রায়মশাই বললেন, -হ্যাঁ। ঠাকুরদা ওই লাইনটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ছড়াটার বাকি অংশের অর্থ শোনাবার আর সুযোগ পাননি। হঠাৎ মারা যান।
কর্নেল বললেন, ভুল হতেও পারে। তবে একটা চিঠি কলকাতার জি পি ও-তে পোস্ট করা। দুটো চিঠি দুর্গাপুর থেকে। একটা বর্ধমান আর একটা পানাগড় থেকে।
এইসময় পিনাকীবাবু ট্রে-হাতে ঘরে ঢুকলেন। সেন্টারটেবিলে ট্রে রেখে বললেন, আমি বাজারে যাই রায়মশাই! সায়েবরা তো বাংলোতে উঠেছেন। নাকি দুপুরবেলাটা এখানে।
কর্নেল বললেন, -না পিনাকীবাবু! যখন আসব এ বাড়ি, তখন জানিয়েই আসব এবং খাব।
রায়মশাই পকেট থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে পিনাকীবাবুকে দিলেন। তারপর বললেন, – সদুকে বলে যাও পিনাকীদা! পুঁটু হোক, কি রাজু হোক, এই সিঁড়ি দিয়ে যেন না ওঠে। বাইরে থেকে সিঁড়ির দরজা সদুকে আটকে দিতে বলল। পুঁটু এলে হলঘরের ভেতরের সিঁড়ি দিয়ে যেন নিজের ঘরে যায়। আর শোনো! তুমি দেখে যাও বারান্দায় এ ঘরে আসার পার্টিশান ওয়ালের দরজা ভেতর থেকে আটকানো আছে কি না।
পিনাকীবাবু চলে গেলেন। কর্নেল বললেন, -এবার বলুন, বারান্দার ছটা ঘড়ি কীভাবে চুরি গেল?
রায়মশাই বললেন, গত সপ্তাহে শনিবার, আজ হল শুক্রবার, রাত্রে কী করে যে চোর ঢুকল, বুঝতে পারছি না। বাবার আমলে –আপনার মনে পড়বে, সিঁড়ি থেকে তিনটে ঘড়ি চুরি যাওয়ার পর দোতলার বারান্দায় সিলিং পর্যন্ত দেয়াল গাঁথা হয়েছিল, হলঘরের ভেতরকার সিঁড়ি দিয়ে উঠে কেউ যাতে এই ঘরে না আসতে পারে। মজবুত একটা দরজা অবশ্য বসানো হয়েছিল। ওটা আমি রোজ রাত্রে চেক করে তবে শুই। যে সিঁড়ি দিয়ে আপনারা উঠলেন, সেটাও ভেতর থেকে আটকে দিই। আবার বারান্দায় ঢোকার মুখে সিঁড়ির মাথায় আর একটা দরজা দেখলেন। ওটাও ভেতর থেকে বন্ধ রাখি। এদিকে বারান্দার থামে গ্রিল আছে। তাহলে চোর ঢুকল কোন পথে, এটাই অদ্ভুত!
কর্নেল জিগ্যেস করলেন, –সেদিন আপনি কত রাতে শুয়েছিলেন?
–রাত সাড়ে দশটায় আমি ঘরের দরজা এঁটে শুয়ে পড়ি।
-ওটায় তো অ্যাটাচড বাথরুম?
-হ্যাঁ। ওটা ঠাকুরদার আমলে তৈরি। কিন্তু আমি বাথরুমের দরজার হ্যাঁচকল টেনে আটকাতে ভুলি না।
–আপনি কি শনিবার সন্ধ্যায় বা তারপর কোনও কারণে নিচে নেমেছিলেন?
রায়মশাই তার দিকে নিস্পলক দৃষ্টে তাকিয়ে বললেন, -হ্যাঁ। মনে পড়ে গেল। রাজুকে সৌদামিনী পেটাচ্ছিল। চ্যাঁচামেচি হচ্ছিল খুব। তাই বিরক্ত হয়ে আমি নিচে নেমে গিয়েছিলুম। অবশ্য মিনিট পাঁচেক পরে ফিরেছিলুম।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, -অতএব আমার মতে, ওই সুযোগে চোর ঢুকে সম্ভবত আপনার খাটের তলায় লুকিয়ে ছিল। এটা পাটিগণিতের অঙ্ক রায়মশাই! যেমন কী না ওই হিকরি ডিকরি ডক!
রায়মশাই বলে উঠলেন, -তা সম্ভব। খুবই সম্ভব। কারণ আমি ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুই। কিন্তু আপনি হিকরি ডিকরি ডক ছড়াটাকে পাটিগণিতের অঙ্ক বলছেন কেন?
কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, -মনে হচ্ছে কোনও অঙ্কের সূত্র এতে নিশ্চয় লুকোনো আছে। তা না হলে আপনার ঠাকুরদাই বা এটা আপনাদের দুই ভাইকে মুখস্থ করাবেন কেন এবং সেই ছড়ালেখা চিঠিই বা কেউ ডাকে পাঠিয়ে আপনাকে মৃত্যুর ভয় দেখাবে কেন?
– হ্যাঁ। মড়ার খুলি এঁকে পাঠাচ্ছে বলেই আমি সত্যি ভয় পেয়েছি।
আমি কফি খেতে-খেতে ঘড়িগুলো ঘুরে-ঘুরে দেখছিলুম। বললুম, -কোনও ঘড়িতে ঘন্টার সময় হলে খুদে পাখি ঘণ্টিতে ঠোরায় শুনেছি। সেটা কোথায়?
রায়মশাই বললেন, ও ওই যে বেঁটে চ্যাপ্টা ঘড়িটা দেখছেন!
এতক্ষণে ঘড়িটা চোখে পড়ল। দোলকের তলায় একটা সরু দাঁড়ে খুদে পেতলের পাখি বসে আছে। বললুম, -ওটা বাজে?
– হ্যাঁ। একটু পরে দশটা বাজবে। তখন দেখবেন।
–আর একটা ঘড়িতে নাকি সিঁড়ি বেয়ে খুদে সায়েব এসে ঘণ্টি বাজায়?
–সেটাও আছে। ওই দেখুন বড় চৌকো ঘড়িটা। সিঁড়িটায় আলো পড়েনি। তবে ঘণ্টার সময় হলেই টুপিপরা সায়েব হাতুড়ি হাতে নামতে শুরু করলে চোখে পড়বে।
– ঘড়িগুলো সবই কি একসঙ্গে বাজে?
-প্রায় একসঙ্গেই বাজে। এক-আধ সেকেন্ড কোনওটা আগে-পরে বাজে এই যা!
রায়মশাই উঠে গিয়ে আমাকে ছড়ি দিয়ে ঘড়ি দেখাতে শুরু করলেন। আমিও ওঁর কাছে গেলাম। উনি বললেন, -তিনটে বাদে পনেরোটা ঘড়ি এখনও সচল। রাইট টাইম দেয়। ওই। তিনটে আমি বাবার আমলেও বাজতে শুনিনি। তবু ঠাকুরদার স্মৃতি হিসেবে টাঙানো আছে।
বলে তিন দেয়ালে তিনটে ঘড়ি তিনি দেখিয়ে দিলেন।
জিগ্যেস করলুম, -পনেরোটা ঘড়িতে কি রোজ দম দিতে হয়?
রায়মশাই বললেন, -হ্যাঁ। ঠিক সকাল আটটায় দম দিতে শুরু করি। তবে আমি একা পারিনে। হাত ব্যথা হয়ে যায়। পিনাকীদাও দম দেয়। আর মাঝে-মাঝে বছরে অন্তত একবার কারিগর ডেকে এনে অয়েলিং করাতে হয় মাত্র।
কর্নেল বললেন, -কারিগর মানে সেই অঘোরবাবু?
– অঘোরবাবু দুবছর আগে মারা গেছেন। ওঁর ছেলে নরেনও পাকা কারিগর আর বিশ্বাসী। নরেন গত শীতে অয়েলিং করে দিয়ে গেছে। কিন্তু কোনও ঘড়ি গন্ডগোল করেনি এ পর্যন্ত। শুধু ওই তিনটে ঘড়ি অঘোরবাবু বা তার ছেলে সচল করতে পারেননি। তিনটেই নাকি বিগড়ে গেছে।
রায়মশাই ডিভানে এসে বসলেন। আমিও সোফায় বসে পড়লুম। কর্নেল চুরুট ধরালেন। তারপরই ঘড়িগুলো থেকে আশ্চর্য মিঠে সেতারের ঝংকারের মতো শব্দ শোনা গেল এবং পরক্ষণে দশবার নানা সুরে ঘণ্টার বাজনা শুরু হল। সেই বাজনার বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব। মনে হল, সারা ঘর জুড়ে মনমাতানো অর্কেস্ট্রা বাজছে। আমরা যেন এক মধুর অর্কেস্ট্রার ধ্বনিঝংকারের মধ্যে ভেসে চলেছি। আচ্ছন্ন হয়ে বসে রইলুম।
