কর্নেল বললেন, -ঘরের লোক বলতে কে?
– আজ্ঞে, রায়মশাইয়ের বাড়িতে ওঁর দূরসম্পর্কের এক ভাগনে আছে। সে বড়ই নেশাখোর উড়নচন্ডী। আর আছে পুরোনো কাজের মেয়ে সৌদামিনী। তার স্বামী শশধর দুবছর আগে মারা গেছে। ছেলে রাজু মায়ের কাছে থাকে। রাজুরও বদনাম আছে। মস্তানি করে বেড়ায়। রায়মশাই তো বিয়ে করেননি, তা আপনি জানেন। হা-আর সেই পিনাকীবাবুর কথা মনে আছে আপনার? রায়মশাইয়ের বাবার আমলের কর্মচারী।
–পিনাকীবাবু এখনও আছেন ও বাড়িতে?
– আছেন। যাবেন কেথায়? উনি ও রায়মশাইয়ের মতো বিয়ে করেননি। বুড়ো মানুষ। বাড়ির কাজকর্ম করে দেন। ঘড়িগুলোতে উনিই বরাবর দম দিতেন। রায়মশাইয়ের খুব কাছের লোক বলতে উনিই।
–মানে- রায়মশাই পিনাকীবাবুকে বিশ্বাস করেন?
সিদ্ধেশ্বর হাসল, –না করে উপায় কী? রায়মশাইয়ের ভাই সুখরঞ্জনবাবুর খবর জানো?
–উনি তো দুর্গাপুরেই থাকেন। শুধু কালীপুজোর সময় ফ্যামিলি নিয়ে দাদার বাড়ি আসেন।
-কালীপুজো তাহলে এখনও চালু আছে জমিদার বাড়িতে?
– আছে। তবে আগের মতো জাঁকজমক হয় না। নমো-নমো করে নেহাত দায়সারা পুজো হয়। আর-আপনি তো জানেন, রায়বাড়ির কালী বিসর্জন হয় না।
– হ্যাঁ। অষ্টধাতুর কালীপ্রতিমা।
এইসময় সুখরাম হাই তুলে বলল, দো রোজ আগে আমি সন্ধের টাইমে বাড়ি থেকে আসছিল। তো দেখলাম কী, পুঁটুবাবু আর রাজু পশ্চিম মাঠ থেকে আসছে। আমাকে দেখে আচানক ছুপা হইয়ে গেল! মালুম হল না, কাহে ছুপা হইয়ে গেল। রাজু বহত হারামি লড়কা আছে কর্নেলসাব!
কর্নেল বললেন, পশ্চিমের মাঠ মানে তো পোড়োখনি এলাকা!
জি হ্যাঁ।
সিদ্ধেশ্বর হাসল, -হ্যাঁ স্যার! আমিও কয়েকবার এই বাংলো থেকে দেখেছি, দুজনে ঝরনার ধারে বসে আছে। লুকিয়ে গাঁজা খেতে যায় হয়তো।
আবার হঠাৎ বৃষ্টি এল। জোরালো বৃষ্টি। কর্নেল বললেন, -আচ্ছা সিদ্ধেশ্বর! তোমরা গিয়ে শুয়ে পড়ো। রাত এগারোটা বাজে। আমরাও শুয়ে পড়ি। হ্যাঁ বাংলোয় মশার উৎপাত নেই তো?
– না স্যার! উঁচু জায়গা। সবসময় খুব হাওয়া। দেখবেন ফ্যানের হাওয়াতে শীত করবে। তবে মশা হয় শীতের সময়। সে-ও সামান্য।
ওরা উঠে বাংলোর বারান্দা দিয়ে পেছনে চলে গেল। আমরা ঘরে ঢুকলুম। বললাম, -জানালাগুলো কি খোলা থাকবে?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, -থাকবে। তোমার ভয়ের কারণ নেই জয়ন্ত! বাংলোর চারদিকে আলো। এখানে শিল্পনগরী দুর্গাপুর থেকে বিদ্যুৎ আসে বলে লোডশেডিং হয় না। তাছাড়া চারদিকের বাউন্ডারি ওয়ালের মাথায় পাঁচফুট উঁচু কাঁটাতারের বেড়া। গেটে তালা বন্ধ থাকে। আর সুখরামকে দেখলে। ওর কান ঘুমের মধ্যে যেন জেগে থাকে। সুখরাম একসময় এই মুলুকের সেরা কুস্তিগির ছিল। এখন বয়স হয়েছে। তবু পুরনো সুনামের জোরে লোকেরা ওকে খুব সমীহ করে চলে! হ্যাঁ তোমাকে বলা উচিত। সুখরাম একবার এই বাংলোর কাছে একটা মানুষখেকো বাঘকে টাঙিতে কুপিয়ে মেরেছিল। সরকার থেকে সেইজন্য তাকে পাঁচহাজার টাকা বখশিস দেওয়া হয়।
–জঙ্গলে এখনও বাঘ আছে নাকি?
– রিজার্ভ ফরেস্টে বাঘ থাকবে না? হাতি ভালুক শুয়োরও আছে। পাইথন সাপও আছে। তবে তোমার তাতেও ভয়ের কিছু নেই কোনও হিংস্র জানোয়ার এই বাংলায় ঢুকতে পারবে না।
বৃষ্টির রাতে এমন নিরাপদ বনবাংলোতে আমার স্বস্তির সঙ্গে ঘুম এসে গিয়েছিল, যদিও নতুন জায়গায় গেলে সহজে আমার ঘুম আসে না।
সেই ঘুম ভাঙল সকাল সাতটা নাগাদ। সিদ্ধেশ্বর বেড-টি এনে ডাকছিল। কর্নেলকে দেখতে পেলুম না। জিজ্ঞেস করলে সিদ্ধেশ্বর বলল, -কর্নেলসায়েব ভোরবেলা বেরিয়েছেন। ওঁর স্বভাব। তো জানি স্যার! অর্কিড বা প্রজাপতির-কিংবা ধরুন কোনও পাখির পেছনে ঘোরাঘুরি করে বেড়াচ্ছেন।
সকালে বৃষ্টি ছিল না। ভাঙাচোরা মেঘের ফাঁকে রোদ ঝলমল করছিল। বেড-টি খেয়ে বারান্দায় গেলুম। সকালের রোদে চারপাশটা দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। পূর্বে দূরে ময়ুরগড় দেখা যাচ্ছিল। রীতিমতো ছোট শহর। উত্তরে অসমতল সবুজ বনভূমি আর উঁচু-নিচু টিলাপাহাড়। পশ্চিমে ঢেউখেলানো মাঠ। প্রকাণ্ড সব পাথর আর টাড় মাটি। কদাচিৎ কোথাও ঝোপঝাড় বা গাছ। বাংলোর নিচেই পশ্চিমে একটা ঝরনা ছোট নদীর মতো বয়ে চলেছে। বর্ষাকাল বলে জলটা একটু ঘোলাটে দেখাচ্ছিল। ঝরনাটা এসেছে উত্তরদিকের বনভূমির ভেতর থেকে এবং বাংলোর কাছাকাছি বেঁকে পশ্চিমবাহিনী হয়েছে। পশ্চিমের অসমতল মাঠটাই যে খনি এলাকা ছিল, তা বোঝা যাচ্ছিল।
বাথরুম সেরে আবার বারান্দায় এলুম। তারপর চোখে পড়ল, পোড়োখনি এলাকার একটা ঢিবির মাথায় বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ বাইনোকুলারে কিছু দেখছেন। তারপর তিনি টিবি থেকে নেমে অদৃশ্য হলেন।
অদৃশ্য হলেন তো হলেন। প্রায় আধঘন্টা তাকে আর খুঁজে পেলুম না। সিদ্ধেশ্বর সাইকেল নিয়ে লনে এসে বলল, -বাজারে যাচ্ছি স্যার! চা-কফির দরকার হলে সুখরামকে ডাকবেন আর ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করা আছে। কর্নেলসায়েব ফিরলে সুখরাম তো রইল।
পূর্বদিকে যে রাস্তা দিয়ে আমরা রাত্রে এসেছি, তার মোড়ে কর্নেলকে এতক্ষণে দেখতে পেলুম। তার পেছনে একটা সাদা গাড়ি আসছিল। গাড়িটা তার কাছে থেমে গেলে কর্নেল ঢুকে গেলেন। বুঝলুম; ইসমাইল গাড়ি আনছে।
হর্ন শুনে সুখরাম গেট খুলে দিল। গাড়িটা এসে পোর্টিকোর তলায় থামল। কর্নেল বেরিয়ে বললেন, -মর্নিং জয়ন্ত! আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে?
