–নাহ। আর যাওয়ার দরকার দেখছি না। কালীনাথের ব্যাকগ্রাউন্ড-পুলিশের কাছে পাওয়া যাবে।
বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। চুরুট অ্যাশট্রেতে ঘষে নিভিয়ে দরজা এঁটে দিলেন। তারপর বাথরুমে ঢুকলেন। পোশাক বদলে রাতের পোশাক পরে তিনি টেবিলের সামনে বসলেন। টেবিলল্যাম্প জ্বেলে সেই চিঠিগুলো কিটব্যাগ থেকে বের করে বললেন, –জয়ন্ত! তুমি আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ো। আমি এগারোটায় সোব। তার আগে আমার ঘুম আসে না তা তো জানো!
সকাল সাতটায় সুখরাম বেড-টি এনে আমাকে ডাকছিল। উঠে বসে দেখলুম, বাইরে রোদ ঝলমল করছে। কর্নেল অভ্যাসমতো প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছেন। সুখরাম মুচকি হেসে বলল, -সিধুদাদা এখনই বাজারমে চলিয়ে গেল। কাহে কী, পুলিশ কোন-কোন আদমিকে পাকড়াল, খবর লিবে।
– তোমার কী মনে হয় সুখরাম?
–সার! সব চোরি-ডাকাতিকি পিছে বাড়ির কোই-না কোই আদমি থাকে। ওহি পুঁটুবাবু, হারামি লড়কা রাজু দোনো পাকাড় যাবে। পুলিশ তাদের ছাড়বে না, দেখে লিবেন।
আটটায় ইসমাইল গাড়ি আনল। তখন হালদারমশাইয়ের কথা মনে পড়ল। পাশের ঘরের দরজায় তালা আঁটা। সুখরামকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, -উনহিভি কর্নেলসাবের সঙ্গেতে চলিয়ে গেছেন।
ইসমাইল পোর্টিকোর তলায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে হুমড়ি খেয়ে গাড়ির তলায় কিছু দেখছিল। এবার সে উঠে দাঁড়াল। আমাকে সেলাম দিয়ে বলল, –দেরি হইয়ে গেল সার! গাড়ির সাইলেন্সর পাইপ টুটে আওয়াজ হচ্ছিল। গ্যারিজে ঝালাই করিয়ে আনতে হল। কর্নেলসাবকে দেখছি না?
বললুম, পানাগড় যাচ্ছেন না উনি। তাই বেড়াতে বেরিয়েছেন।
ইসমাইল খৈনি বের করে ডলতে-ডলতে বাংলোর পেছনে সুখরামের সঙ্গে গল্প করতে গেল। কিছুক্ষণ পরে দেখলুম, সিদ্ধেশ্বর বাজার করে ফিরছে। টিলার চড়াইটুকু তাকে নেমে সাইকেল ঠেলে আনতে হচ্ছে।
লনে ঢুকে সে একগাল হেসে বলল, রায়মশাই ঘরে চোর পুষছিলেন। তাঁর আদরের পুঁটুবাবু আর রাজুকে পুলিশ শেষরাত্রে ধরে নিয়ে গেছে। কর্নেল সায়েব আর হালদারসায়েবের সঙ্গে পথে দেখা হল। কর্নেলসায়েব দুটো অর্কিডের চারা পেয়েছেন। বললেন, ফিরে এসে ব্রেকফাস্ট করে বেরুবেন আবার।
আরও আধঘন্টা পরে দেখলুম দুই রহস্যভেদী কথা বলতে-বলতে ফিরে আসছেন। কর্নেলের হাতে প্লাস্টিকের থলেয় ভরা মাটিসুদ্ধ অর্কিডের চারা। আর হালদারমশাইয়ের হাতে কর্নেলের চপ্পল। তার পায়ে এখন নিজের জুতো। বুঝুলুম, জুতো উদ্ধারের জন্যই গোয়েন্দামশাই কর্নেলের সঙ্গী হয়েছিলেন।
লনে এসে হালদারমশাই সহাস্যে বললেন, –জুতা ভেজে নাই। ঝোপের মধ্যিখানে পাতা চাপাইয়া রাখছিলাম।
বললুম, -কর্নেল! পুঁটু আর রাজুকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে। সিদ্ধেশ্বর বলল।
কর্নেল বললেন, -রায়মশাই মনে কষ্ট পাবেন। তাকে সান্ত্বনা দিতে ব্রেকফাস্ট করেই বেরুব।
ব্রেকফাস্ট করে আমরা তিনজনে বেরোলুম। ইসমাইল কর্নেলের নির্দেশে জমিদারবাড়ির দিকে গাড়ি ছোটাল। কালকের মতোই হর্ন শুনে সেই পিনাকীবাবু গেট খুলে দিলেন। তিনি গম্ভীরমুখে বলতে-বলতে এলেন, -পুঁটুবাবু আর রাজুকে পুলিশ শেষরাতে ধরে নিয়ে গেছে। এদিকে ছোট রায়মশাই এই মাত্র দুর্গাপুর থেকে এলেন। সদু দুই ভায়ের পায়ে ধরে কান্নাকাটি করছিল। কাঁদলে কী হবে? ওই ছেলের জন্য ওর কপালে কত ভোগান্তি আছে।
পোর্টিকোর তলায় একটা জিপসি মারুতি দেখতে পেলুম। ইসমাইল একটু তফাতে গাড়ি দাঁড় করাল। পিনাকীবাবু চেঁচিয়ে বললেন, -ওগো মনো! ও রায়বাবু! কর্নেলসায়েবরা এসেছেন।
রায়মশাই নিচের সিঁড়ির দরজা আটকে রেখে ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলছিলেন। নেমে এসে গম্ভীরমুখে বললেন, -আসুন! দরজা খোলা থাক।
দোতলার বারান্দায় উঠে তিনি বললেন, -কিছুক্ষণ আগে দুর্গাপুর থেকে সুরঞ্জন এসেছে। এবার তাকেও ছড়াটা লিখে কেউ হুমকি দিচ্ছে। একই হাতের লেখা।
কর্নেল বারান্দাতেই তার সঙ্গে হালদারমশাইয়ের আলাপ করিয়ে দিলেন। ঘরের ভেতর সোফায় চল্লিশ-বেয়াল্লিশ বছরবয়সি এক ভদ্রলোক বসেছিলেন। তার চেহারার সঙ্গে মনোরঞ্জনবাবু অর্থাৎ রায়মশাইয়ের তত মিল নেই। রায়মশাই তার সঙ্গে আমাদের আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, -সুখরঞ্জন। চিঠিটা কর্নেলসায়েবকে দেখাও।
সুরঞ্জনবাবু বুকপকেট থেকে খামে ভরা চিঠি বের করে কর্নেলকে দিলেন। কর্নেল চিঠিতে চোখ বুলিয়ে বললেন, -হ্যাঁ। একই হস্তাক্ষর। যাই হোক রায়মশাই! তাহলে দেখা যাচ্ছে শনিবার সন্ধ্যায় পুঁটুবাবুই আপনার খাটের তলায় লুকিয়ে ছিলেন। তিনি ভালোই জানেন, আপনি ঘুমের ওষুধ খান। রায়মশাই বললেন, -পুঁটুকে আমি আর এ বাড়ি ঢুকতে দেব না। সদুকে বলে দিয়েছি, যতই কান্নাকাটি করো, তোমার ছেলেকে এ বাড়ি ঢুকতে দেব না। তাতে তুমি চলে যাও তো যাও।
হঠাৎ কর্নেল বলে উঠলেন, –আচ্ছা সুরঞ্জনবাবু, পৈতৃক সম্পত্তিতে তো আপনারও অধিকার আছে। আপনি ঘড়ির ভাগ কেন নেননি?
সুরঞ্জনবাবু হঠাৎ এই প্রশ্নে যেন হকচকিয়ে উঠেছিলেন। আস্তে বললেন, -আমি ঘড়ি নিয়ে কী করব? আমি নিজের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত।
-রায়মশাই বললেন, তাহলে খুলে বলি। সুরঞ্জনকে ঘড়ি আমি দিইনি। তার বদলে আমার নিজের লাগানো এক একর জমির শালগাছ বিক্রি করে দেড়লাখ টাকা ওকে দিয়েছিলাম।
সুরঞ্জনবাবু বললেন, আহ দাদা! এসব পারিবারিক কথা কেন তুমি
