কর্নেল বললেন, –কফি খাচ্ছিলুম ইসমাইল! তো তুমি কেমন আছ?
–আমি ঠিক আছি সাব! এক মিনিট। আমি গাড়ি সিঁড়ির কাছে নিয়ে আসছি।
বললুম, -বাহ! সব ব্যবস্থা পাকা!
হ্যাঁ। পাকা। -কর্নেল বললেন, মুখার্জিসায়েব হলেন ময়ুরগড় বন-দফতরের বড়কর্তা। পার্বতীনাথ মুখার্জি। তুমি খিচুড়ি-ইলিশ খেয়ে যখন ঘুমোচ্ছিলে, তখন ট্রাংককলে ওঁকে জানিয়েছিলাম আমরা যাচ্ছি।
– ময়ুরগড়ে বনজঙ্গল আছে নাকি?
-ময়ুরগড়ে নেই। কাছাকাছি আছে। আমরা মনোরঞ্জন রায়ের বাড়িতে উঠছি না-অন্তত অবস্থা না বুঝে। উঠছি তার বাড়ি থেকে আধ কিলোমিটার দূরে বনবাংলোতে। অবশ্য বাংলোটা জঙ্গলের ভেতরে নেই। আছে জঙ্গলের সীমানায় একটা টিলার গায়ে। নিচে একটা ঝরনা আছে। ঝরনাটার পথ কিন্তু রহস্যময়।
– কেন?
-পোড়োখনি এলাকা ওটা। খনির খাদ ভেতর দিয়ে লুকোচুরি খেলতে-খেলতে এগিয়ে গেছে দামোদর নদের দিকে। ব্রিটিশ আমলের খনি সব। অভ্র, ডলোমাইট, আরও কত রকমের খনি ছিল! এখন আর কিছুই নেই। এসো। গাড়ি এনেছে ইসমাইল!
সে ছাতি বের করে দরজা খুলছিল। কর্নেল বৃষ্টির তোয়াক্কা না করেই গাড়িতে ঢুকলেন। আমি ইসমাইলের ছাতির তলায় সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলুম।
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ইসমাইল বলল, -মুখার্জিসাব জিপ নিয়ে আসতে বলেছিলেন। তো পরে উনি শোচ করলেন কী, বরষাতে জিপে এলে কর্নিলসাব ভিজে যাবেন। তাই অ্যাম্বাসাড়ার গাড়ি দিলেন। এ গাড়ি উনার নিজের গাড়ি সাব!
আলোকিত এলাকা পার হয়ে গাড়ি অন্ধকারে হেডলাইট জ্বেলে সাবধানে ছুটছিল। দু-ধারে ঝোপঝাড়, কখনও উঁচু গাছের সারি চোখে পড়ছিল। জিজ্ঞেস করলুম, –ময়ূরগড় কত দূর?
ইসমাইল বলল, ওই দেখুন সাব! রাস্তার মধ্যিখানে একটা বড় পাথর ফেলেছে হারামজাদা শয়তানরা। এ রাস্তায় রাতে রাহাজানি করে ডাকাতরা।
তুমি হেডলাইট জ্বেলে রাখো-বলে কর্নেল বাইনোকুলারে কিছু দেখে নিলেন। তারপর শার্টের ভেতর হাত ঢুকিয়ে তার রিভলভার বের করলেন। আস্তে বললেন, –ইসমাইল! তুমি আস্তে এগিয়ে চলল। দুটো লোক ডানদিকে শালগাছের আড়ালে বসে আছে।
ইসমাইল একটু দ্বিধার পর এগিয়ে চলল। এতক্ষণে পাথরটা দেখতে পেলুম। পাথরটার ডাইনে বা বাঁদিক দিয়ে গাড়ি যাবে না। পাথরটার কাছাকাছি যেতেই দুটো মুখোশপরা লোক ডানদিক থেকে বেরিয়ে এল। একজনের হাতে একটা ভোজালি, অন্যজনের হাতে একটা লম্বা দা। গাড়ি পাথরটার হাত দশেক দূরে থামল। তারপরই কর্নেল দরজা খুলে নেমে রিভলভার থেকে তাদের পায়ের কাছে গুলি ছুড়লেন। অমনি তারা লাফ দিয়ে উঠে শালবনের ভেতর ঢুকে পড়ল। কর্নেল শালবনের দিকে আর একবার গুলি ছুড়লেন। তারপর হেট হয়ে পাথরটা ঠেলে সরিয়ে দিলেন। ইসমাইল হাসতে হাসতে বলল, -ডাকুরা শোচ করেনি গাড়িতে কে আছেন।
কর্নেল এসে বললেন, -আশা করি আর হামলা হবে না।
গাড়ি আবার চলতে থাকল। বৃষ্টির মধ্যে এই আকস্মিক হামলায় আমি হতবুদ্ধি হয়ে বসে ছিলাম। একটু পরে বললুম, -কী সর্বনেশে লোক ওরা! আশ্চর্য! কল্পনাও করিনি!
কর্নেল বললেন, –তার চেয়ে আশ্চর্য, তোমার কাছেও লাইসেন্সড ফায়ার আর্মস আছে। তুমি সেটার কথা ভুলে গিয়েছিলে। তুমিও বাঁদিক থেকে নেমে রিভলভার বের করে ওদের মাথার ওপর দিয়ে গুলি ছুড়লে ওরা আতঙ্কে মূৰ্ছিত হতো। তখন ওদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে ওদের দিয়েই পাথরটা সরানো যেত।
বললুম, –আসলে আমি হকচকিয়ে গিয়েছিলুম।
ভবিষ্যতে যেন আর হকচকিয়ে যেয়ো না। –বলে কর্নেল একটুকরো ভেজা কাগজ দেখালেন। তাতে লাল ডটপেনে বড় বড় হরফে লেখা আছে : সাবধান।
বললুম, –এটা কোথায় ছিল?
–পাথরটার তলায়। তাই বেশি ভিজে যায়নি।
-কী সর্বনাশ! তাহলে এ কি সেই ভূতনাথ হাজরার আয়োজন?
– হতে পারে। তবে বোঝা যায়, লোকদুটো আমাদের নিছক ভয় দেখাতে এসেছিল, যাতে আমরা গাড়ি ঘুরিয়ে দুর্গাপুরে ফিরে যাই জয়ন্ত! ওরা যার লোকই হোক, সে চায় না আমি ময়ূরগড়ে যাই।
–কিন্তু সে টের পেল কী করে?
-সম্ভবত রায়মশাইয়ের ফোন ওরা ট্যাপ করে রেখেছে।
কথাটা শুনে আমি এবার হ্যান্ডব্যাগের চেন খুলে আমার রিভলভারের বাঁটটা মুঠোয় ধরে বসে রইলুম। মনে পড়ল, বাড়ি থেকে বেরুনোর সময় কর্নেল বলেছিলেন, –সব সময়ের জন্য তৈরি থাকতে হবে জয়ন্ত! সম্ভবত আমরা এমন পথে যাত্রা শুরু করেছি, যেখানে পায়ে-পায়ে বিপদ আসতে পারে।
কেন বলেছিলেন, তার জবাব পাইনি। কিন্তু যা দেখছি, আমাদের পথে সত্যিই বিপদ ওত পেতে আছে।
.
হিকরি ডিকরি ডক
বনবাংলোয় অবশ্য নির্বিঘ্নে পৌঁছেছিলুম। ততক্ষণে বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল। বাংলোটা সুন্দর। বিদ্যুৎ আছে। কেয়ারটেকার-কাম-পাঁচক সিদ্ধেশ্বর কর্নেলের পরিচিত। চৌকিদার সুখরামও তা-ই। বুঝলুম, কর্নেল- এই বাংলোয় আগেও এসেছিলেন।
ইসমাইল সকালে আসবে বলে গাড়ি নিয়ে চলে গিয়েছিল। রাতের খাওয়ার পর বারান্দায় বসে কর্নেল সিদ্ধেশ্বরের সঙ্গে কথা বলতে থাকলেন। সে কটকেন্দ্র লোক। এই বাংলোতে তার দশবছর কেটে গেছে বনজঙ্গল আর অর্কিডের খোঁজখবর নিতে নিতে কর্নেল বললেন, -আচ্ছা সিদ্ধেশ্বর, কাগজে পড়েছি, ময়ূরগড়ের জমিদারবাড়ি থেকে নাকি অনেকগুলো ঘড়ি চুরি গেছে?
সিদ্ধেশ্বর মেঝেয় পা ছড়িয়ে বসে ছিল। সুখরামও একটু তফাতে উবু হয়ে বসে মাঝে মাঝে কথা বলছিল। কর্নেলের কথার জবাবে সিদ্ধেশ্বর বলল, -শুনেছি তো চুরি গেছে। আমার কী মনে হয় জানেন স্যার? বাড়ির লোকেই চুরি করে কাউকে বেচে দিয়েছে। রায়মশাইয়ের ঘর, না কেল্লা- আপনিই দেখেছেন। বলুন? বাইরের কে ওই কেল্লায় ঢুকতে পারবে?
