কর্নেল বারান্দায় হাঁটতে হাঁটতে শেষপ্রান্তে গেটের কাছাকাছি টেলিফোন বক্সের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। পিঠে কিটব্যাগটি আঁটা। বক্স বন্ধ ছিল। কিন্তু তালা আঁটা ছিল না। বক্স খুলে তিনি খুঁটিয়ে দেখলেন। তারপর বললেন, -ওভারহেড লাইন। চলো, বাইরে গিয়ে দেখি।
গেটের একটা অংশ দিয়ে বেরিয়ে তিনি বাড়ির বাইরে দেয়ালে সাঁটা কালো রবারের পাইপ দেখতে-দেখতে থমকে দাঁড়ালেন। বাইনোকুলারে টেলিফোনের তার দেখতে থাকলেন। কালো পাইপ থেকে ফোনের তার বেরিয়ে একটা শালকাঠের খুঁটিতে পৌঁছেছে। খুঁটির পেছনে একটা লম্বাটে গাছ। কর্নেল বললেন, -বাহ! অদ্ভুত কৌশল।
বললুম, -কী ব্যাপার?
–খুঁটির মাথায় তারের মাত্র দু-তিন সেন্টিমিটার জায়গার রবার কেটে কেউ বা কারা আড়িপাতা খুদে টেপ জুড়ে রেখেছে। আড়িপাতা যন্ত্রটা কাঠের খাঁজে এমনভাবে বসানো, সহজে চোখে পড়বে না। এইসব জাপানি খুদে যন্ত্র আজকাল সর্বত্র পাওয়া যায়। যন্ত্রটা দরকারমতো খুলে আনা যায়। তারপর টেপরেকর্ডারে ঢুকিয়ে ফোনের কথাগুলো শোনা যায়।
– তাহলে খুঁটি বেয়ে উঠতে হবে।
– খুঁটিটা আঁকাবাঁকা। খাজও আছে। ওঠা-নামা সহজ কাজ। মনে হচ্ছে রায়মশাই সম্প্রতি অনেক টাকা খরচ করে টেলিফোন লাইন নিয়েছেন।
বলে কর্নেল চারদিক দেখে নিয়ে একটু হাসলেন, -জয়ন্ত! তোমার তো মাউন্টেনিয়ারিংয়ের ট্রেনিং নেওয়া আছে। উঠে গিয়ে সাবধানে ওটা খুলে আনো। যেন মূল তার না ছেড়ে। চিয়ার আপ!
একটু ইতস্তত করে বললুম, –ভেঙে পড়বে না তো?
–আমার ওজনে কী হবে জানি না। তবে এটা শালকাঠ। তোমার ওজনে ওর কিছুই হবে না। অগত্যা বাঁকা অংশ আর খাঁজে পা রেখে সাবধানে উঠে খুদে টেপ যন্ত্রটা খুলে ফেললুম। এটার সঙ্গে জোড়া দেওয়া মিহি তারটুকু মূল তারের সঙ্গে জড়িয়ে দিলুম। তারপর বললুম, -একটু কালো টেপ কেটে সেলোফেন ছাড়িয়ে তারটাতে জড়িয়ে টিপে আটকে দিলুম। এবার নামতে তত অসুবিধে হল না। পায়ে রবারসেলের খাঁজকাটা জুতো। কর্নেলের সঙ্গে পাহাড়জঙ্গলে অভিযানে বেরুলে এই দুতো পরেই আসি।
কর্নেল কালো টেপ এবং আড়িপাতা যন্ত্রটা কিটব্যাগে ঢুকিয়ে বললেন, -চলল! এবার রায়মশাইয়ের কাছে যাই।
গিয়ে দেখি, রায়মশাই সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে উত্তেজনার ছাপ। বললেন, জয়ন্তবাবু শালকাঠের খুঁটিতে উঠেছিলেন দেখছিলুম। কী ব্যাপার?
বারান্দায় উঠে কর্নেল বললেন, -আপনার টেলিফোনের লাইনে আড়িপাতা যন্ত্র আটকানো ছিল।
– কী অদ্ভুত!
ঘরে ঢুকে আমরা সোফায় বসলুম। রায়মশাই আগের মতো মুখোমুখি ডিভানে বসলেন। কর্নেল বললেন, আপনার কি টেপরেকর্ডার আছে?
– না তো! পুঁটুর আছে। রাজুরও একটা আছে। সদু ছেলের বায়না মেটাতে কিনে দিয়েছে।
– এই খুদে টেপ যন্ত্রটা তাহলে সৌদামিনিকে বলে বা পুঁটুর কাছ থেকে টেপরেকর্ডার কোনও ছলে চেয়ে নিয়ে গোপনে বাজাবেন। অন্তত গতকাল সকাল থেকে আজ আমরা আসবার সময় পর্যন্ত টেলিফোনে আপনার এবং অন্য কারও মধ্যে যা কথাবার্তা হয়েছে, সব এতে রেকর্ড করা আছে।
রায়মশাই বাগিং যন্ত্রটা হাতে নিয়ে বললেন, –এ কাজ কার হতে পারে?
– যে ছড়া লিখে আপনাকে হুমকি দিচ্ছে, তার।
-বুঝলাম। কিন্তু ছড়া লেখার মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছি না।
–রায়মশাই! সে ধরেই নিয়েছে, আপনি ওই ছড়ার মর্ম জানেন। তাই যে জিনিসটা ছড়ার মধ্যে লুকিয়ে আছে, সেটার দাবিতে সম্ভবত এবার শিগগির চিঠি পাবেন। আসলে পাঁচটা চিঠি লিখে সে যাচাই করে নিচ্ছে আপনার কী প্রতিক্রিয়া। এবার আপনি যেহেতু আমাকে ডেকেছেন, তাই সে ওটা দাবি করবেই। অন্তত আমার অঙ্কটা এই। কারণ আপনি যে সেই জিনিসটা বাইরে কোথাও রেখে আসেননি, বা কাকেও বিক্রি করে দেননি, তা সে বিলক্ষণ জানে।
– ছড়ার মধ্যে লুকিয়ে আছেটা কী?
-সম্ভবত আপনার পূর্বপুরুষের কোনও সম্পদ, যা খুবই দামি।
রায়মশাই মুখ নিচু করে মাথা নেড়ে বললেন, -আমি কিছু বুঝতে পারছি না। ঠাকুরদা আমাকে কী বিপদের মধ্যে ফেলে গেছেন!
কর্নেল আস্তে বললেন, -সেই দামি জিনিস আপনার ভাইয়ের কাছেও নেই। এর একটাই অর্থ হয়। জিনিসটা হয়তো এইসব ঘড়ির মধ্যেই লুকানো আছে। কারণ ঠাকুরদার সব ঘড়ি আপনার কাছে।
রায়মশাই মুখ তুলে বললেন, –যদি তা বারান্দার ঘড়িগুলোর মধ্যে লুকোনো থাকে?
-চুরি যাওয়া ঘড়িগুলোর মধ্যে ওটা থাকলে আর আপনার কাছে চিঠি আসবে না।
-তবু যদি আসে?
–তাহলে বুঝবেন, ঘড়ি-চোর অন্য লোক। আর চিঠি লিখছে অন্য লোক।
–কেন? এমন তো হতেই পারে, ওই ছটা ঘড়ি একই নোক চুরি করেছে এবং সেগুলোর মধ্যে জিনিসটা না থাকায় আবার হুমকি দিয়ে চিঠি লিখছে!
কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট জ্বেলে বললেন, –হ্যাঁ। তা হতেই পারে। তবে আমার ধারণা অঙ্কই বলতে পারেন, ওই আড়িপাতা যন্ত্র বলে দিচ্ছে লোকটা মহা ধূর্ত। পূর্বপুরুষের লুকিয়ে রাখা দামি জিনিস যে-ঘড়িতে লুকোনো আছে, সেটা আপনি বারান্দায় টাঙিয়ে রাখবেন না, এটা বোঝা তার পক্ষে খুবই সহজ। কারণ আগেই বললুম, সে ধরেই নিয়েছে, ছড়াটার মর্ম আপনি জানেন।
রায়মশাই বললেন, -ঠিক। আপনি ঠিকই বলেছেন। কিন্তু এ ঘরের এতগুলো ঘড়ি কতবার অয়েলিং করানো হয়েছে, কোনওটার মধ্যে তো কিছু পাওয়া যায়নি। এমনকী অচল তিনটে ঘড়ির মধ্যেও কিছু নেই।
