ফো বলছিল, -কাল্লু-গুল্লু ভিতুর ভিতু! ওরা বলেছে, আর আমাকে সাহায্য করতে পারবে না। গতরাতে তারা নাকি গুলি খেতে-খেতে বেঁচে গেছে।
-তাহলে এক কাজ করুন। সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ গাড়িটা যতটা সম্ভব কাছাকাছি এনে রাখুন। আমরা দুজনে কিছু কিছু করে বয়ে নিয়ে যাব।
–ঠিক বলেছ ছোট্টু। ওখানে আবার ওরা দুজনে লুকিয়ে নেশা করতে আসে। ওরা সন্ধ্যার আগেই চলে যাবে। তখন আর অসুবিধে নেই।
এই অভিজ্ঞতার কথা বলে গোয়েন্দাপ্রবর হঠাৎ নড়ে বসলেন, -হঃ! জুতার কথা মনে পড়ছে। জুতাজোড়া ঝোপের মইধ্যে লুকাইয়া রাখছিলাম।
কর্নেল চুরুট টানতে টানতে মন দিয়ে কথাগুলি শুনছিলেন। ঘড়ি দেখে বললেন, -তাহলে আমাদের সন্ধ্যা ছটায় বেরুতে হবে। বৃষ্টি-বাদলা যা-ই হোক রায়মশাইয়ের চুরি যাওয়া অ্যান্টিক ঘড়িগুলো কোথায় লুকানো আছে বুঝতে পেরেছি।
বললুম, -পুলিশকে খবর দিলে ভালো হতো না?
সময় নেই। -বলে কর্নেল বারান্দায় গিয়ে আকাশ দেখলেন। তারপর বাইনোকুলারে পোড়োখনির এলাকা দেখতে থাকলেন।
তারপর ঘরে ঢুকে বললেন, -বরং চোরের ওপর বাটপাড়ি করা যাক। হালদারমশাই! আপনি বরং বিশ্রাম করুন। আমরা এখনই বেরুচ্ছি।
-গোয়েন্দাপ্রবর তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন, -আমিও যামু। জুতা! আমার জুতাজোড়া!
–পারবেন তো হাঁটতে?
–কর্নেলস্যার কী যে কন! চৌতিরিশ বৎসর পুলিশ লাইফের এক্সপিরিয়েন্স!
সুখরামকে ঘরে তালা এঁটে রাখতে বলে কর্নেল বেরুলেন। তার পেছনে উত্তেজিত হালদারমশাই এবং তার পেছনে আমি। আগে যে পথে গিয়েছিলুম, সেই পথে হেঁটে চললুম আমরা।
আধঘন্টা পরে কর্নেল যেখানে থমকে দাঁড়ালেন, সেখানে বৃষ্টির জন্য মাথা বাঁচাতে আমরা গুহা অর্থাৎ পোড়োখনিমুখে ঢুকেছিলুম। সাপটার কথা মনে পড়ে গা-ছমছম করছিল। কিন্তু কর্নেল চারদিক বাইনোকুলারে দেখে নিয়ে গুহার ভেতর টর্চ জ্বেলে ঢুকলেন। তারপর আস্তে বললেন, -যে গর্ত থেকে সাপটা উঠেছিল, সম্ভবত সেই গর্তে ঘড়িগুলো আছে।
তিনি টর্চ জ্বেলে সেই প্রকাণ্ড গর্তের ভেতর আলো ফেললেন এবং লাফ দিয়ে নামলেন। গর্তটা যে ছফুটের বেশি নয় তা কর্নেলের মাথার মাপে বোঝা গেল। তিনি বললেন, -বস্তায় ভরা আছে। এই বস্তাটাকে জড়িয়ে সম্ভবত সাপটা শুয়ে ছিল। এটাই সাপটার ডেরা। হালদারমশাই! জয়ন্ত! আমি বস্তাটা তুলে ধরছি। আপনারা নিঃশব্দে টেনে নেবেন। তারপর জয়ন্ত তুমি গুহার বাইরে গিয়ে লক্ষ রাখবে।
তিনি দু-হাতে ঘড়ি বোঝই বস্তাটা তুলে ধরলেন। ছটা ঘড়ি বেশ ওজনদার। বস্তাটা ওপরে তোলার পর আমি বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম। রিভলভার হাতে নিয়ে লক্ষ রাখলুম।
একটু পরে দেখি, হালদারমশাই কুঁজো হয়ে বস্তাটা কাঁধ থেকে পিঠে ঝুলিয়ে বেরিয়ে আসছেন।
ফেরার পথে তিনি বস্তাটা কর্নেল বা আমাকে বইতে দিলেন না। প্রাক্তন পুলিশ ইন্সপেক্টরের পেটাই ট্রেনিংপ্রাপ্ত শরীর। পথে শুধু বার দুই কাধবদল করলেন এই যা।
বাংলোয় ফিরে দেখি, সুখরাম অবাকচোখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমাদের দেখছে। বাংলোর গেটে উঠতে কিন্তু হালদারমশাই এবার হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। বললেন, -খালি টিকটিক কড়া-কড়া শব্দ হয় ক্যান?
বস্তাটা সুখরাম এসে তার কাছ থেকে নিয়ে বলল, -ইয়ে কৌন চিজ আছে কর্নেলসাব?
কর্নেল বললেন, -কাউকে যেন বোলো না সুখরাম। তোমার চাকরি চলে যাবে। এ হল জমিদারবাড়ির চোরাই ঘড়ি। গর্তে লুকিয়ে রেখেছিল চোর!
হায় রামজি! –বলে সুখরাম কপালে করাঘাত করল।
-তুমি সিদ্ধেশ্বরকে বলল, তিনকাপ কফি চাই।
–জি কর্নেলসাব!
কর্নেল ঘরের মেঝেয় বস্তার মুখ খুলে একটা করে নানা সাইজের ঘড়ি বের করলেন। ছটা ঘড়ি বের করে বললেন, -হালদারমশাই বলছিলেন, টিকটিক কড়া-কড়া শব্দ হচ্ছে কেন? সেকালের দক্ষ কারিগরের হাতে তৈরি সব বিদেশি ঘড়ি। ঝাঁকুনি খেয়ে কোনও-কোনওটা চালু হয়ে গিয়েছিল। দম ফুরিয়ে গেছে। তবু এত সূক্ষ্ম এগুলোর যন্ত্রপাতি যে নড়াচড়া করলেই কিছুক্ষণ চালু থাকে।
সিদ্ধেশ্বর কফির ট্রে এনে ঘড়িগুলি দেখেই মাতৃভাষায় বলে উঠল, –হা জগড়নাথঃ!
কর্নেল বললেন, -সিদ্ধেশ্বর! তোমাকে একটু কষ্ট করতে হবে।
উত্তেজিত সিদ্ধেশ্বর বলল, –বলুন সার!
–তুমি এখনই সাইকেলে চেপে থানায় যাও। আমার এই কার্ডটা ও. সি. বা কোনও অফিসারকে দেখিয়ে শুধু বলবে, ইনি জমিদারবাড়ির হারানো ঘড়ি উদ্ধার করেছেন। আপনারা এখনই আসুন। আর বলবে, ওঁরা যেন টেলিফোনে কথাটা রায়মশাইকে অবশ্যই জানিয়ে দিয়ে এখানে চলে আসেন।
সিদ্ধেশ্বর তখনই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেল।
কর্নেল সহাস্যে বললেন, -ঘড়িগুলো উদ্ধারে আমার কোনও কৃতিত্ব নেই। সব কৃতিত্ব আমাদের প্রিয় হালদারমশাইয়ের।
গোয়েন্দাপ্রবর কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, -কিন্তু আমার জুতা? ঘড়ি জুতার কথা ভুলাইয়া দিল।
–জুতো কাল সকালে গিয়ে উদ্ধার করবেন।
–কিন্তু যারে টাকা দিতে দেখছি, সেই ছ্যামড়াটা কে?
কর্নেল হাসলেন, -তাকে যথাসময়ে দেখতে পাবেন।
বললুম, -ভুতনাথ কেন এতদিন পরে টাকা দিল তাকে?
–সম্ভবত কিস্তিতে দিচ্ছে। তবে যথাসময়ে এসব কথা জানা যাবে।
–আচ্ছা কর্নেল, ওই যুবকটি পুঁটু নয় তো?
–আবার কে হতে পারে? সঙ্গে বোধ করি রাজও আছে। দুজনেই হেরোইন খায়।
বললুম, –ঠিক বলেছেন। সুখরাম দুজনকে ওই এলাকায় দেখেছিল।
