কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, -এবার চলি। আপনার ওপর আপাতত হামলার সম্ভাবনা নেই। আমার পক্ষে বনবাংলোতে থাকা এখন উচিত। কারণ আমি আপনার বাড়িতে থাকলে আমার গতিবিধির ওপর লোকটা নজর রাখতে পারবে। তাই আমি বাইরে থেকেই আপনার জন্য কাজ করে যাব। হা- গোপনে আড়িপাতা যন্ত্রটার মধ্যে থেকে টেপরেকর্ডার বের করে নিয়ে টেপরেকর্ডারে বাজিয়ে শুনবেন। তারপর আমাকে জানাবেন, কী- কী কথা শুনলেন। এটা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।
বলে কর্নেল বেরুলেন। আমি তাকে অনুসরণ করলুম।
.
পোড়োখনির বন্দি
বনবাংলোয় ফিরে কর্নেল ইসমাইলকে বললেন, আজ আর গাড়ির দরকার হবে না। তুমি মুখার্জিসায়েবকে বোলো, কাল সকালে আমরা পানাগড় যেতে চাই। যদি অসুবিধে না হয়, তিনি যেন তোমাকে গাড়ি দিয়ে পাঠান।
ইসমাইল বলল, -ফাস্টকেলাস রোড হয়েছে সার! পানাগড় যেতে দো ঘণ্টাভি লাগবে না। আমি মুখার্জিসাবকে জরুর তলব দিচ্ছি।
সে সেলাম ঠুকে গাড়ি নিয়ে চলে গেল। আকাশে টুকরো-টুকরো মেঘ ভেসে যাচ্ছে। তাই মাঝে-মাঝে রোদ মাঝে-মাঝে ছায়া পড়ছে। এগারোটা বাজে। সুখরাম এসে সেলাম দিয়ে জানতে চাইল, কফি লাগবে কি না। কর্নেল বললেন, -না সুখরাম! আর কফি নয়। সাড়ে বারোটা নাগাদ লাঞ্চ খাব।
সে বলল, –আস্নান করলে পানি বাথরুমের চৌবাচ্চায় পাবেন সার! ভরতি করে দিয়েছি।
ঠিক আছে। –বলে কর্নেল বাইনোকুলারে পশ্চিমদিকে পোড়োখনি এলাকা দেখতে থাকলেন।
বললুম, -হঠাৎ ওদিকে কী দেখছেন?
– লাল ঘুঘুর ঝাঁক।
-আপনি একবার বলেছিলেন লাল ঘুঘুর ঝাঁক খুব অলুক্ষণে।
-হ্যাঁ। যতবার যেখানে লাল ঘুঘুর ঝাঁক দেখেছি, ততবার সেখানে
বলে তিনি হঠাৎ থেমে বাইনোকুলার নামালেন। তারপর ঘরে ঢুকে আওড়ালেন :
হিকরি ডিকরি ডক
নকড়ি ছকড়ি ক্লক
ধরোটি বারোটি পাক
বাজিলে চিচিং ফাঁক
বললুম, –আগের দিনের লোকেরা বড্ড হেঁয়ালির জট পাকানো ধাঁধা তৈরি করত।
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। আজকাল কিছু গোপন রাখতে হলে যেমন কম্পিউটারে ডাটা ফিড করিয়ে কোডনাম্বার রাখা হয়। কোডনাম্বার না জানলে তুমি বুঝতেই পারবে না কী তথ্য লুকোনো আছে।
–আচ্ছা কর্নেল, রায়মশাইয়ের শত্রুপক্ষ কোথাও ওত পেতে নিশ্চয় বাগিং যন্ত্র উদ্ধার দেখে ফেলেছে!
অসম্ভব নয়। –বলে তিনি হাসলেন : তুমিই ওটা ছিঁড়েছ। কাজেই সাবধান! তোমার সিক্স রাউন্ডার রিভলভার সবসময় তৈরি রাখবে।
– কাল রাতের ব্যাপারটা এমন অভাবিত যে তৈরি ছিলুম না!
তৈরি থাকা উচিত ছিল। আমার সামরিক জীবনের শিক্ষা জয়ন্ত! যুদ্ধের মধ্যে পা বাড়ানোর মুহূর্ত থেকে তৈরি থাকতে হয়। তৈরি ছিলুম বলেই বর্ধমান স্টেশনে ভূতনাথ হাজরা ওরফে কালীনাথ রায়চৌধুরির মতলব টের পেয়েছিলুম।
–কাল পানাগড়ে কি তার খোঁজেই যাবেন?
-জানি না কার খোঁজে যাব। তবে রায়মশাইয়ের পিসতুত বোনের সঙ্গে আগে দেখা করব।
কর্নেল সপ্তাহে বড়জোর দুদিন স্নান করেন। শীতকালে তো মাসে মাত্র দুদিন। স্নান না করে ওঁর কোনও অসুবিধে হয় না। সামরিক জীবনের অভ্যাস।
কিন্তু আমি স্নান না করে থাকতে পারি না। বাংলোর পেছনে কুয়ো আছে। টিলার গায়ে কুয়ো শুনে অবাক হয়েছিলুম। কর্নেলের কাছে জানতে পারলুম, ওটা একটা প্রস্রবণ ছিল। কুয়োর মধ্যে তাকে ভরে বাড়তি জল নালা দিয়ে নিচের ঝরনায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
জলটা যেমন স্বচ্ছ, তেমনি ঠান্ডা। আরামে স্নান করলুম। তারপর সাড়ে বারোটায় লাঞ্চ সেরে ঘুমোনোর জন্য বিছানায় বসেছি, কর্নেল বললেন, -আজ ভাতঘুম নয়, জয়ন্ত! আধঘন্টা পরে বেরুব।
– কোথায় বেরুবেন? বৃষ্টি হতে পারে যে-কোনও সময়। বর্ষাতি আনিনি।
-বৃষ্টি নামলে মাথা বাঁচানোর প্রচুর জায়গা পাবে।
-কোথায়?
-পোড়োখনি এলাকায় প্রচুর গুহার মতো জায়গা আছে।
-ওখানে কেন যাবেন?
– আশ্চর্য জয়ন্ত! আমরা কি নিছক বেড়াতে এসেছি? হ্যাঁ আবার বলছি, তৈরি হয়ে থেকো যেন।
আধঘন্টা পরে যখন কর্নেলের সঙ্গে ফুলেফেঁপে-ওঠা ঝরনার তীর দিয়ে হাঁটছিলুম, তখন আকাশ মেঘলা। কিন্তু বৃষ্টির জন্য নয়, খানা-খন্দে ভরা দুর্গম এলাকা আর প্রকাণ্ড সব পাথরের আড়ালে ভূতনাথ হাজরা ওরফে কালীনাথের চেলারা ওত পেতে আছে বলে মুহুর্মুহু গা-ছমছম করছিল। কর্নেল মাঝে-মাঝে কোনও ঢিবিতে উঠে বাইনোকুলারে লক্ষ রাখছিলেন। যেতে-যেতে গুহার মতো একটা করে খনির গহুর চোখে পড়ছিল। অনেক গহ্বরের মুখে পাথর আটকানো। কিছুক্ষণ পরে ঝরনাটাকে একটা প্রকাণ্ড সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে যেতে দেখলুম।
ঢিবির ওপর এবং পাথরের ফাঁকে ঝোপঝাড়, কোথাও বা গাছ। প্রতিমুহূর্তে মনে হচ্ছিল কেউ আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। গত রাত্রে আসার পথে দুটো লোকের হাতে যে চকচকে ধারালো অস্ত্র দেখেছি, তা বারবার মনে পড়ছিল।
একসময় চাপাস্বরে কর্নেলকে জিগ্যেস করলুম, – আমরা কোথায় যাচ্ছি?
কর্নেল শুধু বললেন, – চুপ।
একটু পরে ফোঁটা-ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে থাকল। কর্নেল এগিয়ে গিয়ে বাঁদিকে একটা পাথুরে টিবির গুহায় ঢুকে টর্চের আলো জ্বাললেন। ভেতরটা গাঢ় অন্ধকার ছিল। বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচাতে এই গুহাটা ভালো একটা আশ্রয় বটে, কিন্তু এ যেন এক সুড়ঙ্গ। সামনে বাঁক নিয়ে পাতালে নেমে গেছে। গুঁড়ি মেরে বসে কর্নেল চাপাস্বরে বললেন, -এটা ছিল ডলোমাইটের খনি। খনিমুখ সিল করা ছিল পাথর দিয়ে। বছর পাঁচেক আগে এসে তা দেখেছিলুম। এখন দেখছি কেউ বা কারা পাথরগুলো সরিয়েছে। আরে! এগুলো কী?
