বলে তিনি কাছেই টর্চের আলোতে কয়েকটুকরো পুঁটলিপাকানো কাগজ কুড়িয়ে নিলেন। তারপর শুঁকে দেখে একটু হেসে বললেন, -নিষিদ্ধ মাদক হেরোইনের পুরিয়া। কারা এখানে এসে হেরোইন খেয়ে নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে থাকে।
বললুম, -সুখরাম বলছিল দুদিন আগে এই এলাকায় পুঁটু আর রাজুকে দেখেছে।
তাহলে তারাই। -বলে কর্নেল টর্চ জ্বেলে গুঁড়ি মেরে কিছুটা এগিয়ে গেলেন।
আমিও টর্চ জ্বেলে তাকে অনুসরণ করলুম। তারপর দেখি, সামনে কুয়োর মতো গহুর। কর্নেল টর্চের আলোয় সেই গহুরটা দেখতে-দেখতে বললেন, –মাত্র ফুট ছ-সাত গভীর। ওই দেখো, তলায় আবার সুড়ঙ্গের মতো পথ। ডলোমাইটের গুঁড়ো পড়ে আছে।
কথাটা বলেই তিনি বাঁদিকে সরে গেলেন এবং আমাকেও ঠেলে সরালেন। চমকে উঠে বললুম, -কী?
– আলো নেভাও!
কর্নেল টর্চ নিভিয়েছিলেন সঙ্গে-সঙ্গে। আমিও নিভিয়েছিলুম। কিন্তু নেভাবার মুহূর্তে যা দেখলুম, আমার সারা শরীর আতঙ্কে হিম হয়ে গেল যেন। রিভলভারটা আগেই বের করে ডান হাতে রেখেছিলুম। ইচ্ছে করছিল ট্রিগার টেনে গুলি করি। একটা প্রকাণ্ড মোটা সাপ গহর থেকে সবে মাথাটা আমাদের ডানদিকে তুলে উঠে আসছিল।
কর্নেল কিছুক্ষণ পরে টর্চের আলো ফেললেন পেছনে, যেদিক থেকে আমরা ঢুকেছি। এবার দেখলুম সাপটা গুহামুখের দিকে চলেছে। কর্নেল বললেন, –পাইথন। বাংলায় বলা হয় ময়াল সাপ। সংস্কৃত ভাষায় একেই বলে অজগর। কারণ এই সাপ অজ অর্থাৎ ছাগলজাতীয় প্রাণী গিলে খায়।
সাপটার লেজের দিকে আলো। তাই গুহা থেকে সোজা বেরিয়ে গেল। চোখে আলো পড়লে নিশ্চয়ই ঘুরে আমাদের গিলতে আসত। বললুম, –কী ভয়ঙ্কর জায়গা! পুঁটু আর রাজু এর পাল্লায় পড়লে কী হতো?
কর্নেল বললেন, পাইথন এমনিতে নিরীহ সাপ। মানুষ ওর খাদ্য নয়। কিন্তু ওর গায়ে পা পড়লে পা জড়িয়ে ধরে হাড় গুঁড়ো করে দেয়। তবে ক্ষুধার্ত হলে মানুষের ঠ্যাং গিলতে দ্বিধা করে না।
বললুম, –তাহলে আমরা জোর করে বেঁচে গেছি!
-নাহ! নির্বিষ সাপ। চোখে কয়েক সেকেন্ডের আলো পড়ার জন্য এই গর্ত থেকে ওঠার মুখে একটু থমকে গিয়েছিল। আলো জ্বেলে রাখলে চোখ ধাঁধিয়ে যেত ওর। একখানে স্থির থাকত। সাপটাকে আমি চলে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছি।
গুহার বাইরে বৃষ্টিটা ততক্ষণে থেমে গিয়েছিল। আমরা বেরিয়ে গিয়ে আবার সাপটাকে দেখতে পেলুম। একটা প্রকাণ্ড পাথরের পাশে ঝোপের ভেতর সাপটা ঢুকে যাচ্ছিল।
কর্নেল বললেন, –সাপটা এই গুহায় থাকে সম্ভবত। এবেলা হয়তো খরগোশের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে। এলাকায় প্রচুর খরগোশ, শেয়াল আর খেকশিয়াল বাস করে।
বলে তিনি আবার হাঁটতে থাকলেন! এবার ধারে ঢিবি। মধ্যিখানে সংকীর্ণ জায়গায় সাবধানে পা ফেলে আমরা এগিয়ে গেলুম।
এঁকেবেঁকে কিছুদূর চলার পর ডাইনে এতক্ষণে ঝরনাটাকে দেখতে পেলাম। একটা শেয়াল ঝরনার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। আমাদের সাড়া পেয়ে তক্ষুনি উধাও হয়ে গেল। কর্নেল বললেন, শেয়ালটা মাছের আশায় ওত পেতে ছিল। ঝরনায় প্রচুর মাছ আছে।
– শেয়াল মাছ খায়?
কর্নেল হাসলেন, -শেয়াল কী খায় না?
ঝরনা ডাইনে রেখে তিনি বাঁদিকে বটগাছের গুঁড়ির নিচে দুটো লোক দেখেছিলুম। তারা আদিবাসী নয়। কাজেই ব্যাপারটা দেখা দরকার।
বাঁদিকে আবার একটা টিবি আর তার ওপর ঝাকড়া বেঁটে বটগাছ। ঢিবির গায়ে গুহায় মতো সেইরকম গোলাকার সুড়ঙ্গ। বুঝলুম, এটাও কোনও পোড়োখনি। কর্নেল বাইনোকুলারে চারদিক দেখে নিয়ে টিবিতে উঠে গেলেন। তারপর বটগাছটার গুঁড়ির নিচে প্রকাণ্ড শেকড়ের পাশে অনেকগুলো সিগারেটের ফিলটারটিপ চোখে পড়ল।
কর্নেল একটা আধপোড়া এবং গুঁড়িতে ঘষে নেভানো সিগারেটের টুকরো কুড়িয়ে আতশ কাচ দিয়ে দেখে বললেন, -সিগারেটটা বিদেশি। ফাইভ ফাইভ ফাইভ। লোকটা শৌখিন।
অমনি মনে পড়ে গেল। বললুম, কর্নেল! ট্রেনে ভূতনাথ হাজরা এই ব্রান্ডের প্যাকেট বের করেছিল।
কর্নেল আবার বাইনোকুলারে চারদিক দেখছিলেন। বললেন, হ্যাঁ। বাইনোকুলারে তাকেই দেখেছিলুম। যাই হোক, এখানে সঙ্গে সেই ছোকরাকে নিয়ে সে বসেছিল কেন, সেটাই কথা। চলল, নিচের খনিমুখে ঢুকে দেখা যাক কিছু সূত্র মেলে নাকি।
হঠাৎ আমার চোখে পড়ল, বটগাছের অন্য পাশে খানিকটা ছাই। বৃষ্টিতে ভিজে কাদা হয়ে আছে। বললুম, -কর্নেল! এখানে ওরা আগুন জ্বেলেছিল!
কর্নেল বললেন, -দেখেছি জয়ন্ত! এসো।
নিচে নেমে খনিমুখের সামনে দাঁড়িয়ে দেখলুম, এটাও পাথর দিয়ে বন্ধ করা ছিল। কিন্তু কারা প্রকাণ্ড-প্রকাণ্ড পাথরগুলো সরিয়ে ফেলেছে, তা স্পষ্ট। সেই পাথরের ওপর দিয়ে গুঁড়ি মেরে টর্চ জ্বেলে কর্নেল আগে ঢুকলেন। তারপর আমি। ভেতরটা পরিষ্কার। তারপরই কর্নেল বলে উঠলেন, – কী একটা শব্দ শোনা যাচ্ছে। এসো তো দেখি।
সুড়ঙ্গটা বেশ লম্বা এবং আঁকাবাঁকা। আমার কানেও ভেসে এল শব্দটা। কতকটা উ আঁ উঁ আঁ এই ধরনের। যেন কোনও প্রাণী গোঙাচ্ছে। দুটো বাঁক ঘুরেই কর্নেল বলে উঠলেন, কী সর্বনাশ!
টর্চের আলোয় দেখলুম, একটা লোক খালি গায়ে পড়ে আছে উপুড় হয়ে। তার পরনে গেরুয়া একটুকরো খাটো কাপড় কোনওরকমে জড়ানো এবং আন্ডারপ্যান্ট দেখা যাচ্ছে। তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে। পাশেই পড়ে আছে জটাজুট অর্থাৎ পরচুলা। তার হাতের বাঁধন কর্নেল ছুরি দিয়ে কেটে বাকি দড়িগুলো খুলে ফেললেন। তারপর তাকে চিত করে শোয়ালেন। অমনি চমকে উঠে বললুম, –সর্বনাশ! হালদারমশাই যে!
