তার মুখে টেপ সাঁটা ছিল। কর্নেল টেপ খুলে ফেলতেই তিনি উঁহু হু হু আর্তনাদ করলেন। সত্যিকার গোঁফের সঙ্গে টেপ আটকানো ছিল। কর্নেল বললেন, –উঠে পড়ুন হালদারমশাই।
হালদারমশাই অতিকষ্টে উঠে বসে বললেন, -স্বপ্ন? না সত্য?
সত্য হালদারমশাই!
প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার বললেন, -বুঝি না ক্যান যে দুই হালায় আচমকা আমারে বাঁধল? কইলাম, আমি সন্ন্যাসী। আমারে বান্ধো ক্যান? ওহ!
–আপনি বটতলায় ধুনি জ্বালিয়ে বসেছিলেন, তা বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু ওখানে কেন বসেছিলেন?
–সব কমু। আমারে জল খাওয়ান। আর বটের গুঁড়ির ওপর আমার ব্যাগ লুকানো আছে। তাতে আমার জামাপ্যান্ট আছে। চলেন, পোশাক পরব।
জলের বোতল কর্নেলের কিটব্যাগে ছিল! জল খেয়ে অতিকষ্টে হালদারমশাই আমাদের সঙ্গে বেরুলেন। তারপর ঢিবিতে উঠে বটতলায় গিয়ে লম্বা হাত বাড়িয়ে খুঁড়ির ওপরদিক থেকে কিটব্যাগ পেড়ে নিলেন।
জিজ্ঞেস করলুম, –আপনার রিভলভার ছিল। সেটা ব্যবহার করেননি কেন?
হালদারমশাই গেরুয়া কাপড়টুকু ফেলে দিয়ে প্যান্ট-শার্ট পরতে পরতে বললেন, -হাতের কাছে রাখি নাই জয়ন্তবাবু! আমি ভাবি নাই দুই শয়তান আচমকা আমার উপরে হামলা করব। রিভলভার এই শেকড়ের তলায় রাখছিলাম।
কর্নেল ওদিকে মোটা শেকড়ের তলার ফঁক থেকে তার রিভলভারটি বের করে তাকে দিলেন।
গোয়েন্দাপ্রবর বললেন, -বড় ক্ষুধা পাইছে।
কর্নেল বললেন, -চলুন! বাংলো পর্যন্ত কষ্ট করে গেলেই খেতে পাবেন।
বললুম, -আপনি সম্ভবত কয়েক ঘন্টা ওই অবস্থায় বন্দি ছিলেন। হাঁটতে পারবেন তো?
হালদারমশাই হাসবার চেষ্টা করে বললেন, কী যে কন জয়ন্তবাবু! চৌতিরিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করছি। বারবার ট্রেনিং লইছি। একটু আস্তে হাঁটব এই যা। পাও দুখান অবশ হইয়া গেছে।
বলে তিনি দুই ঠ্যাং ছুঁড়ে রক্ত চলাচল ঠিক করলেন। তারপর আর্তস্বরে বললেন, –কিন্তু আমার জুতা? জুতা কই গেল?
কর্নেল বললেন, -জুতোর ব্যবস্থা হয়ে যাবে। সাবধানে আস্তেসুস্থে চলুন।
.
অজগরের ডেরায় চোরাই মাল
বনবাংলোয় ফিরতে প্রায় পাঁচটা বেজে গিয়েছিল। সিদ্ধেশ্বর ও সুখরাম হালদারমশাইকে দেখে অবাক হয়েছিল। কর্নেল সিদ্ধেশ্বরকে তাঁর অতিথির জন্য শিগগির কিছু খাদ্যের ব্যবস্থা করতে বলেছিলেন। ইতিমধ্যে হালদারমশাই স্নান করে কর্নেলের চটি পরে ধাতস্থ হয়েছিলেন। সিদ্ধেশ্বর ফুলকো লুচি আর দুপুরের একটা তরকারি দিয়ে গিয়েছিল। খেতে-খেতে হালদারমশাই তার কাহিনি শোনাচ্ছিলেন।
কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে তিনি সেদিন বাড়ি যান। তারপর সেজেগুজে বেরিয়ে হাওড়ায় সাড়ে বারোটার ট্রেন ধরেন। দুর্গাপুর নেমে সন্ধ্যা নাগাদ তিনি বাসে ময়ুরগড় পৌঁছে মা তারা হোটেলে ওঠেন। থানায় গিয়ে নিজের আইডেন্টিটি কার্ড দেখিয়েও প্রাইভেট গোয়েন্দা পাত্তা পাননি। পুলিশ সর্বত্র প্রাইভেট গোয়েন্দাদের নাক গলানো পছন্দ করে না। রাত্রে তিনি জমিদারবাড়ির আনাচে-কানাচে ঘোরাঘুরি করে হোটেলে ফেরেন।
সকালে তিনি জমিদারবাড়ি আসার সময় লক্ষ করেন, দুজন লোক একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে একজন যুবকের সঙ্গে কথা বলছে। যুবকটির পরনে ধোপদুরস্ত একেলে পোশাক। লোকদুটো তার হাতে একটা নোটের বান্ডিল গুঁজে দিলে যুবকটি শিস দিয়ে গানের সুর ভাজতে-ভাজতে হালদারমশাইয়ের পাশ দিয়ে ময়ূরগড়ের দিকে চলে যায়। আর সেই লোকদুটি, একজন মধ্যবয়সি বেঁটে গুঁফো এবং অন্যজন জিনস-গেঞ্জি পরা ছোকরা, অসমতল মাঠের দিকে হন্তদন্ত হেঁটে চলে যায়। ব্যাপারটা রহস্যজনক। তাই হালদারমশাই ওদের অনুসরণ করেন।
কিছুক্ষণ পরে তাদের দেখতে পান ওই ঢিবির ওপর বটগাছের তলায়। তখন হালদারমশাই গুঁড়ি ঘিরে পাথর আর ঝোপঝাড়ের আড়াল দিয়ে ঢিবির তলায় পৌঁছান। তার কানে আসে, ওরা ঘড়ি নিয়ে কথাবার্তা বলছে। কিছুক্ষণ পরে তারা টিবি থেকে নেমে উল্টোদিকে চলে যায়। ঢিবিতে চড়ে হালদারমশাই তাদের আর দেখতে পাননি। তখন তার সন্দেহ হয় ওরাই ঘড়ি চোর আর কাছাকাছি কোথাও ওদের গোপন ডেরা আছে। তাই তিনি চটপট নকল জটাজুট গোঁফদাড়ি পরে যথারীতি সন্ন্যাসী সেজে বটতলায় বসে থাকেন। কিটব্যাগে পোশাক খুলে ঢুকিয়ে রেখেছিলেন। রিভলভার তো পাশে শেকড়ের তলায় ছিল। তিনি বটতলায় শুকনো কিছু পাতা ও কাঠকুটো কুড়িয়ে অনেক কষ্টে আগুন জ্বেলে ধুনি তৈরি করেন। পাতা-কাঠকুটো ভিজে ছিল। অনেক চেষ্টার পর আগুন জ্বলে ওঠে।
সন্ন্যাসীবেশী হালদারমশাই সতর্কভাবে লক্ষ রেখেছিলেন চারদিকে। অথচ কীভাবে যে লোকদুটো চুপিসাড়ে কখন ঢিবিতে উঠেছে, তিনি দেখতে পাননি। আসলে তখন বৃষ্টি পড়ছিল। তাই তিনি মাথা বাঁচাতে ব্যস্ত ছিলেন। সেই সুযোগে আচমকা তারা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে কাবু করে ফেলে। দড়ি দিয়ে বেঁধে তার মুখে টেপ সেঁটে তারা তাকে ধরাধরি করে নামিয়ে নিয়ে গুহার ভেতর উপুড় করে ফেলে রাখে। মধ্যবয়সি লোকটা বলে, –ব্যাটা টিকটিকি! তোমাকে দেখেই টের পেয়েছিলুম কে তুমি। এই বটতলায় কস্মিনকালে সাধুসন্ন্যাসী দেখিনি। এটা পোড় খনি এলাকা। এখানে সাধুবাবা আসবেন কেন? থাকো তুমি। এবার অজগর সাপ এসে তোমাকে গিলে খাক।
ছোকরাটি যাওয়ার সময় বলছিল, বাবু! অতগুলো ঘড়ি বয়ে নিয়ে যাবেন কী করে? কাল্প-গুল্লুকে খবর দিন। আমরা চারজনে একে-একে ভাগাভাগি করে নিয়ে যাব। আপনার গাড়িতে তুলব সন্ধ্যাবেলা।
