ভূতনাথ হাজরা কথাটা গ্রাহ্য করলেন না। কিন্তু বাঙালি ভদ্রমহিলা-টিংকু-রিংকুর মা অমনি বলে উঠলেন–কী অবাক! তাই আপনাকে চেনা-চেনা মনে হচ্ছিল। কিন্তু সাহস করে জিজ্ঞেস করতে পারিনি। ক্যামেরা, বাইনোকুলার! আমার কী সৌভাগ্য! এতদিন ছবিতে দেখেছি।
বলে তিনি উঠে ঝটপট কর্নেলের পা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন। তারপর আমার দিকে ঘুরে বললেন, –আর আপনি নিশ্চয় দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার বিখ্যাত সেই সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরি? নমস্কার! আপনার কত লেখা পড়েছি। কর্নেলসায়েবকে নিয়ে লেখা সাংঘাতিক সব অ্যাডভেঞ্চার। ওগো! এঁরা দুজনেই বিখ্যাত লোক। তুমি তো বই-টই পড়ো না। বাংলা কাগজও পড়ো না!
টিংকু-রিংকুর বাবা আমাদের নমস্কার করলেন। তার স্ত্রী আবার গদগদ হয়ে বললেন, -গতবার কলকাতা বইমেলায় আমি পুরো সেট কর্নেল সমগ্র কিনেছি। আর টিংকু-রিংকুর জন্য কিনেছি প্রেতাত্মা ও ভালুকরহস্য। ওরা বড় হয়ে পড়বে।
আলাপ জমে গেল। টিংকু-রিংকুর বাবার নাম অমল ঘোষ। মায়ের নাম সুনন্দা ঘোষ। অমলবাবু। পাটনায় গর্দানিবাগ এলাকায় কেন্দ্রীয় শিল্প দফতরের অফিসে চাকরি করেন। তার বাড়িও সেখানে। সুনন্দা দেবীর বাবা-মায়ের বাড়ি কলকাতার ভবানীপুরে।
কথায়-কথায় পানাগড় এসে গিয়েছিল। ভূতনাথ হাজরা কর্নেলের দিকে আবার সরোষে দৃষ্টিপাত করে বেরিয়ে গেলেন।
ট্রেন আবার ছাড়লে সুনন্দা দেবী বললেন, -কর্নেলসায়েব নিশ্চয়ই কোথাও রহস্যভেদ করতে যাচ্ছেন?
কর্নেল হাসলেন, -নাহ। যাচ্ছি ময়ূরগড়ে অর্কিডের খোঁজে। আমরা দুর্গাপুরে নেমে যাব।
সুনন্দা দেবী বললেন, –কিন্তু আমার কেন যেন সন্দেহ হচ্ছে, ওই গুফো লোকটা ইচ্ছে করেই আপনাকে ট্রেনে উঠতে দিচ্ছিল না। ওর চেহারা দেখে কেমন যেন গা-ছমছম করছিল।
কর্নেল বললেন, –ওঁকে আমি কস্মিনকালে দেখিনি। আমার সঙ্গে ওঁর কী শত্রুতা থাকতে পারে?
সুনন্দা দেবী মুখ টিপে হেসে বললেন, -আপনি এখন কিছু খুলে বলবেন না, তা জানি। আপনি অর্কিড নয়, নিশ্চয়ই ময়ূরগড়ে কোনও রহস্যের পেছনে ছুটে যাচ্ছেন। ওই লোকটা তা টের পেয়েই আপনাকে আক্রমণ করেছিল। ঠিক আছে। না বলুন এখন। যথাসময়ে দৈনিক সত্যসেবকের পাতায় জয়ন্তবাবু স্টোরিটা লিখবেন। তারপর সামনের বছর কলকাতা বইমেলায় তা বই হয়ে বেরুবে।
দুর্গাপুর স্টেশনে পৌঁছুনোর আগেই সুনন্দা দেবী আমার দিদি হয়ে উঠলেন। টিংকু-রিংকু কর্নেলকে কর্নেলদাদু আর আমাকে জয়স্তমামা বলতে শুরু করল। ট্রেন পৌঁছুল সাড়ে আটটায়। আধঘন্টার বেশি লেট। আমরা নেমে গেলুম। সুনন্দ দেবী দরজায় এসে বিদায় দিলেন। বললেন, -একবার যেন পাটনায় আপনারা আমাদের বাড়িতে পায়ের ধুলো দেন! নেমকার্ডটা যেন হারাবেন না।
অমলবাবু কর্নেলকে আগেই নেমকার্ড দিয়েছিলেন। কর্নেল হাত নেড়ে জানালায় টিংকু-রিংকুর মুখের দিকে তাকিয়ে টা-টা করলেন। ওরা হেসেই অস্থির।
প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আমি এতক্ষণে বললুম, -কর্নেল! ওই ভূতনাথই যে হাওড়া স্টেশনে পেছন থেকে বুড়ো মরতে চলেছে রে বলেছিল, তাতে ভুল নেই।
কর্নেল একটু হেসে চাপাস্বরে বললেন, –নাহ। ওর এক চেলা। বর্ধমান স্টেশনে ট্রেন দাঁড়াতেই আমি কফি আনতে নেমে গেলুম। আমার দু-হাতে দুটো পেপারকাপে কফি ছিল। এককাপ তোমার জন্য। তো ট্রেনে ওঠার সময় দেখি, পেছনের কামরা থেকে নেমে এসে সে ভূতনাথ হাজরার সঙ্গে কথা বলছে। কিছুতেই আমাকে উঠতে দেবে না। তখন চেলাটাকে কনুইয়ের গুঁতো মেরে ফেলে দিলাম। গরম কফির ছ্যাকায় সে বাপরে করে উঠেছিল। কফির দুটো কাপই বরবাদ হল। তারপর অগত্যা ভূতনাথকে হ্যাঁচকা টানে নামালুম। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিল। দৌড়ে গিয়ে অন্য দরজায় উঠে পড়লুম। ভূতনাথও তাই করল। ওর চেলাটার অবস্থা আর লক্ষ করিনি।
–ওর সেই চেলাই যে বুড়ো মরতে চলেছে রে বলেছিল, কীভাবে টের পেলেন?
– কথাটা কানে যেতেই মুখ ঘুরিয়েছিলাম। অমন কথা যদি কেউ বলে, বলার পরও তার মুখে সেই কথার ভাবটুকু মিলিয়ে যেতে দেরি হবে। এটা মনস্তত্ত্ব, জয়ন্ত! রাগের কথা শেষ হওয়ার পরও মানুষের মুখে রাগের ভাবটা থেকে যায় কিছুক্ষণ। ওই কথাটা ব্যঙ্গের। কাজেই ছোরার মুখের কথা শেষ হওয়ার পরও যে ব্যঙ্গ কয়েক সেকেন্ডের জন্য ছিল, তা আমার চোখে পড়েছিল। বয়স কুড়ি-বাইশের মধ্যে। পরনে জিনস্ আর গোলগলা চকরাবকরা গেঞ্জি। গলায় নকল সোনার হার আর বাঁহাতে শেকলের মতো রুপোর ঢিলে বালা- আজকাল যা স্টাইল! যাগগে। চলো! আগে কফি খেয়ে চাঙ্গা হওয়া যাক।
– তারপর ময়ুরগড় কীভাবে যাব আমরা?
-চিন্তা কোরো না। ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
একটা কফির স্টলে গিয়ে পেপারকাপে কফি খাওয়া হল। সেই সময় আবার ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। জুলাই মাসে বৃষ্টি হতেই পারে। কিন্তু এই বৃষ্টির রাতে ময়ুরগড় কীভাবে যাওয়া হবে বুঝতে পারছিলুম না।
কর্নেল পিঠে কিটব্যাগ এঁটে ডানহাতে অন্য একটা ব্যাগ নিয়ে বললেন, -এসো।
বললুম, -বৃষ্টিতে ভিজে যাব যে!
কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, -স্টেশনের গেটে গেলেই আশা করি ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বৃষ্টির জন্য স্টেশনে ক্রমে ভিড় জমেছিল। গেটের কাছে যেতেই ভিড় ঠেলে খাকি রঙের উর্দি পরা একটা রোগাটে চেহারার লোক এসে কর্নেলকে সেলাম ঠুকল। সে হাসিমুখে বলল, –মুখার্জিসাব আমাকে গেটে ওয়েট করতে বলেছিলেন। তো টেরেন চলে গেল। আমি শোচ্ করছিলাম কী, কর্নিলসাব কি আসলেন না?
