কর্নেল চুরুটের ধোঁয়ার মধ্যে বললেন, -কিন্তু হিকরি ডিকরি ডক এবার দেখছি আমাকে গণ্ডগোলে ফেলে দিল।
-কেন বলুন তো?
–তখন রায়মশাইকে বলছিলুম, ঘড়ি চোর আর এই ছড়া লিখে পাঠানো লোক, যে টেলিফোনে আড়িপাতা যন্ত্র বসিয়েছিল, তারা আলাদা। এখন দেখছি, সেই ভূতনাথ অর্থাৎ পানাগড়ের ব্যবসায়ী কালীনাথ চোরাই ঘড়ি কিনেছে এবং সে-ই কিনা আমাকে ময়ূরগড়ে আসতে দু-দুবার বাধা দিয়েছিল। তার মানে সে জানত আমি ময়ূরগড়ে আসছি। এ-ও জানত, আমি কে। অতএব আড়িপাতা যন্ত্রে সে রায়মশাইয়ের আমাকে ট্রাংকল করা শুনেছিল। শোনার পরই কলকাতা ছুটে গিয়েছিল। তা-ই মনে হয় না?
-হ্যাঁ। কলকাতা থেকে সে তার চেলাকে নিয়ে আমাদের ফলো করেছিল, এটা তো স্পষ্ট।
কর্নেল চোখ বুজে হেলান দিয়ে বসে চুরুট টানতে থাকলেন। বুঝলুম, রহস্যভেদী রহস্যের সুড়ঙ্গে ঢুকে অন্ধকারে পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। একটু পরে তিনি চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলেন। বললেন, -নাহ জয়ন্ত! আমার থিয়োরি ঠিক। ছড়া লিখে যে হুমকি দিচ্ছে, সে দ্বিতীয় লোক। ভূতনাথ ওরফে কালীনাথের অগোচরে সে তাকে কাজে লাগিয়েছে। কালীনাথ- আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তার টোপ গিলেছে। অ্যান্টিক ঘড়ি বেচে সে প্রচুর টাকা কামাবে। কিন্তু কালীনাথ ছড়া-রহস্য জানে না।
হালদারমশাই তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। একটিপ নস্যি নিলেন। নস্যির কৌটো তার ব্যাগে ছিল। উত্তেজনায় তার গোঁফ তিরতির করে কাঁপছিল।
থানা থেকে পুলিশের জিপ এসে ঢুকল, তখন প্রায় সাতটা বাজে। একজন পুলিশ অফিসার নেমে এসে কর্নেলকে সহাস্যে নমস্কার করে বললেন, নমস্কার স্যার! আমি ও. সি. দীপক ভদ্র। কাল রাত্রেই বর্ধমান থেকে এই রেঞ্জের ডি. আই. জি. মিঃ অরবিন্দ বোস আপনার আগমনের কথা আমাকে জানিয়েছিলেন। আমার বড় সৌভাগ্য, এতদিনে আপনাকে চর্মচক্ষে দর্শন করলুম।
কর্নেল বললেন, একটু দেরি হয়ে গেছে। তবু যদি আপনার পক্ষে সম্ভব হয়, ঘড়ি-চোরদের ধরা যাবে। সাড়ে সাতটা নাগাদ ওদের গাড়ি আসবে ওই খনি এলাকার কাছাকাছি। এই ঘড়িগুলো নিয়ে যেতেই তারা আসবে। কাজেই কোনও গাড়ি ওই এলাকায় দেখলেই।
কর্নেলের কথার ওপর দীপক ভদ্র বললেন, -নো প্রবলেম স্যার! আমার কাছে সেলুলার ফোন আছে। এই ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়ার অপরাধ দমনের জন্য সরকার আমাদের আধুনিক সরঞ্জাম দিয়েছেন। আমি আমার উপযুক্ত সহকর্মীকে এখনই জানিয়ে দিচ্ছি।
ও. সি. বারান্দার একপ্রান্তে গিয়ে পকেট থেকে সেলুলার ফোন বের করে তার খুদে অ্যান্টেনা টানলেন এবং বোম টিপে চাপাস্বরে কাউকে কিছু নির্দেশ দিলেন। তারপর ঘরে ঢুকে ঘড়িগুলো দেখে বললেন, -এ যে লক্ষ-লক্ষ টাকার ঘড়ি কর্নেলসায়েব! এ সব অ্যান্টিক ঘড়ি চোরাপথে বিদেশে চালান যায়। কী করে এগুলো উদ্ধার করলেন?
কর্নেল বললেন, আমি উদ্ধার করলেও এগুলোর খোঁজ পেয়েছিলুম এই ভদ্রলোকের কাছে। ইনি প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে, কে, হালদার। আমাদের প্রিয় হালদারমশাই।
হালদারমশাই সুযোগ পেয়ে ক্ষোভে বললেন, -থানায় প্রথমে গিয়েছিলাম। আপনারা আমারে পাত্তা দ্যান নাই।
ও. সি. দীপক রুদ্র জিভ কেটে সহাস্যে বললেন, -ভেরি সরি মিঃ হালদার! আসলে আমাদের কাজে প্রাইভেট ডিটেকটিভদের ঢুকতে দেওয়ার রিস্ক আছে। কে কোন ছলে ঢোকে। যাই হোক, আমি এজন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
হালদারমশাই তখন খুশি হয়ে বললেন, -মশয়! চৌতিরিশ বৎসর আমি পুলিশে চাকরি করছি। ইন্সপেক্টর হইয়া রিটায়ার করছিলাম। তো এখনও শরীর ফিট আছে। তাই প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলোম।
দীপক ভদ্র বললেন, কী কাণ্ড! সব কথা আপনার খুলে বলা উচিত ছিল।
কর্নেল হাসলেন, -ঘড়ি উদ্ধার কাহিনি আগে শুনুন দীপকবাবু! তাহলে বুঝবেন হালদারমশাই কী সাংঘাতিক অবস্থায় পড়েছিলেন।
বলে তিনি হালদারমশাইয়ের সব ঘটনা ও. সি.-কে শোনালেন। এই সময় তার সেলুলার ফোন বিবি শব্দ করতে থাকল। তিনি দ্রুত অ্যান্টেনা টেনে সাড়া দিলেন। তারপর বললেন, -ওকে শ্যামলবাবু! ওয়েলডান!… দুজন? …ও! বুঝেছি, এ সেই কুখ্যাতমস্তান ছোকরা ছোটু… গাড়ি আটক করে থানায় নিয়ে যান। … পানাগড়ের ব্যবসায়ীটিকে জেরা করা দরকার। এই এলাকা থেকে অনেক অ্যান্টিক মূর্তি চুরির কেস আছে। বোধ করি, ইনিই তিনি। … হ্যাঁ। আমি ঘড়িগুলো নিয়ে এখনই বেরুচ্ছি। ওভার।
.
গ্রিক দেবতা কিউপিড
এ রাতে হালদারমশাইকে সুখরাম পাশের ঘরে শোওয়ার ব্যবস্থা করে দিল। খাওয়ার পর কর্নেল তাকে জোর করে শুতে পাঠালেন। বললেন, -আপনার ঘুম দরকার হালদারমশাই! তাহলে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করতে পারবেন। অবশ্য আর আপনার তত চিন্তাভাবনার দরকার নেই। শুধু প্রয়োজনে আমাকে সাহায্য করবেন। মূল রহস্য এখনও ফাঁস করা যায়নি, তা তো বললুম আপনাকে। হা- দরজা বন্ধ করতে ভুলবেন না যেন।
রাত সওয়া দশটা বাজে। আজ রাতেও ঝমঝমিয়ে এতক্ষণে বৃষ্টি নামল। কর্নেল চেয়ারে বসে মুখে জ্বলন্ত চুরুটসহ বললেন, -কী অদ্ভুত ধাঁধা! জয়ন্ত, তুমিও জট ছাড়ানোর চেষ্টা করো!
হিকরি ডিকরি ডক
নকড়ি ছকড়ি ক্লক
ধরোটি বারোটি পাক
বাজিলে চিচিং ফাঁক
বললুম, –এ হিং টিং ছট বোঝার চেষ্টা আমি করব না। আপনিই করুন। তো কাল সকালে কি পানাগড় যাবেন?
