্ছা রায়মশাই, একটা কথা জিগ্যেস করি। ধরা যাক, সত্যিই এ বাড়িতে কোথাও আপনাদের পূর্বপুরুষের মূল্যবান সম্পদ লোকানো আছে। তার অংশ তো সুরঞ্জনবাবুরও প্রাপ!
রায়মশাই আরও উত্তেজিত হয়ে বললেন, -সুরঞ্জনকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য আমি যা দিয়েছি, তা অনেক। আমার সম্বল বলতে শুধু এই বাড়ি আর স্বোপার্জিত টাকা ব্যাঙ্কে রেখে মাসিক হাজার তিনেক টাকা সুদ। এ বাজারে কষ্টেসিষ্টে চালাতে হয়। তাছাড়া পুঁটুকে আমি তাড়িয়ে দেব। আমার মৃত্যুর পর তো সুরঞ্জনই সব পাবে।
সুরঞ্জনবাবু বললেন, এটা কিন্তু ঠিক বললে না দাদা! আমার কানে এসেছে, তুমি তোমার সব সম্পত্তি একটা আশ্রমের নামে উইল করে রেখেছে।
-সেই উইল বাতিল করা বা না করা নির্ভর করছে তোমার আচরণের ওপর। বারবার এসে তুমি আমাকে উত্ত্যক্ত করে যাচ্ছ।
এই সময় টেলিফোন বেজে উঠল। রায়মশাই গিয়ে রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন, –কে?…হা! কর্নেলসায়েব এখানে আছেন। …হ্যাঁ, ধরুন। দিচ্ছি।
কর্নেল বললেন, -কে থানার ও.সি.।
কর্নেল ফোনে শুধু অনবরত হা, হঁ বলে গেলেন। তারপর টেলিফোন রেখে আগের জায়গায় বসলেন।
সুরঞ্জনবাবু ঘড়ি দেখে বললেন, -আমি উঠছি। যদি আমার বরাতে খারাপ কিছু ঘটে যায়, তুমিই কিন্তু দায়ী হবে দাদা!
কর্নেল বললেন, -প্লিজ একটু বসুন সুরঞ্জনবাবু! আমার কয়েকটা কথা আছে।
-কী বিষয়ে?
–আপনি কীসের ব্যবসা করেন?
ইলেকট্রিক্যাল সরঞ্জামের। মডার্ন সবরকম গ্যাজেট–কম্পিউটারও বিক্রি করি। —
পানাগড়ে কি আপনার কোনও ব্রাঞ্চ আছে?,
–আছে। বর্ধমানেও আছে।
–আপনি ভূতনাথ হাজরা নামে কাউকে চেনেন?
সুরঞ্জনবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, -নাহ। কেন?
–আসার পথে ওই নামের এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তারও
বলে কর্নেল চুরুট ধরালেন, -যাকগে! আপনার কেন ধারণা যে ঠাকুরদার শেখানো ছড়ার মধ্যে কোনও গোপন সম্পদের সূত্র আছে?
–থাকতে বাধ্য। ছোটোবেলায় বুঝিনি। এখন বুঝতে পেরেছি।
–ছড়াটা আপনার মুখস্থ তো?
–আলবাত মুখস্থ।
–বলুন তো, শোনা যাক।
সুরঞ্জনবাবু খাপ্পা হয়ে বললেন, আপনি দাদার বন্ধু। রিটায়ার্ড সামরিক অফিসার। আপনাকে আমি বছর পাঁচেক আগে এ বাড়িতে আসতে দেখেছিলুম। আপনার পরিচয় আমি ভালোই জানি। আপনার উদ্দেশ্য কী আগে বলুন তো?
–ছড়ার কথাগুলো আপনার দাদার মুখে শুনেছি। আপনার মুখেও শুনতে চাই। কারণ আমার যেন ধারণা, ছড়াটা উচ্চারণের মধ্যে যে মূল ছন্দ আছে, তা সঠিক উচ্চারিত হলে সম্ভবত ধাঁধাটার সুত্র মিলতে পারে।
সুরঞ্জনবাবু আওড়ালেন :
হিকরি ডিকরি ডক
নকড়ি ছকড়ি ক্লক
ধরোটি বারোটি পাক
বাজিলে চিচিং ফাঁক
কর্নেল বললেন, -নাহ। একই ছন্দ।
এই সময় বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। রায়মশাই বারান্দায় গেলেন। তার একটু পরে ও.সি. দীপক ভদ্র, আর একজন পুলিশ অফিসার এবং দুজন তাগড়াই চেহারার কনস্টেবলকে বারান্দায় দেখা গেল। রায়মশাই বললেন, -কী ব্যাপার দীপকবাবু?
–আপনার অনুমতি নিয়ে ঘরে ঢুকতে চাই।
–কেন বলুন তো?
কারণ আছে। কর্তব্যে বাধা দেবেন না প্লিজ!-ও.সি. দীপক ভদ্র ঘরে ঢুকে সোজা সুরঞ্জনবাবুর কাছে গিয়ে বললেন : আপনি আমাদের সঙ্গে আসুন সুরঞ্জনবাবু।
সুরঞ্জনবাবু বললেন, -তার মানে? কোথায় যাব আমি?
থানায়। সুরঞ্জনবাবু! নিজের দাদার বিরুদ্ধে পানাগড়ে আপনার ব্রাঞ্চ অফিসের ম্যানেজার কালীনাথ রায়চৌধুরির সঙ্গে গোপন চক্রান্ত এবং ঘড়ি চুরিতে প্ররোচনা দেওয়ার জন্য আপনাকে গ্রেফতার করতে বাধ্য হলুম। আসুন।
রায়মশাই হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সুরঞ্জনবাবু মুখ নিচু করে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, –নিচে আমার গাড়ি আছে।
দীপকবাবু বললেন, –গাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের লোক আছে। আপনার গাড়িও আমাদের আটক করতে হচ্ছে। কারণ আপনার মারুতির ডিকিতে নিষিদ্ধ মাদক আছে। সে খবর আমাদের সোর্স থেকে অলরেডি জেনে গেছি।
কর্নেল বললেন, -পুঁটুবাবু আর রাজুকে সুরঞ্জনবাবুই হেরোইন জোগাতেন!
ও.সি. হাসলেন, -ঠিক ধরেছেন। পুঁটুবাবু আর রাজু এবার পিটুনি খেয়ে সব কবুল করেছে। গত সপ্তাহে ঘড়িচুরির ব্যাপারে ওদের জেরা করলেও রায়মশাইয়ের খাতিরে পিটুনি দেওয়া হয়নি।
সুরঞ্জনবাবুর কাঁধে হাত রেখে দীপক ভদ্র বেরিয়ে গেলেন। রায়মশাই দু-হাতে মুখ ঢেকে কান্নাজড়ানো গলায় বলে উঠলেন, -সুরঞ্জন! তোর মনে এই ছিল? তুই এত লোভী?
কর্নেল বললেন, রায়মশাই! শান্ত হয়ে বসুন! হালদারমশাই! আপনি নিচের সিঁড়ির দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিয়ে আসুন।
হালদারমশাই ঝটপট বেরিয়ে গেলেন এবং দু-মিনিটের মধ্যে ফিরে এলেন।
কর্নেল বললেন, -কাল সকালে যখন আপনার ঘরে এলুম, তখন ফ্যানের হাওয়ায় এই পোস্টকার্ডটা এই টেবিল থেকে আমার পায়ের কাছে উড়ে এসে পড়েছিল।
