বললুম, -মর্নিং বস্! আপনি পোড়োখনির মাঠে ঢিবিতে দাঁড়িয়ে বাইনোকুলারে কি ভূতনাথের কোনও চেলাকে দেখছিলেন?
কর্নেল হাসলেন, –নাহ্। লাল ঘুঘুর ঝাঁক দেখছিলুম। ওরা টাড় জমিতে বসে ছিল। কিন্তু বড্ড চালাক। ছবি তুলতে দিল না।
কিছুক্ষণের মধ্যে ব্রেকফাস্ট করে কফি পানের পর কর্নেল বললেন, -চলল জয়ন্ত! জমিদারবাড়ি যাওয়া যাক।
গাড়িতে জমিদারবাড়ি যেতে মিনিট দশেক লাগল। বাড়িটা শহরের উত্তর-পূর্ব কোণে একটা উঁচু জমিতে জীর্ণ চেহারায় দাঁড়িয়ে আছে। গড়নে কতকটা ক্যা বা দুর্গপ্রাসাদের মতো। চারদিকে উঁচু-গাছ। লোহার প্রকাণ্ড গেট। বাড়ির ভেতর জেলখানার মতো উঁচু বাউন্ডারি-ওয়ালা। ফুলবাগান আগাছায় ঢাকা পড়েছে। পামগাছ, বর্মি বাঁশের ঝাড়, কতরকমের বিদেশি গাছপালা জঙ্গল হয়ে আছে।
হর্ন শুনে একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক এসে গেট খুলে দিয়ে কর্নেলকে দেখে করজোড়ে নমস্কার করলেন। তাঁর দাড়ি আর চুড়োবাঁধা চুল, কপালে সিঁদুরের ছোপ মুখে সাধুসন্ন্যাসীর আদল ফুটিয়েছে। কিন্তু গায়ে সাদা ফতুয়া আর পরনে ধুতি। বাঁ-হাতে রিস্টওয়াচ। পায়ে সাদাসিধে চপ্পল।
গাড়ি পোর্টিকোর সামনে থামলে কর্নেল বেরুলেন। তিনি বললেন, -পিনাকীবাবু, আপনি কেমন আছেন?
বৃদ্ধ বললেন, -মায়ের আশীর্বাদে একরকম কেটে যাচ্ছে স্যার! একটু আগে রায়মশাই আপনার আসার কথা বলছিলেন। গেস্টরুম গুছিয়ে রেখেছি।
কর্নেল বললেন, –আমরা বনবাংলোয় উঠেছি পিনাকীবাবু! আপনাকে ব্যস্ত হতে হবে না।
-এটা স্যার ঠিক করেননি। রায়মশাই দুঃখ করবেন। আসুন। ওঁর শরীর আগের মতো জুতসই নয়। তাতে গত সপ্তাহে সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেল।
সিঁড়ি বেয়ে আমরা বারান্দায় উঠলাম। তারপর বারান্দার শেষপ্রান্তে গিয়ে আবার ঘোরালো কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় গেলুম। সিঁড়ির দুধারের দেয়ালে ডাঃ চক্রবর্তী ছোটবেলায় নাকি অনেক ঘড়ি দেখেছিলেন। সে-সব নেই। দোতলার বারান্দায় ছড়ি-হাতে এক দীর্ঘকায় গৌরবর্ণ প্রৌঢ় ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরনে পাজামা আর তাঁতের ছাইরঙা পাঞ্জাবি। সুচলো পুরু কাঁচাপাকা গোঁফ আর ঝাঁকড়া চুল। সব মিলিয়ে তার চেহারায় বনেদি আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। নমস্কার করে গম্ভীরমুখে বললেন, –আসুন কর্নেলসায়েব! ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের মুখুজ্জে একটু আগে আমাকে টেলিফোনে জানাল, আপনারা তাদের গেস্ট। যাই হোক, আপনার যা ইচ্ছা! পিনাকীদা! তুমি সদুকে গিয়ে কফি করতে বলো! আর–পুঁটু আছে?
পিনাকীবাবু বললেন, -পুঁটুবাবু কি বাড়িতে বসে থাকার ছেলে? বোধ করি ক্লাবে আড্ডা দিতে গেছেন।
– রাজু?
রাজুকে ভোরবেলা থেকে দেখছি না। সদুকে জিজ্ঞেস করেছিলুম। বলল, কোন চুলোয় গেছে কে জানে।
– ঠিক আছে। তুমি যাও। আসুন কর্নেলসায়েব।
একটা বিশাল ঘরে আমরা ঢুলুম। ঘরের শেষপ্রান্তে একটা উঁচু মেহগনি কাঠের নকশাদার পালঙ্ক। সব আসবাবই সেকেলে। কিন্তু চোখে পড়ল চারদিকের দেয়ালে শুধু ঘড়ি আর ঘড়ি। গোল, ডিমালো, চৌকো ছোট-বড় অদ্ভুত গড়নের সব ঘড়ি। অনেক ঘড়িতে দোলক আছে। ঘর ভরে যাচ্ছে টি-টি শব্দে। আমার কানে বিরক্তিকর। কিন্তু রায়মশাইয়ের তো কান সওয়া।
খাটের কাছাকাছি সোফাসেট আর ডিভান। ইতস্তত সাজানো ব্রোঞ্জ, পেতল, কালোপাথর আর মার্বেলের বিচিত্র ভাস্কর্য। আলমারিতে-আলমারিতে পুরনো বই। আমরা সোফায় বসলুম। রায়মশাই মুখোমুখি ডিভানে বসলেন। তারপর কর্নেল আমার সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিলেন। রায়মশাই বললেন, –দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকা এখানে আসে। তবে আমি ইংরাজি পেপার রাখি। খবরটা দুর্গাপুরের কোনও সাংবাদিক পুলিশ সূত্রে পেয়ে সব কাগজকে বিলি করেছিল। সুরঞ্জন কাল সকালে জিপে চেপে ছুটে এসেছিল। ওকে বললুম, ছটা ঘড়ি বারান্দায় ছিল। সেইগুলো চোরেরা খুলে নিয়ে গেছে। ওগুলো তত কিছু উঁচুদরের জিনিস নয়। সুখরঞ্জন দুপুরে খেয়ে চলে গেল।
কর্নেল বললেন, –কিন্তু আপনার বিপদটা কী?
রায়মশাই আস্তে বললেন, গত একমাস যাবৎ কে বা কারা ডাকে একটা করে চিঠি পাঠাচ্ছে। মোট পাঁচখানা চিঠি পেয়েছি। পোস্ট অফিসের ছাপ খুব অস্পষ্ট। একটা চিঠির স্ট্যাম্পের ওপর ছাপ আবছা হলেও পড়তে পেরেছিলুম। পানাগড় থেকে ডাকে ফেলা হয়েছে।
অমনি বলে উঠলম, -কর্নেল! সেই ভূতনাথ হাজরা!
কর্নেল আমার কথায় কান না দিয়ে বললেন, -চিঠিগুলো দেখি।
রায়মশাই একটা টেবিলের ড্রয়ার চাবি দিয়ে খুলে একগোছা খাম আনলেন। বললেন, –সব চিঠিতেই লাল ডটপেনে শুধু একটা ছড়া লেখা। তলায় একটা মড়ার খুলি আঁকা। আপনি দেখুন। তবে আশ্চর্য, এই ছড়াটা ছোটবেলায় আমার ঠাকুরদা আমাদের দুই ভাইকে মুখস্ত করিয়েছিলেন। এ ছাড়া আমার ছোটবেলায় সুর ধরে আওড়াতুম!
কর্নেল ততক্ষণে চিঠিগুলো বের করে ফেলেছেন। তারপর আতশ কাচ দিয়ে খামের স্ট্যাম্পে ডাকঘরের ছাপ পড়ার চেষ্টা করছেন।
রায়মশাই বললেন, ছড়াটা অদ্ভুত। মাথামুণ্ডু বোঝা যায় না। শুনুন বলি।
বলে তিনি সুর ধরে আওড়ালেন :
হিকরি ডিকরি ডক
নকড়ি ছকড়ি ক্লক
ধরোটি বারোটি পাক
বাজিলে চিচিং ফাঁক
কর্নেল এবার চিঠিগুলোতে চোখ বুলিয়ে বললেন, -হ্যাঁ। সব চিঠিতে একই হাতের লেখা ওই ছড়া। হিকরি ডিকরি ডক একটা ইংরেজি পদ্যের লাইন। ছোটবেলায় পড়েছিলুম। ঘড়ির শব্দের অনুকরণ।
