সেই ঘড়ির পাখি বা আরেকটা ঘড়ির সায়েবকে যে দেখব, সে-কথা মনেই রইল না। বললুম, –অপূর্ব! অসাধারণ! এ যেন জাদুকরের তৈরি এক মায়াজগৎ রায়মশাই!
কর্নেলের মুখে কিন্তু নির্বিকার ভাব লক্ষ করে অবাক হলুম। রায়মশাই বললেন, –বারান্দার ছটা ঘড়ি চুরির জন্য আমার কোনও মাথাব্যথা নেই। পুলিশ যা করার করুক। কিন্তু ওই চিঠিগুলো।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, হ্যাঁ। হিকরি ডিকরি ডক।
.
আড়িপাতা যন্ত্র আবিষ্কার
ভেবেছিলুম, কর্নেল এবার উঠবেন। তিনি উঠলেন না। মোফায় হেলান দিয়ে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে কিছু চিন্তাভাবনার পর বললেন, -এবার আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই রায়মশাই! রায়মশাই বললেন, -করুন!,
– পানাগড়ের ভূতনাথ হাজরা নামে বেঁটে মোটাসোটা ফো কোনও ভদ্রলোককে আপনি চেনেন?
-ভূতনাথ হাজরা? না তো! তবে-
বলুন!
–চেহারার যে বর্ণনা দিলেন, আমার দূর সম্পর্কের ভাগনে স্বপন- মানে পুঁটুর এক কাকার চেহারার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। পুঁটু আমার পিসতুতো বোনের ছেলে। ওর বাবা-মা বেঁচে নেই। পিসতুতো বোন লতিকার অনুরোধে ওকে নিয়েছি। ইচ্ছা আছে যদি ওর স্বভাব চরিত্র শোধরায়, তাহলে ওকে দত্তক নেব। তো ভদ্রলোকের গায়ের রং শ্যামবর্ণ। পুঁটুর উনি কাকা, মানে- সেও বড় জটিল সম্পর্ক। লতিকার স্বামী ইন্দ্রনাথের ভায়রাভাই কালীনাথ রায়চৌধুরি। গতবছর একদিন পুঁটু ওঁকে বাজারে দেখতে পেয়ে এ বাড়িতে এনেছিল। কালীনাথবাবুর পানাগড়ে কী যেন কারবার আছে। উনি আমাকে ঘড়ি বিক্রির লোভ দেখিয়েছিলেন। এই সব অ্যান্টিক ঘড়ির দাম নাকি দশ-পনেরো হাজার। আমি মুখের ওপর না বলে দিয়েছিলুম।
-গায়ের রং শ্যামবর্ণ? কপালের ডানদিকে ক্ষতচিহ্ন আছে?
রায়মশাই একটু পরে বললেন, -হ্যাঁ, হ্যাঁ। তাকে আপনি চেনেন নাকি?
-চিনি। এবার বলুন, গত রবিবার আপনি ঘুম থেকে কখন উঠেছিলেন?
-ছটায়। রোজ ছটায় আমার ঘুম ভাঙে।
-রাত্রেও তো ঘড়িগুলো বাজে। আপনার ঘুমের ব্যাঘাত হয় না?
রায়মশাই হাসলেন, হয় বলেই তো শেষ পর্যন্ত ডাক্তারের পরামর্শে ঘুমের বড়ি খেয়ে শুই।
–রবিবার ঘুম ভাঙার পর এই ঘরের দরজা বন্ধ ছিল, না খোলা ছিল?
– সমস্যা হল, কড়া ঘুমের ওষুধ। তাই ছটায় উঠি বটে, কিন্তু ঘোর কাটে না। তাই মনে পড়ছে না দরজা খোলা ছিল, না বন্ধ ছিল। প্রথমে বাথরুমে ঢুকে তারপর বারান্দায় গিয়ে বসি কিছুক্ষণ। সদু নিচে থেকে চা নিয়ে ডাকে। তখন বারান্দার দরজা খুলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে নিচের দরজা খুলি। চা খাওয়ার পর ঘোরটা কেটে যায়। তো সেদিন সদুই সিঁড়ির দরজা আর বারান্দার দরজা খোলা দেখে উঠে এসেছিল। তারপর তারই চোখে পড়েছিল, বারান্দার দেয়ালের ছটা ঘড়িই নেই।
-হুঁ। চোর আপনার ঘুমের ওষুধ খাওয়ার কথা জানে। সে পালঙ্কের তলায় লুকিয়ে ছিল।
-কিন্তু অতগুলো ঘড়ি একা সে কী করে নিয়ে গেল বুঝতে পারছি না।
-একা নয়। তার এক বা একাধিক চেলা উঠোনের জঙ্গলের ভেতর লুকিয়ে ছিল হয়তো।
– পুলিশও তা-ই বলেছে। তবে পালঙ্কের তলায় কারও লুকিয়ে থাকার কথা তাদের মাথায় আসেনি। যাইহোক, সদুর ছেলে রাজুকে ধরে নিয়ে গিয়ে জেরা করেছিল। তার মুখ দিয়ে কিছু বের করতে পারেনি পুলিশ। শেষে সদুর কান্নাকাটিতে আমিই রাজুকে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেছিলুম। তবে এ কথা ঠিক, রাজু বোকাবুন্ধু গবেট প্রকৃতির ছেলে। নেশা-ভাং করে বলে মায়ের কাছে মার খায়।
–পুঁটুকে পুলিশ কিছু।
রায়মশাই কর্নেলের কথার ওপর বললেন, -থানায় নিয়ে জেরা করে ছেড়ে দিয়েছিল। তার কথায় সন্দেহযোগ্য কিছু পায়নি পুলিশ। এমনকী পিনাকীদাকে আর সদুকেও পুলিশ জেরায় জেরবার করেছিল।
পানাগড়ে আপনার পিসতুতো বোনের নাম-ঠিকানা চাই রায়মশাই! –বলে কর্নেল কিটব্যাগের চেন খুলে খুদে একটা নোটবই বের করলেন। পকেট থেকে কলম টেনে নিলেন।
রায়মশাই বললেন, লতিকা মজুমদার। ওর স্বামীর নাম ইন্দ্রনাথ মজুমদার। ইন্দ্রনাথ ডাক্তারি করে। তার মহামায়া নার্সিং হোম সবাই চেনে। হোমের পেছনেই তার পৈতৃক বড়ি।
কর্নেল নাম-ঠিকানা লিখে বললেন, – ডাঃ মজুমদারের নিশ্চয়ই টেলিফোন আছে?
–আছে। আমার লাইন এস. টি. ডি. নয়। আপনি চাইলে ট্রাংক করতে পারি।
নাহ। –বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন, আপনার টেলিফোন লাইনটা একটু পরীক্ষা করতে চাই।
–করুন। ওই তো টেলিফোন।
-নাহ। প্রথমে টেলিফোন বক্স। তারপর অন্যত্র।
-বক্স নিচের বারান্দায় আছে। একেবারে গেটের কাছাকাছি।
–আপনি বসুন। আমি দেখে আসি। জয়ন্ত! তুমি বরং আমার সঙ্গে এসো। তোমাকে দরকার হতেও পারে।
রায়মশাই বিস্মিত হয়ে বসে রইলেন। কর্নেলের সঙ্গে আমি বেরিয়ে গেলুম। পোর্টিকোর সামনে গাড়িতে ঠেস দিয়ে ইসমাইল এক প্রৌঢ়ার সঙ্গে কথা বলছিল। প্রৌঢ়া কর্নেলকে দেখে করজোড়ে ঝুঁকে প্রণাম করল। বলল, -কত বছর পরে এলেন কর্নেলসায়েব! ভালো ছিলেন তো?
কর্নেল বললেন, –ভানু মারা গেছে শুনে কষ্ট হল সৌদামিনী।
– সবই কপালের লেখন কর্নেলসায়েব! দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছিল। খাচ্ছিল-দাচ্ছিল। হঠাৎ রাত্তিরে বুকে ব্যথা উঠল। ডাক্তারবাবু আসতে আসতে শেষ।
– আচ্ছা! পরে কথা হবে। ইসমাইল! একটুখানি দেরি হবে। তাড়া নেই তো তোমার?
ইসমাইল ড্রাইভার বলল, –কী যে বলেন স্যার, মুখার্জিসাবের হুকুম আছে, আপনি যেখানে যাবেন, যত টাইম থাকবেন, আমাকেও হাজির থাকতে হবে। কুছু শোচ করবেন না।
